সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও ইসরায়েলের সরাসরি সংঘাত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান, গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলি হামলা এবং সিরিয়ায় দীর্ঘ চার দশকের আসাদ শাসনের পতন সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যের মূল কাঠামোগত বাস্তবতার কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি। গত কয়েক বছরে রক্তক্ষয় ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পরও অঞ্চলটি যেন তার সেই পুরনো সমীকরণেই আছে। বহিরাগত শক্তিগুলোর ক্ষমতার খেলা, ভঙ্গুর আরব রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা, স্থায়ী ইরান-ইসরায়েল শত্রুতা এবং ফিলিস্তিন সংকটের অমিমাংসিত অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যকে আবারও এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিষয়ক সাময়িকী ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’-এর সেপ্টেম্বর/অক্টোবর সংখ্যায় এ ব্যাপারে একটি বিস্তারিত নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। লেখক এফ. গ্রেগরি গস তৃতীয় তার নিবন্ধে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক চরম ভূ-রাজনৈতিক উথালপাথাল ও যুদ্ধের একটি গভীর বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন।
নিবন্ধকারের মতে, সাম্প্রতিক যুদ্ধ ও সংঘাতে যেসব পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়েছে তা নিঃসন্দেহে বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি করেছে। দশকের পর দশক ধরে চলা ছায়াযুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে ইরান ও ইসরায়েল এবার একে অপরের ভূখণ্ডে সরাসরি হামলা চালিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অভূতপূর্ব উপায়ে একজোট হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হয়েছেন এবং দেশটির প্রতিরক্ষা অবকাঠামোর বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দীর্ঘদিন সংঘাত থেকে দূরে থাকা উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর জ্বালানি স্থাপনা, বিমানবন্দর ও হোটেল আগুনে পুড়েছে।
লেবানন যখন বিগত যুদ্ধের ক্ষত কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই হিজবুল্লাহ দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে পুনর্নিয়োগ করে নতুন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। অন্যদিকে তেহরান ও বৈরুতের মিত্রদের দুর্বলতার সুযোগে চার দশকের বেশি সময় ধরে চলা সিরিয়ার বাশার আল-আসাদের শাসনের পতন ঘটেছে। ইসরায়েল গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে, পশ্চিম তীর দখলের দিকে পা বাড়িয়েছে, দক্ষিণ লেবানন পুনরায় দখল করেছে এবং সিরিয়ার ভূখণ্ডে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে।
তবে গস যুক্তি দেখিয়েছেন যে, এতসব পরিবর্তন সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্য পূর্বের অবস্থাতেই রয়ে গেছে। ভঙ্গুর আরব রাষ্ট্রগুলোতে বহিরাগতদের প্রভাব বিস্তার, ফিলিস্তিনিদের স্বাধিকার হরণ এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কার্যকর বিশৃঙ্খলা নিরসনের সক্ষমতার অভাব অঞ্চলটিকে সংঘাতের একটি অসীম চক্রের মধ্যে আটকে রেখেছে।
২০২৬ সালের জুনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি এই ভূ-রাজনৈতিক ব্যর্থতার একটি বড় প্রমাণ হিসেবে নিবন্ধে চিহ্নিত করা হয়েছে। গসের মতে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে একাধিক আঘাত সহ্য করার পরও তেহরান হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে এবং উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছে। যুদ্ধ বা অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ স্বত্বেও তেহরানের শাসনব্যবস্থা মূলত অক্ষত রয়েছে এবং তা এখন ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সদস্যদের দ্বারা আরও কঠিনভাবে নিয়ন্ত্রিত।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরায়েল যৌথ যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল ইরানের শক্তি নিঃশেষ করা বা সেখানে সরকার পরিবর্তন ঘটানো। কিন্তু বাস্তবে এটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে নতুন জীবন দান করেছে। তেহরান এখন তার টিকে থাকার জন্য পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির গতিকে আরও ত্বরান্বিত করবে। অন্যদিকে, ইরাক, লেবানন ও ইয়েমেনে ইরানের স্থানীয় প্রক্সি বা মিত্ররা সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এখনো উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব ধরে রেখেছে। উদাহরণস্বরূপ, ইরাকে ২০২৫ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে ইরানপন্থী শিয়া দলগুলো ভালো ফল করেছে এবং তাদের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদির সরকারে গুরুত্বপূর্ণ স্থান বজায় রেখেছে।
লেবানন ও ইয়েমেনের পরিস্থিতিও একই ধরনের জটিলতার ইঙ্গিত দেয়। ইসরায়েলের হামলায় হিজবুল্লাহ দুর্বল হওয়ার পর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মারোনাইট খ্রিস্টান জোসেফ আউন লেবাননের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং আন্তর্জাতিক যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন। কিন্তু ২০২৬ সালে মার্কিন-ইসরায়েলি অভিযানে ইরান প্রতিশোধ নিতে শুরু করলে হিজবুল্লাহ আবারও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ফলে ইসরায়েল লেবাননে পুনরায় স্থল অভিযান ও বিমান হামলা চালিয়ে ৪ হাজার ২০০-র বেশি মানুষকে হত্যা এবং ১০ লাখ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করে।
হিজবুল্লাহকে এভাবে নিশ্চিহ্ন করা না গেলেও নতুন গঠিত দুর্বল লেবানন সরকার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ইয়েমেনে হুথিরা সাগরে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টির পাশাপাশি সৌদি আরবের সাথে এক ধরনের সমঝোতায় ছিল, যেখানে রিয়াদ ইয়েমেনি সরকারি কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে হুথিরা আবার ইরানের পক্ষে আঞ্চলিক যুদ্ধে সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধের ঘোষণা দেয়।
উপসাগরীয় দেশগুলোর ক্ষেত্রে নিবন্ধে বলা হয়েছে যে, তারা দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পর্যটনের স্বার্থে যুদ্ধ এড়িয়ে শান্ত পরিবেশ চেয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা শুরু হলে ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর পাল্টা হামলা চালায়। এতে উপসাগরীয় এলিটদের মধ্যে প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অসন্তোষ তৈরি হলেও পরে তারা মার্কিন বাহিনীকে ইরানের সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করার আহ্বান জানায়।
কিন্তু ২০২৬ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্মারক সমঝোতা স্বাক্ষরিত হলে তারা চরম হতাশ ও মার্কিন প্রতিশ্রুতি নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ে। তা সত্ত্বেও নিরাপত্তা সুরক্ষার ক্ষেত্রে মার্কিন সামরিক শক্তির কোনো বিকল্প না থাকায় (যেহেতু চীন, রাশিয়া বা ইউরোপ এই নিরাপত্তা দিতে অক্ষম) তারা ওয়াশিংটনের সাথেই থাকতে বাধ্য হচ্ছে। অপরদিকে, ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধ এবং ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কাতারে ইসরায়েলি হামলার ঘটনার পর আব্রাহাম অ্যাকর্ডের মাধ্যমে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার যে গতি তৈরি হয়েছিল তা স্থবির হয়ে পড়েছে। একমাত্র সংযুক্ত আরব আমিরাত বাদে অধিকাংশ উপসাগরীয় দেশ ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে এসেছে।
ফিলিস্তিন সংকট ও ইসরায়েলি রাজনীতির বিশ্লেষক গস উল্লেখ করেছেন যে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর দীর্ঘ আড়াই বছরের সংঘাত এবং হাজার হাজার ফিলিস্তিনির মৃত্যুর পরও ইসরায়েল তার মৌলিক নিরাপত্তা সংকট কাটাতে পারেনি। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার গাজায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) কোনো ভূমিকা স্বীকার করতে নারাজ এবং গাজার ৭০ শতাংশ এলাকা দখল করে রেখেছে। ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি প্রস্তাবে ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট কমিটির কথা বলা হলেও ইসরায়েল তাদের প্রবেশ করতে দেয়নি। অন্যদিকে পশ্চিম তীরে নতুন বসতি স্থাপন এবং জমি কেনার আইন পাসের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সব সুযোগ নস্যাৎ করা হচ্ছে।
গসের মতে, শক্তিশালী রাষ্ট্র তৈরি না করে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি আনা সম্ভব নয়। নেতানিয়াহু বিশ্বাস করেন যে, প্রতিবেশীদের দুর্বল ও বিভক্ত রাখাই ইসরায়েলের জন্য নিরাপদ। কিন্তু বাস্তবে মিশর ও জর্ডানের মতো শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকারের উপস্থিতিই বিগত দশকগুলোতে ইসরায়েলের সীমান্তে স্থিতিশীলতা ধরে রেখেছিল।
সিরিয়ার ক্ষেত্রে আসাদ শাসনের পতন এবং আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বে নতুন সরকারের আগমনকে বড় ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন হিসেবে বর্ণনা করা হলেও দেশটি এখনো অত্যন্ত ভঙ্গুর। আসাদ সরকারের পতনে ইরানের ‘ল্যান্ড ব্রিজ’ বিচ্ছিন্ন হলেও, নতুন সিরীয় সরকার আলবাইট, দ্রুজ ও কুর্দ ফিলিস্তিনিদের সাথে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে লিপ্ত। ইসরায়েল সিরিয়ার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বাফার জোন দখল করেছে এবং দ্রুজ মিলিশিয়াদের অস্ত্র দিয়ে দামেস্কের ওপর হামলা চালাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র আল-তানফ ঘাঁটি সিরীয় বাহিনীর হাতে তুলে দিয়ে সৈন্য প্রত্যাহার করলেও এই অঞ্চলটি আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর ছায়াযুদ্ধে রূপ নেওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
নিবন্ধের শেষাংশে গস জোর দিয়ে বলেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা আনতে হলে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে। প্রথমত, বাহরাইনে ৫ম ফ্লিটের সদর দফতর, কাতারের আল উদেইদ বিমান ঘাঁটি এবং কুয়েত, ওমান ও আমিরাতে সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখে আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ইরানকে পারমাণবিক চুক্তি ও কূটনৈতিক আলোচনায় ফিরিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ জোর করে সরকার পরিবর্তনের মার্কিন চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। তৃতীয়ত, সুয়েজ খাল বা মালাক্কা প্রণালির আন্তর্জাতিক সনদের আদলে হরমুজ প্রণালিকে স্থায়ীভাবে উন্মুক্ত ও মুক্ত রাখার জন্য চীন, ভারত, যুক্তরাজ্য ও উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিয়ে একটি বহুপাক্ষিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। সর্বোপরি, ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং তাদের একটি টেকসই রাষ্ট্র গঠনের রাজনৈতিক ফয়সালা ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে কোনো শান্তির আশা করা অলীক কল্পনাসম। এই মৌলিক পরিবর্তনগুলো নিশ্চিত করা না গেলে সাম্প্রতিক সব রক্তক্ষয় ও ধ্বংসযজ্ঞ কেবল ‘শব্দ ও উত্তেজনার’ এক অর্থহীন মহড়া হিসেবেই রয়ে যাবে এবং বর্তমান যুদ্ধবিরতিটি পরবর্তী নতুন কোনো ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের ক্ষণগণনা হিসেবে কাজ করবে।