অনুমোদিত যানবাহনের বাইরে খোলা সিলিন্ডার বা অন্য কোনো কনটেইনারে গ্যাস বিক্রি করতে পারে না সিএনজি ফিলিং স্টেশন। এটি দণ্ডনীয় অপরাধ। দুদিন আগে দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোর আশপাশের সিএনজি স্টেশনের বিরুদ্ধে যানবাহনের বাইরে খোলা সিলিন্ডারেও গ্যাস বিক্রি করার অভিযোগের জবাবে বিব্রত হয়েছিলেন বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং অ্যান্ড কনভার্সন ওয়াকশপ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর।
বৃহস্পতিবার এই অবৈধ কার্যক্রম ঠেকাতে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি সিএনজি স্টেশনগুলোকে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তিতাসের এই চিঠির কড়া সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশ নিটপণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। যে অনিয়মের কথা সামনে এলে দুঃখ প্রকাশ করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলতেন ব্যবসায়ীরা, এখন সেই অনিয়ম বন্ধেই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন তারা!
চরচার কাছে এই রপ্তানিকারক ব্যবসায়ী হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “গ্যাস সংকটের কারণে গত ১০-১২ দিন ধরে কোথাও কারখানা পুরোপুরি বন্ধ, আবার কোথাও আংশিক চালু আছে। এতে রপ্তানি বিলম্ব ও ক্রেতাদের নতুন অর্ডার পাওয়া এবং এমনকি শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের মতো সংকট তৈরি হচ্ছে।”
বিকেএমইএ সভাপতি বলেন, “গ্যাসের চাপ ১-৩ পিএসআই-এ নেমে যাওয়ায় বায়ারদের নির্ধারিত সময়সীমা রক্ষা করা যাচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে ৪-৫ গুণ বেশি খরচে বিমানে পণ্য পাঠাতে হচ্ছে।”
গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে (কালিয়াকৈর, কোনাবাড়ী, টঙ্গী, শ্রীপুর, মৌচাক, চন্দ্রা, বোর্ডবাজার) উৎপাদন ৫০-৬০% পর্যন্ত কমেছে। একই সংকটে আছে সাভার ও আশুলিয়ার প্রায় ১২০০ শিল্পকারখানা। এসব শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ দরকার হয় ১০-১৫ পিএসআই, এর বিপরীতে এখন মিলছে মাত্র ১-৩ পিএসআই। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বয়লার, জেনারেটর, উৎপাদন যন্ত্রপাতি চালানোই সম্ভব হচ্ছে না।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের হিসাবে, সামগ্রিক শিল্প উৎপাদন নেমে এসেছে সক্ষমতার মাত্র ১৫-২০%-এ। শ্রমিকদের বেতন মাসের প্রথম সাত কর্মদিবসের মধ্যে দিতে হলেও উৎপাদন বন্ধ থাকায় মালিকরা কোথা থেকে সেই অর্থ পাবেন, তা অনিশ্চিত বলেও জানান তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে সফট ঋণের প্রস্তাব ভেবে দেখতে নীতিনির্ধারকদের প্রতি তাগিদ দিয়েছেন এই ব্যবসায়ী।
বাংলাদেশ টেক্সটাইলস মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) এক হিসাবে বলা হচ্ছে, গ্যাসের চাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় টেক্সটাইল, ডাইং ও স্পিনিং মিলগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে। চলমান গ্যাস সংকটে উৎপাদন ধরে রাখতে অস্বাভাবিকভাবে খরচ বাড়ছে। বাড়তি ওভারটাইম দেওয়া ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে টেক্সটাইল-পোশাক খাত মিলিয়ে প্রতিদিন আনুমানিক ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকার উৎপাদন ব্যাহত ও ক্ষতি হচ্ছে।
একইরকমভাবে ধুঁকছে সিরামিক এবং স্টিল শিল্পখাত। বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শেখ মাসাদুল আলম মাসুদ গণমাধ্যমকে জানান, বিদ্যুৎ ও ডিজেল দিয়ে রোলিং মিল অপারেশনে রাখতে প্রতি টন স্টিল উৎপাদনে বাড়তি ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা খরচ হচ্ছে।
বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি মইনুল ইসলাম সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ভাটিতে হঠাৎ করে গ্যাসের চাপ শূন্যের কোঠায় নামলে প্রতিদিন পঁচে নষ্ট হওয়া কাঁচামাল ও উৎপাদন ক্ষতির পরিমাণ ২০ কোটি টাকার ওপর। এই ক্ষতির মুখোমুখি এখন সিরামিক শিল্প।
জ্বালানি সংকটে বন্ধ হচ্ছে কারখানা। বাড়ছে বেকারত্ব। বাড়ছে অথনৈতিক ঝুঁকি। শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-এর জুন থেকে ২০২৬-এর জুন—এই দুই বছরে মোট ৪৫৭টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ১৭০টি বস্ত্র/পোশাক শিল্প, বাকি ২৮৭টি পোশাকখাত বহির্ভূত। এতে কমবেশি ৫০ হাজার শ্রমিক বেকার হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জুলাই ২০২৬-এর ভয়াবহ গ্যাস সংকটের প্রভাব। ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলো বলছে, বর্তমান সংকটে ইতিমধ্যে প্রায় ২৫০০ শিল্পকারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের শঙ্কা, সময়মতো শিপমেন্ট না হলে ক্রয়াদেশ বাতিল, জরিমানা, বাজার হারানো এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) চেয়ারম্যান আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) সরকারের কাছে প্রশ্ন রেখে চরচাকে বলেন, “গ্যাস না পেয়ে বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোর ব্যাংক ঋণের দায়ভার কি সরকারের নেওয়া উচিত নয়?” কারণ হিসাবে তিনি বলেন, “সরকার গ্যাসের প্রতিশ্রুতি দিয়েই বিনিয়োগ আকৃষ্ট করেছিল।”
সামনে আরও বিপদ
ঋণের কিস্তি সময়মতো পরিশোধ না হলে ব্যাংকিং খাতে ধস নামার ঝুঁকি আছে। আবার শিল্প বন্ধ থাকলে সরকারের রাজস্ব ও ভ্যাট আদায়ও কমে যাবে। যা বাজেট বাস্তবায়নে প্রভাব ফেলবে বলে ব্যবসায়িক ফোরামের আলোচনায় বলেন, বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে খেলাপি ঋণ আরও বাড়তে পারে। ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে এবং নতুন ঋণ বিতরণও বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে গ্যাস সংকটের প্রভাব শুধু শিল্পে সীমাবদ্ধ না থেকে আর্থিক খাতেও ছড়িয়ে পড়বে। একইসঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাও দুর্বল হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
ছয়টি গ্যাস বিতরণকারী কোম্পানির কাছে নতুন শিল্প সংযোগের ১৮৫৭টি আবেদন অপেক্ষমাণ—যার মধ্যে প্রায় ৫৫০টি প্রতিষ্ঠান সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন ও অর্থ জমা দিয়েও সংযোগ পায়নি। ফলে হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ আটকে আছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সম্প্রতি সরকার ঘোষণা দিয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত নতুন করে আর শিল্পে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হবে না। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, একদিকে বন্ধ কারখানা চালু ও ব্যবসাকে চাঙ্গা করতে ‘বেইল আউট’ ফান্ড বরাদ্দ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক, অন্যদিকে উৎপাদনের লাইফলাইন জ্বালানির সংস্থান করতে পারছে না। এতে করে অর্থনীতিক পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করছেন জ্বালানী বিশেষজ্ঞরা।
এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম চরচাকে বলেন, “জ্বালানি খাতকে জনসেবামূলক খাতের পরিবর্তে মুনাফাভিত্তিক খাত হিসেবে পরিচালনা করায় ভোক্তা ও শিল্প—উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।” দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়মের ফাঁদে পড়ে জ্বালানি খাতের যে দুরবস্থা, সেটাকে সঠিকভাবে আমলে নিতে পারলে চলমান সংকট বর্তমান সরকারের জন্য জ্বালানি খাত সংস্কারের একটি সুযোগ হয়ে উঠবে বলেও মনে করেন অধ্যাপক শামসুল আলম।
এদিকে, গ্যাস না থাকায় আবাসিক, শিল্প, পরিবহনসহ সব খাতের গ্রাহকদের পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ। বাসাবাড়িতে জ্বলছে না চুলা, সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাসের জন্য চলছে হাহাকার।
দেশে আমদানিকৃত এলএনজি পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য দুটি ভাসমান টার্মিনাল (ফ্লোটিং স্টোরেজ রি-গ্যাসিফিকেশন ইউনিট বা এফএসআরইউ) রয়েছে, যেগুলোর সম্মিলিত সরবরাহ সক্ষমতা ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। তবে মহেশখালী এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর একটি টার্মিনালের গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের কারণে এমনটি ঘটেছে বলে পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে বলা হয়।
পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, “এখন পর্যন্ত (বৃহস্পতিবার) মূল ত্রুটিই ধরতে পারেননি দেশি-বিদেশি প্রকৌশলীরা। ফলে কবে নাগাদ এটি সারানো সম্ভব হবে তা বলতে পারছে না কোনো পক্ষই।”
এদিকে বৃহস্পতিবার এক বিজ্ঞপ্তিতে তিতাস গ্যাস জানিয়েছে, মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে রি-গ্যাসিফাইড এলএনজি (আরএলএনজি) সরবরাহ দৈনিক প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) কমে গেছে। ফলে, তিতাস গ্যাসের আওতাধীন এলাকায় আবাসিক, শিল্প, বাণিজ্যিক, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সিএনজিসহ সব ধরনের গ্রাহকের জন্য গ্যাসের স্বল্পচাপের সংকটটা তীব্র হয়ে উঠবে বলে জানিয়েছে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ।
বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সম্প্রতি একটি টার্মিনালে দুর্ঘটনার আগেই দৈনিক চাহিদার তুলনায় গ্যাসের ঘাটতি ছিল প্রায় ৩০ শতাংশ। দুর্ঘটনার পর বর্তমানে ঘাটতি বেড়ে ৪২ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে।