দেশের অন্যান্য স্থানের মতো হবিগঞ্জেও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পদযাত্রা কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উপায়ে পালিত হতে পারত। কিন্তু সেটা হয়নি। সাভারের পর এটাই দ্বিতীয় অঘটন।
হবিগঞ্জে এনসিপির কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া, হামলা গাড়ি ভাঙচুর ও আহত হওয়ার ঘটনায় প্রতিটি শান্তিকামী মানুষের মতো আমরাও উদ্বিগ্ন।
হামলা ভাঙচুরের জন্য এনসিপির জন্য ক্ষমতাসীন বিএনপি ও তাদের সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলকে দায়ী করেছে। বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনগুলো এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তাদের কোনো নেতা-কর্মী হামলা ভাঙচুর করেনি। এনসিপি নেতাদের উসকানিমূলক ও অশালীন বক্তব্যে খেপে গিয়ে ‘বিক্ষুব্ধ জনতা’ এই হামলা চালিয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলের গায়েবি মামলার মতো বিক্ষুব্ধ জনতাও কোনো গায়েবি ব্যাপার কি না খতিয়ে দেখা দরকার।
হবিগঞ্জে হামলার পর এনসিপি নেতারা কয়েক ঘণ্টা অবরুদ্ধ ছিলেন। এরপর পুলিশ তাদের উদ্ধার করে। বৃহস্পতিবার দুই পক্ষ হবিগঞ্জে সমাবেশের কর্মসূচি নিলে স্থানীয় প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে; যাতে কোনো পক্ষ কর্মসূচি পালন করতে না পারে। পরদিন দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে আরেকটি দল হবিগঞ্জে যেতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয়। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ধ্বস্তাধ্বস্তি হয়।
কেন এই ঘটনা ঘটল? এটা কি দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে যে সন্দেহ অবিশ্বাস ছিল, তারই বহিঃপ্রকাশ? গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিটি দল নিজ নিজ কর্মসূচি পালন করবে, তাদের বাধা দেওয়া হবে কেন? আবার নেতারাও বক্তৃতা বিবৃতিতে জনগণের কাছে নিজ দল বা জোটের কর্মসূচি তুলে ধরবেন। এটা নিয়ে তো হাঙ্গামা হওয়ার কথা নয়। তারপরও হচ্ছে, যা অওয়ামী লীগ আমলের বাহু বলের রাজনীতির কথাই মনে করিয়ে দেয়। তাদের এমন কিছু বলা উচিত নয়, যা শুনে ভদ্রলোকদের কানে হাতে দিয়ে রাখতে হয়। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনীতিতে আর কোনো পরিবর্তন না হলেও ভাষা ব্যবহারে বড় পরিবর্তন এসেছে। জনপরিসরে অশ্রাব্য ও অশালীন ভাষা ব্যবহারের প্রতিযোগিতা চলছে। এটা যে কেবল বিরোধী দলের নেতারা করছেন তা নয়, সরকারি দলেরও কোনো কোনো নেতা করছেন।
আমরা দেখলাম হবিগঞ্জে এনসিপির যাত্রা ঠেকাতে কয়েক শ পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। রাস্তায় আড়াআড়ি ট্রাক রেখে গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একজন পুলিশ কর্মকর্তা এনসিপি নেতাদের উদ্দেশে বলছেন, “আপনাদের চেয়ে আমাদের সংখ্যা বেশি।” যে দেশে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন ঠেকাতে নেতা-কর্মীদের চেয়ে বেশি সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করতে হয়, সে দেশে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠার সম্ভাবনা ক্ষীণ। বলপ্রয়োগ করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
বুধবার হবিগঞ্জের ঘটনার পর বৃহস্পতিবার গোলাপগঞ্জ পৌরসভা অডিটোরিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠান শেষে চলে যাওয়ার সময় এনসিপির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলমকে বহন করা গাড়িতে হামলা হয়। গাড়ির পেছনের কাচ ভেঙে গেছে। তিনি হামলার জন্য ছাত্রদলকে দায়ী করেছেন। এনসিপির শ্রমিক সংগঠন জাতীয় শ্রমিক শক্তির কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য শিব্বির আহমদ বলেন, এনসিপির সংসদ সদস্য মাহমুদা মিতু ও আতিকুর রহমান মোজাহিদের গাড়ি ও সাত শহীদ পরিবারের সদস্যদের বহন করা দুটি গাড়িতে হামলা হয়েছে।
সিলেট সার্কিট হাউসে ফিরে সারজিস আলম বলেন, ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা এই হামলা চালিয়েছে। এ ছাড়া সিলেটে ফেরার পথে পাঁচমাইল এলাকায়ও চাপাতি ও রামদা দিয়ে হামলা হয়েছে। অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন।
এই অঘটন এমন সময়ে ঘটল যখন জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালিত হচ্ছে। যখন দেশে তীব্র গ্যাসে সংকটে জনজীবন বিপন্ন, বিরোধী দল সেসব সমস্যা সমাধানে কোনো কর্মসূচি নেয়নি। তারা কর্মসূচি নিয়েছে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সীমান্ত নিরাপদ রাখার দাবিতে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কাজটি করতে হবে জাতীয় সংসদেই। সেখানে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে মতৈক্য হতে হবে। হ্যাঁ, তারা বলতে পারে, রাস্তায় কর্মসূচি পালন করে তারা সরকারকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে বাধ্য করবে। কিন্তু যেখানে যেই কর্মসূচিতে নেতা–কর্মীর চেয়ে পুলিশের উপস্থিতি বেশি হয়, তাতে সরকার কতটা চাপ বোধ করবেন সেই প্রশ্নও উঠবে।
এনসিপি নেতারা কি সাধারণ মানুষের মনের ভাষা বোঝেন? বুঝলে তারা জনজীবনের প্রাত্যহিক সমস্যাকেই সামনে আনতেন। সামনে আনতেন তরুণদের বেকারত্ব, গ্যাস সংকট ও নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো। জুলাই অভ্যুত্থানের সূচনাই হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটার বদলে মেধাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবিতে।
জাতীয় সংসদের দুটি অধিবেশনে মানুষের মৌলিক সমস্যা নিয়ে কথা কমই হয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে অধীনতামূলক চুক্তি করল অন্তর্বর্তী সরকার, সেসব নিয়েও এনসিপি ও জামায়াতকে কথা বলতে শুনি না। আমরা বেশি দামে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল কিনব, গম কিনব, বোয়িং কিনব, আর জনগণের ওপর করের বোঝা বাড়বে, এটা নিশ্চয়ই জুলাই অভ্যুত্থানের লক্ষ্য ছিল না।
জুলাই সনদ তো আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য। রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলানোর জন্য। হবিগঞ্জের ঘটনা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা কি সেই বদলের ইঙ্গিত দেয়? জোটসঙ্গী জামায়াত নিন্দা করেই দায়িত্ব সেরেছে। তাদের স্থানীয় নেতা–কর্মীরা এনসিপির পাশে দাড়ায়নি।
ইতিমধ্যে পত্রিকায় খবর এসেছে, এনসিপির সঙ্গে নানা বিষয়ে জামায়াতের দূরত্ব বেড়েছে।অন্যদিকে জামায়াত নিজেই দুই এমপি নিয়ে বিপদে আছে, যাদের একজনকে বহিষ্কারও করা হয়েছে। জামায়াত নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এগার দলীয় জোটের একটি (ইসলামী আন্দোলন) নির্বাচনের আগেই বেরিয়ে গেছে। সম্প্রতি আরও একটি দল বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। কওমি ধারার সাতটি দল নিয়ে নতুন ইসলামী জোট গঠিত হচ্ছে। এর অর্থ জামায়াত জোট ছোট হয়ে আসছে।
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে জামায়ত সমর্থক নির্বাচিত ছাত্র সংসদ যে নৈরাজ্য ও সন্ত্রাসী ঘটনার জন্ম দিচ্ছে, তাতে সাধারণ শিক্ষার্থী তো বটেই শিক্ষকেরাও শঙ্কিত। রাকসুর সহসভাপতি সাংবাদিকদের জড়ো করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। সেখানে ‘আম্মার রাজ’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তিনি যা বলবেন, সেটাই আইন।
হঠাৎ করে মাঠের রাজনীতি উত্তপ্ত হলো কেন? কথায় বলে এক হাতে তালি বাজে না। যেই দুই হাত দুই বছর আগে এক হয়েছিল স্বৈরাচারী সরকাকে উৎখাত করতে, সেই হাত ভাগ হয়ে গেল কেন? সরকারি দলের অভিযোগ, বিরোধী দল বিশেষ করে এনসিপি নেতারা প্রতিনিয়ত উসকানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীসহ বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের গালাগাল করছে। কিন্তু কথার জবাব কথা দিয়েই দিতে হবে। কিংবা জনগণের কাছে তাদের স্বরূপ তুলে ধরতে হবে। তা না করে কথার জবাব হাতে দিতে গেলে প্রতিপক্ষের অপরাধ অনেকটাই লঘু হয়ে যায়। হবিগঞ্জের ঘটনা সেটাই প্রমাণ করল।
লেখক: সম্পাদক, চরচা।