ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালার নব আয়োজন দেখে হতবাক হওয়ার কিছু নেই। দ্বিজাতিতত্ত্বে বিশ্বাসী ডাকসুর বর্তমান নেতৃত্ব দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রবক্তা ও পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর একাধিক ছবি টানাবে, সেটাই স্বাভাবিক। বাঙালি জাতীয়তাবাদী ও বিপ্লবী নেতাদের ছবি রাখা তো তাদের আদর্শের পরিপন্থী। তারপরও তারা কোনাকাঞ্চিতে দুচারটা ছবি রেখেছেন। এটাই বা কম কীসে?
আমাদের ইতিহাসে অনেক বাঁক বদলের ঘটনা আছে। এখানে দুটি ঘটনা তুলে ধরছি। ২৩ বছরের ব্যবধানে রমনা রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) দুটো বড় ঘটনা ঘটে।
১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা জিন্নাহ লাখ লাখ লোকের উপস্থিতিতে ঘোষণা করেছিলেন, “উর্দু, উর্দু—একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।” এর কয়েকদিন আগে ১১ মার্চ বাংলা ভাষার দাবিতে প্রদেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়েছিল। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি সম্ভবত সেই ধর্মঘটের অন্যায্যতা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ অসহযোগ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
ডাকসুর বর্তমান নেতৃত্বের কাছে জিন্নাহর ভাষণের ছবিই গুরুত্ব পেয়েছে, এবং তারা যথাযথ মর্যাদায় সেটা তুলেও ধরেছেন। আর ৭ মার্চে জাতীয়তাবাদী নেতা শেখ মুজিবুর রহমান যেই ভাষণে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার কথা বলেছেন, সেটা কাদের বিরুদ্ধে তাও নিশ্চয়ই ডাকসুর নেতাদের অজানা নয়। তাদের সংগ্রশালায় ৭ মার্চের ছবি আছে বক্তাকে বাদ দিয়ে।
ঐতিহাসিক সত্য হলো ৭ মার্চের ভাষণদাতাকে সামনে আনলে জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্ব নাকচ হয়ে যায়। সেই কাজটি ডাকসুর বর্তমান নেতৃত্ব করতে পারেন না। করলে তাদের রাজনীতি থাকে না।
চব্বিশে দুঃশাসন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের পর দেশবাসী যেখানে একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও সমতাপূর্ণ সমাজ আশা করেছিল, সেখানে পদে পদে বৈষম্য ও ইতিহাস বিকৃত করা হচ্ছে।
আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারীদের একাংশ তো বাঙালিত্বই মুছে দিতে চায়। তাদের কাছে পীরের দরগাহ, মাজার, গানবাজনা বেদাত কাজ।
ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহকে মহিমান্বিত করা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। একাত্তরের বিপরীতে সাতচল্লিশকে দাঁড় করানোর চেষ্টা অনেক দিন ধরেই চলে আসছিল।
সম্প্রতি জিন্নাহর মৃত্যুদিবস উপলক্ষে আয়োজিত সভায় এক বক্তা সূর্যসেন হলের নাম বদলে ফের জিন্নাহ হল রাখার দাবি জানিয়েছেন। ভাগ্যিস, তারা এখনো বাংলাদেশের নাম বদলের দাবি জানাননি।
১১ সেপ্টেম্বর রাতে ইনকিলাব মঞ্চের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে জিন্নাহর একটি সাদাকালো প্রতিকৃতি প্রকাশ করে লেখা হয়, ‘উপমহাদেশের অন্যতম রাজনীতিবিদ, দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রবক্তা, পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা ও পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ।’
ইনকিলাব মঞ্চের চোখে যিনি দ্বিজাতিত্ত্বের প্রবক্তা, তিনি তাদের কাছে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার নেতা হবেন সেটাই স্বাভাবিক। আর যারা দ্বিজাতিতত্ত্বের বেড়াজাল ছিন্ন করে এই ভূখণ্ডে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন, তাদের অবদান ভুলিয়ে দিতে সচেষ্ট আছেন তারা।
ডাকসুর সংগ্রহশালায় কেবল জিন্নাহর একাধিক ছবিই শোভা পায়নি, ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা আবদুল মালেকের ছবিও আছে, যেই সংগঠনটি একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে। আজকের জামায়াতে ইসলামী যেমন পাকিস্তান জামায়াত ইসলামীর উত্তরসূরি তেমনি ইসলামী ছাত্রশিবিরও পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের উত্তরসূরি।
যেই জামায়াতে ইসলামী জিন্নাহকে তাদের রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে নিয়েছে, সাতচল্লিশে কিন্তু তারা পাকিস্তানের বিরোধিতা করেছিল। ১৯৭১ সালে দলটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেই ক্ষান্ত হয়নি, হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যায় সহায়তাও করেছে।
এদিকে জিন্নাহর নামে সূর্যসেন হলের নামকরণের দাবি জানিয়েছে নবাব সলিমুল্লাহ একাডেমির সভাপতি মুহম্মদ আব্দুল জাব্বার। সেই দাবি তিনি জানাতেই পারেন। কিন্তু ‘সূর্যসেন যে একজন ডাকাত ও খুনি’ ছিলেন, সেই তত্ত্ব তিনি কোথায় পেলেন? যেই ব্যক্তি ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ করে ফাঁসিতে জীবন দিয়েছেন, তিনি সলিমুল্লাহ একাডেমির সভাপতির চোখে ডাকাত ও খুনি!
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালা থেকে ছাত্র ইউনিয়নের নেতা মইন খান রাজুর সরঞ্জাম সরিয়ে ফেলার অভিযোগ তুলেছে বামপন্থী তিন ছাত্রসংগঠন। সংগঠনগুলো হলো- ছাত্র ইউনিয়ন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট ও জাসদ ছাত্রলীগ। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ২০১৩ সালে সংগঠিত ‘গণজাগরণ’ মঞ্চের আন্দোলনকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন হওয়ার আগে সংগ্রহশালায় বাংলাদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন-সংগ্রামের আলোকচিত্র ও নিদর্শনের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গৌরবোজ্জ্বল ছবি ছিল। গত রোববার সংগ্রহশালা উন্মুক্ত করার পর সেই ছবিগুলোতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমানের একক ছবি বাদ দেওয়ার পাশাপাশি যুক্ত করা হয়েছে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি।
বর্তমানে সংগ্রহশালায় বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছেষট্টি সালের ছয় দফা, আটষট্টির আগরতলা মামলা, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের কোনো ছবিতেই শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো একক ছবি নেই।
সংগ্রহশালায় রাখা (দুপুর পর্যন্ত) মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবির একটি ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া তার বক্তব্যের সময়ের ছবি। ওই বক্তব্যে তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলেছিলেন। আরেকটি ১৯৪০ সালের লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সম্মেলনের দলগত ছবি। তৃতীয়টি ১৯৭০ সালের নির্বাচন নিয়ে পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের কাটিং।
সংগ্রহশালা নতুন করে সাজানোর নামে ডাকসু নেতৃত্ব ইতিহাস ঝাড়াইমোছাই করছেন। তারা দ্বিজাতিতত্ত্বের মহিমা প্রচারকারীদের ‘জাতীয় বীর’ হিসেবে তুলে ধরছেন। আর বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতাদের অবদানকে খাটো করে দেখানো হয়েছে।
যেখানে দেশের গরিষ্ঠসংখ্যক রাজনীতিক ও রাজনৈতিক দলের মনোজগতে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভূত চেপে বসেছে, সেখানে ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবিই যে প্রাধান্য পাবে, তাতে হতবাক হওয়ার কিছু নেই।
তবে এখানে একটি কথা বলা প্রয়োজন। ডাকসুর ইতিহাস বিচারে যে অবিচার হয়েছে, তার প্রতিকার করতে হবে গণতান্ত্রিকভাবেই। সংগ্রহশালায় রক্ষিত কোনো কোনো নেতার ছবি ছিঁড়ে ফেলা, ফ্রেম ভেঙে ফেলা কিংবা পায়ে মাড়ানো কোনোভাবে সমর্থনযোগ্য নয়। আজ যদি আমার পছন্দ নয় বলে কারও ছবি ছিঁড়ে ফেলি, কাল আরেকজন তার অপছন্দের ব্যক্তির ছবিও ছিঁড়ে ফেলবেন। এটা গণতান্ত্রিক আচরণ নয়।