সম্ভবত সবাই মক্কা চুক্তির পাদটীকাগুলো পড়তে ভুলে গিয়েছিল। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক যখন মক্কায় তাদের যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উন্মোচন করে, তখন এর ভাষা ছিল অত্যন্ত মহৎ-ভ্রাতৃত্ব, প্রতিরোধ, সংহতি ও সাধারণ নিরাপত্তা। বিশ্বকে বলা হয়েছিল যে, যেকোনো একটি দেশের ওপর আক্রমণকে সব দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর মতো এর মধ্যেও একটি শক্তিশালী নিরাপত্তার আশ্বাস ছিল। তবে এতে যোগ হয়েছিল আরও সুন্দর দৃশ্যপট, ভ্রাতৃত্বের তীব্র আহ্বান এবং পরবর্তীতে প্রমাণিত পরিস্থিতি অনুযায়ী কিছু স্থিতিস্থাপক ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা।
কিন্তু যখন সত্যি সত্যি সৌদি আরব আক্রান্ত হলো, তখন ভ্রাতৃত্বের আবেগ হঠাৎ করেই যেন চুক্তিভিত্তিক আইনের কঠোর অনুশাসনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেল। পাকিস্তান এমন একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল যার সবচেয়ে স্মরণীয় প্রতিশ্রুতি ছিল যেকোনো একের ওপর আক্রমণকে সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে দেখা, কিন্তু রিয়াদ আক্রান্ত হতেই ইসলামাবাদ দ্রুত পরিষ্কার করে জানিয়ে দেয় যে কোনো সামরিক প্রতিক্রিয়া তাদের আলোচনায় নেই। আনসারুল্লাহ বা হুথি আন্দোলন, যারা উত্তর ইয়েমেনের বেশির ভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করার ব্যাপারে আঙ্কারার মধ্যেও খুব একটা আগ্রহ দেখা যায়নি।
এমন বাস্তবতায় মনে হওয়া স্বাভাবিক যে মক্কা চুক্তিতে রিয়াদের আকারের মতো একটি গোপনীয় অনুচ্ছেদ যুক্ত ছিল, যেখানে বলা হয়েছে সৌদি আরবকে সত্যি সত্যি রক্ষা করার জন্য যখন কারও এগিয়ে আসার প্রয়োজন পড়বে, তখন সেই অপ্রীতিকর পরিস্থিতি ছাড়া বাকি সব ক্ষেত্রে যৌথ প্রতিরক্ষা নীতি প্রযোজ্য হবে।
এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে হয়তো ইয়েমেন সম্পর্কিত কোনো বিশেষ শর্ত নজর এড়িয়ে গিয়েছিল। একজন সদস্যের ওপর আক্রমণকে সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে ধরা হবে- যদি না হামলাকারী দলটি অত্যন্ত যুদ্ধ পারদর্শী, ক্ষেপণাস্ত্র সজ্জিত, বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রণালিগুলোর একটির পাশে অবস্থানকারী এবং রিয়াদের অসমাপ্ত যুদ্ধে অংশ নেওয়া আগ্রহীদের অনুশোচনায় ফেলার মতো সক্ষমতাসম্পন্ন হয়। তেমন ক্ষেত্রে চুক্তি বাস্তবায়নের বদলে কেবল পারস্পরিক পরামর্শ করা হবে। তবে এই ধরনের উপহাসমূলক পরিস্থিতির পেছনে একটি বড় সত্য লুকিয়ে আছে। বর্তমানে কেবল এই নতুন চুক্তির নির্ভরযোগ্যতাই পরীক্ষিত হচ্ছে না, বরং পুরনো আঞ্চলিক ব্যবস্থার ক্ষয়িষ্ণু কাঠামোটাই চরম পরীক্ষার মুখে পড়েছে।
সেই ক্ষয়িষ্ণু শৃঙ্খলা দাঁড়িয়ে ছিল এমন কিছু ধারণার ওপর যে সৌদি অর্থ দিয়ে সামরিক আনুগত্য কেনা যায়, আমেরিকান পৃষ্ঠপোষকতা ধন-সম্পদকে সুপ্রিমেসিতে রূপান্তর করে, ইরানের সহযোগীদের চিরতরে ফেলে দেওয়া প্রক্সি হিসেবে বিবেচনা করা যায় এবং রিয়াদ যখন দেখবে যে আমদানিকৃত সামরিক সরঞ্জাম রাজনৈতিক বিজয় এনে দিতে পারছে না, তখন পাকিস্তান বা তুরস্ক স্বেচ্ছায় এসে নিজেদের পেশীতে বল জোগাবে। কিন্তু সেই পুরনো ব্যবস্থাটি এখন তার নিজস্ব বিভ্রান্তির ভারেই ভেঙে পড়ছে। লোহিত সাগরের উপকূলে হুথিদের অগ্রগতি এবং বাব আল-মানদাব সামুদ্রিক প্রণালির চারপাশে তাদের শক্তিশালী অবস্থান মূলত ভৌগোলিক বাস্তবতার এক বড় প্রমাণ। ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত তার হাতে থাকে না যে সবচেয়ে দামি অস্ত্র ব্যবস্থা কিনতে পারে, বরং ক্ষমতা তার হাতেই থাকে যে শেষ পর্যন্ত পরিণতি ভোগ করাতে পারে। সৌদি আরব দশক ধরে আধিপত্যের অস্ত্র কিনেছে, আর ইয়েমেন বছর ধরে সহনশীলতার মনস্তত্ত্ব অর্জন করেছে। এই দুইয়ের পার্থক্য এখন অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রমাণিত হচ্ছে।
কৌশলগতভাবে এই বৈপরীত্য প্রায় দৃষ্টিকটু রূপ নিয়েছে। যে অবকাঠামো সৌদি আরবের দুর্বলতা কমানোর জন্য তৈরি করা হয়েছিল, সেটি নিজেই উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, হুথিরা বাব আল-মানদাবের চারপাশে অসাধারণ প্রভাব অর্জন করেছে। যে রাজ্য একসময় ইয়েমেনকে একটি ঝামেলাপূর্ণ পেছনের উঠান মনে করত, তারা এখন দেখছে যে সেই ইয়েমেনই ঠিক তাদের জরুরি বহির্গমন পথের পাশে বসে আছে। ইতিহাসের একটি নিজস্ব রসিকতা আছে এবং রিয়াদ বর্তমানে সেটিকে অত্যন্ত জটিল বলে মনে করতে পারে। ক্ষমতার ভাষার সাথে যুক্ত রয়েছে আরও গভীর অবমাননা।
বহু দশক ধরে ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক স্থাপত্যটি বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অত্যন্ত সহজ ছিল: আমেরিকা সামরিক প্রাধান্য দিয়েছিল, ইসরায়েল বলপ্রয়োগের শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত করেছিল, উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো অর্থ ও আনুগত্য জুগিয়েছিল এবং ইরানকে প্রতিহত করার লক্ষ্য স্থির রাখা হয়েছিল। সেই কাঠামোতে তেহরানের মিত্রদের নিজস্ব জনসমর্থন, সক্ষমতা বা স্বার্থ থাকা কোনো রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে মনে করা হতো না। বরং তাদের প্রক্সি, মিলিশিয়া, সন্ত্রাসী বা অ-রাষ্ট্রীয় খেলোয়াড় হিসেবে আখ্যা দিয়ে আশ্বস্ত হওয়ার চেষ্টা চলত। কিন্তু বাব আল-মানদাবের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের সমীকরণ বদলে দেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন একটি ‘অ-রাষ্ট্রীয় খেলোয়াড়’ কৌশলগত দিক থেকে মোটেও প্রান্তিক কিছু নয়। যে আন্দোলন বছরের পর বছর বোমাবর্ষণ সহ্য করে টিকে থাকে, ক্রমশ অত্যাধুনিক সামরিক সক্ষমতা অর্জন করে এবং সার্বভৌম সরকারগুলোকে তাদের হিসাব-নিকাশ সংশোধন করতে বাধ্য করে, সেটিকে আর পুরনো ধারণার খাঁচায় বন্দী রাখা যায় না।
হুথিদের প্রক্সি বলে ডাকলেই তাদের ক্ষেপণাস্ত্র অদৃশ্য হয়ে যায় না। কিংবা হিজবুল্লাহকে ইরানি হাতিয়ার বললেই তার রাজনৈতিক বা সামরিক ওজন মুছে যায় না। ওয়াশিংটনের পছন্দের বিশেষণগুলো অবশেষে একটি অপ্রীতিকর সত্যের মুখোমুখি হয়েছে- যেটি হলো কেবল শব্দচয়ন কখনো কৌশল হতে পারে না। এই জায়গাটিতে ইরানের সাফল্যকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বোঝা প্রয়োজন। তেহরান কিন্তু এই অঞ্চলে ওয়াশিংটনের জায়গা দখল করে নতুন আঞ্চলিক আধিপত্যকারী হয়ে ওঠেনি। বরং তার চেয়েও তাৎপর্যপূর্ণ কিছু ঘটেছে- পুরনো সাম্রাজ্যবাদী-রাজতান্ত্রিক জোটটি তাদের তৈরি করে দেওয়া ব্যবস্থা এককভাবে চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা হারিয়েছে। চীন কর্তৃক মধ্যস্থতাকৃত সৌদি-ইরান কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরায় স্থাপন ছিল এই বাস্তবতারই এক প্রাথমিক স্বীকৃতি।
রিয়াদ তেহরানের প্রেমে পড়েনি, আর তেহরানও আল সাউদ রাজপরিবারকে ভালোবেসে ফেলেনি; দুই পক্ষই মূলত অঙ্কের হিসাব বুঝতে পেরেছিল। চিরস্থায়ী সংঘাতের খরচ পাশাপাশি সহাবস্থানের খরচের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফলে সৌদি আরবের প্রতি ইরানের বার্তা কিন্তু ‘আত্মসমর্পণ করো’এমনটি ছিল না, বরং তাদের বার্তা ছিল পরিস্থিতি অনুযায়ী ‘মানিয়ে নাও’। আমাদের একে অপরকে ভালোবাসতে হবে না, কিংবা আদর্শ, মিত্র ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা ভাগ করে নিতে হবে না। কিন্তু তোমরা আর এমন কোনো আঞ্চলিক ব্যবস্থা তৈরি করতে পারবে না যেখানে তোমাদের বন্ধুরা হবে ‘রাষ্ট্র’ আর আমাদের মিত্ররা হবে ‘সন্ত্রাসী’, তোমাদের সামরিক হস্তক্ষেপ হবে ‘নিরাপত্তা’ আর আমাদের পদক্ষেপ হবে ‘অস্থিতিশীলতা’, কিংবা তোমাদের সশস্ত্র সহযোগীরা হবে বৈধ আর আমাদের সঙ্গীরা হবে প্রক্সি।
আমেরিকান অনুমোদন কোনো ধর্মীয় বিধান নয় এবং ওয়াশিংটনের ব্যবহৃত পরিভাষা কোনো আন্তর্জাতিক আইন নয়। ঠিক এই কারণেই মক্কা চুক্তি এত দ্রুত নিজের ভেতরের আসল রূপ প্রকাশ করে ফেলেছে। কাগজে-কলমে এটি রিয়াদকে পাকিস্তান ও তুরস্কের সামরিক সক্ষমতার সাথে যুক্ত করে সৌদি শক্তিকে বড় করে দেখায়। কিন্তু বাস্তবে এটি সৌদি প্রভাবের সীমাবদ্ধতাকেই ফুটিয়ে তুলেছে। সৌদি আরব নিজে যে ইয়েমেন যুদ্ধে নির্ণায়কভাবে জিততে পারেনি, সেই যুদ্ধে জড়ানোর মতো কোনো যুক্তিসঙ্গত স্বার্থ ইসলামাবাদের নেই। অন্যদিকে, আঙ্কারা নিজের লাভ-ক্ষতি দরদাম করে এবং কৌশলগত চাল চেলে চলে; বন্ধুত্বের উপহার হিসেবে তারা নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন কাউকেই দান করে না।
এটিই হচ্ছে ক্ষয়িষ্ণু ব্যবস্থার ধনী শক্তিগুলোর একটি মারাত্মক ভুল- তারা প্রবেশাধিকারের সুযোগকে আনুগত্যের সাথে গুলিয়ে ফেলে। অর্থ দিয়ে অস্ত্র, লবিস্ট, সামরিক ঘাঁটি, জাকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান, পরামর্শক এবং চিরন্তন ভ্রাতৃত্বের ঘোষণা কেনা সম্ভব। কিন্তু যা অর্থ দিয়ে নির্ভরযোগ্যভাবে কেনা যায় না, তা হলো অন্যের উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য অনির্দিষ্টকালের ঝুঁকি নেওয়ার মন মানসিকতা। তাই পশ্চিম এশিয়ার এই নতুন রাজনৈতিক শর্তাবলী এখন অত্যন্ত স্পষ্ট। আমেরিকা এখনও ধ্বংস করতে পারে, ইসরায়েল তছনছ করতে পারে, সৌদি আরব অর্থ খরচ করতে পারে, তুরস্ক কৌশলগত চাল চালতে পারে, পাকিস্তান নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে পারে এবং ইরান সীমা লঙ্ঘন করতে পারে; কিন্তু এদের কেউই নিজেদের শর্ত এককভাবে অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে না।
এই অঞ্চলটি পুরোপুরি ইরানি হয়ে যাচ্ছে না, বরং এটি বহুমাত্রিক ও বহুমুখী রূপ নিচ্ছে। আর একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি কেবল ততটুকুই বাস্তব, যতটুকু যুদ্ধ করতে এর স্বাক্ষরকারী দেশগুলো প্রস্তুত থাকে। মক্কা শহর একটি জমকালো আলোকচিত্র উপহার দিয়েছিল, অন্যদিকে ইয়েমেন তুলে ধরেছে আসল চুক্তির কঠোর শর্তাবলী। যার ফলে রিয়াদ এখন কেবল সেই ছবি বাঁধানো ফ্রেমটি ধরে বসে আছে, আর তার ভেতরে বাকিদের কাউকেই দেখা যাচ্ছে না।
জুনায়েদ এস আহমদ: পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অবস্থিত সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ইসলাম অ্যান্ড ডিকলোনাইজেশনের (সিএসআইডি) পরিচালক। তিনি আইন, ধর্ম ও বৈশ্বিক রাজনীতি বিষয়ে অধ্যাপনা করেন।
(এই লেখাটি এশিয়া পোস্টের সৌজন্যে প্রকাশিত হলো।)