ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালা সংস্কারের নামে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আড়াল এবং মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি অন্তর্ভুক্ত করার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। সংগঠনটি একে ইতিহাস বিকৃতির পরিকল্পিত উদ্যোগ বলে অভিহিত করেছে।
উদীচীর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাবিবুল আলম ও সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন এক বিবৃতিতে বলেছেন, এই ভূখণ্ডের মানুষের স্বাধিকার ও মুক্তির প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ডাকসুর নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। ষাটের দশক থেকে শিক্ষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ডাকসু ভবনেই প্রথম বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হয়। ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নির্মম আঘাতে রক্তাক্ত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। একাত্তরের নয় মাসে অসংখ্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীর জীবন ও রক্ত স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে মিশে আছে। এই গৌরবোজ্জ্বল উত্তরাধিকার কোনোভাবেই মুছে ফেলা বা সংকুচিত করা যাবে না বলে মনে করে উদীচী।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ কার্জন হলে দাঁড়িয়ে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তাঁর ছবি ডাকসু সংগ্রহশালায় স্থান দেওয়া বিশেষভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। একই সময়ে ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল ও স্মারক বাদ দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যে বিশ্ববিদ্যালয় ও ডাকসু বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছিল, সেখানকার সংগ্রামের ইতিহাসকে খণ্ডিত করে জিন্নাহকে সামনে আনা শহীদদের স্মৃতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং জাতির ঐতিহাসিক সত্যের প্রতি চরম অবমাননা বলে মনে করে উদীচী। ‘ইচ্ছা হয়নি তাই রাখিনি’—এ ধরনের বক্তব্যও ইতিহাস ও জনগণের প্রতি চরম অবজ্ঞা ও অশ্রদ্ধাকেই প্রকাশ করে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
উদীচী অবিলম্বে ডাকসু সংগ্রহশালা থেকে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি অপসারণ এবং ভাষা আন্দোলন থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত গণসংগ্রামের ধারাবাহিক ও বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস যথাযথভাবে পুনঃস্থাপনের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধে শহীদ শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সকল শহীদের আত্মত্যাগের যথাযথ স্মারক ও দলিল সংগ্রহশালায় অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। ইতিহাস বিকৃতির সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
উদীচী মনে করে, একটি জাতির ইতিহাস থেকে তার সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের অধ্যায় মুছে ফেলার চেষ্টা আসলে তার আত্মপরিচয়কে দুর্বল করার অপচেষ্টা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ডাকসুর মুক্তিসংগ্রামের ঐতিহ্য কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়, এটি বাংলাদেশের মানুষের রক্তে অর্জিত জাতীয় উত্তরাধিকার। তাই ইতিহাস বিকৃতির যেকোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং নাগরিক সমাজকে সোচ্চার ও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী।