মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন এক সমীকরণের ইঙ্গিত দিয়েছে। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে বলা হয়েছে, কোনো এক সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে। ফলে চুক্তিটিকে অনেকে সম্ভাব্য ‘মুসলিম ন্যাটো’র সূচনা হিসেবে দেখছেন। তবে বাস্তবতা বলছে, এখনই একে পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোট বলা কঠিন। দ্য ক্রেডেলের বিশ্লেষণে এভাবেই নতুন সামরিক জোটের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
চুক্তির সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। ইয়েমেনে সংঘাত, লোহিত সাগরে নিরাপত্তা সংকট এবং ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে সৌদি আরব তার নিরাপত্তা কাঠামো নতুন করে সাজাতে চাইছে। দীর্ঘদিন রিয়াদ যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু ২০১৯ সালে সৌদি তেল স্থাপনায় বড় হামলার পরও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক প্রতিক্রিয়া না দেখানো এবং সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাতে ওয়াশিংটনের ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা সৌদি নেতৃত্বকে বিকল্প নিরাপত্তা অংশীদার খুঁজতে উৎসাহিত করেছে।
এই বাস্তবতায় পাকিস্তান ও তুরস্ক সৌদি আরবের কাছে স্বাভাবিক অংশীদার হয়ে ওঠে। পাকিস্তানের রয়েছে বড় সামরিক বাহিনী ও পারমাণবিক সক্ষমতা। তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য এবং তার প্রতিরক্ষা শিল্প দ্রুত শক্তিশালী হয়েছে। ফলে তিন দেশের সামরিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও কৌশলগত অবস্থান একে অপরকে পরিপূরক করতে পারে। তবে চুক্তির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এর বাস্তব সামরিক কাঠামো কোথায়? এখনো প্রকাশ্যে আসেনি পূর্ণাঙ্গ চুক্তির সব ধারা। যৌথ কমান্ড, সংকটকালে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের নিয়ম, অস্ত্র ও সেনা পাঠানোর বাধ্যবাধকতা কিংবা চুক্তির সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমা—কোনোটিই পরিষ্কার নয়। অর্থাৎ ‘একজনের ওপর হামলা মানে সবার ওপর হামলা’ নীতিটি রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলেও বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে, তা এখনো অনির্ধারিত।
এখানেই ‘মুসলিম ন্যাটো’ ধারণাটির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়। ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এর মতো নীতিগত কাঠামো থাকলেও ন্যাটোর মতো সুসংহত কমান্ড, যৌথ পরিকল্পনা ও দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক সামরিক ব্যবস্থা এই জোটের নেই। তাছাড়া তিন দেশের নিরাপত্তা অগ্রাধিকারও এক নয়। পাকিস্তানের প্রধান নিরাপত্তা উদ্বেগ ভারত ও আফগানিস্তানকে ঘিরে। সৌদি আরবের প্রধান লক্ষ্য উপসাগরীয় স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক রূপান্তর। আর তুরস্কের দৃষ্টি বিস্তৃত—সিরিয়া, পূর্ব ভূমধ্যসাগর, কৃষ্ণসাগর, ন্যাটো এবং নিজস্ব আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার তার কৌশলের অংশ।
মিশরের অনুপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও কায়রো চুক্তিতে যোগ দেয়নি। এর কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা ধরে রাখার প্রয়োজনকে। মিশর মনে করে, এই জোট এখনো সামরিক সক্ষমতার চেয়ে রাজনৈতিক ঐক্যের প্রতীক বেশি। তাই ভবিষ্যতে আরও দেশ যোগ দেবে কি না, সেটিও অনিশ্চিত।
ইরানকে নিয়েও চুক্তির তাৎপর্য রয়েছে। যদিও পাকিস্তান ও তুরস্ক উভয়েই বলেছে, কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে এই জোট গঠিত হয়নি, তবু আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের প্রশ্নে ইরান স্বাভাবিকভাবেই এর দিকে নজর রাখবে। কারণ সৌদি আরবের প্রধান নিরাপত্তা উদ্বেগের একটি বড় অংশ ইরান ও তার মিত্রদের ঘিরে। তবে চুক্তির ‘সম্মিলিত প্রতিরক্ষা’ ধারা আঞ্চলিক অভ্যন্তরীণ সংঘাতে কতটা প্রযোজ্য হবে, সেটিও অস্পষ্ট।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াশিংটন প্রকাশ্যে চুক্তির বিরোধিতা করেনি। এর একটি ব্যাখ্যা হতে পারে, আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নিরাপত্তার চাপ কমবে। আবার অন্য ব্যাখ্যায়, এই জোট ইরানের প্রভাব মোকাবিলায় পরোক্ষভাবে মার্কিন স্বার্থকেই সহায়তা করতে পারে। ফলে চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী কোনো সামরিক কাঠামো হিসেবে গড়ে উঠবে—এমন সম্ভাবনা আপাতত দুর্বল।
চুক্তিটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক অর্থনীতি। পাকিস্তান ও তুরস্ক উভয়েরই সৌদি বিনিয়োগ ও বাজার প্রয়োজন। সৌদি আরব তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পের বড় ক্রেতা হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে পাকিস্তান সৌদি আর্থিক সহায়তা থেকে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা পাচ্ছে। ফলে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এখানে অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের সঙ্গেও যুক্ত।
সুতরাং মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ‘মুসলিম ন্যাটো’ বলা এখনই অতিরঞ্জিত হবে। বরং এটি মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তির মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতার একটি নতুন প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি। এর সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হলো—সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক নিজেদের নিরাপত্তা স্বার্থে বহুমুখী অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে চাইছে এবং একক কোনো পরাশক্তির ওপর নির্ভরতা কমানোর বার্তা দিচ্ছে।
তবে এই চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে ঘোষণার চেয়ে বাস্তব পদক্ষেপের ওপর। যৌথ কমান্ড তৈরি হবে কি না, সামরিক মহড়া ও গোয়েন্দা সহযোগিতা কতটা বাড়বে, সংকটে এক দেশ অন্য দেশের জন্য কতটা ঝুঁকি নেবে এবং নতুন সদস্য যুক্ত হবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে মক্কা চুক্তি ইতিহাসে একটি প্রতীকী রাজনৈতিক ঘোষণা হিসেবে থাকবে, নাকি সত্যিই একটি কার্যকর আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোটে পরিণত হবে। আপাতত এটিকে ‘মুসলিম ন্যাটো’র চেয়ে তিন দেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও পারস্পরিক নিরাপত্তা সহযোগিতার উচ্চাভিলাষী সূচনা বলাই বেশি যুক্তিসঙ্গত।