সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান বিশ্বের শীর্ষ তেল রফতানিকারক দেশ, ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তি এবং একমাত্র মুসলিম পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ।
এই তিন শক্তির মেলবন্ধনে আত্মপ্রকাশ করেছে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’।
গত শুক্রবার সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের শীর্ষ নেতারা ঐতিহাসিক এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, চুক্তির মূল লক্ষ্য- যৌথ প্রতিরোধের মাধ্যমে যেকোনো বাহ্যিক আক্রমণ মোকাবিলা করা।
এতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, চুক্তিভুক্ত যেকোনো একটি দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা বাকি দুটি দেশের ওপর হামলা হিসেবেই গণ্য হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র আঞ্চলিক উত্তেজনার আবহেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হলো।
বিশেষ করে ইসরায়েলের সামরিক বিস্তার এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধি নিয়ে দেশগুলোর যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে এই জোটে।
সামরিক দিক থেকে এই তিন দেশ মিলে গড়ে তুলেছে এক শক্তিশালী ব্লক। সৌদি আরবের রয়েছে বিশাল অর্থনৈতিক শক্তি ও জ্বালানি সম্পদ, তুরস্কের রয়েছে ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম আধুনিক সেনাবাহিনী, আর পাকিস্তানের কাছে রয়েছে পারমাণবিক সক্ষমতা।
আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা সূচক 'গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্স ২০২৬' এর তথ্য অনুযায়ী, নিচে এই তিন দেশের সম্মিলিত স্থলাভিযান, বিমান ও নৌশক্তির একটি চিত্র তুলে ধরা হলো।
তিন দেশের স্থল, বিমান ও নৌশক্তি
বিশ্বের ১৪৫টি দেশের সামরিক সক্ষমতা মূল্যায়নকারী সংস্থা 'গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ারের' ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই তিন দেশের মোট সক্রিয় সেনা সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ।
তাদের কাছে রয়েছে তিন হাজার ৪০০টিরও বেশি বিমান ও হেলিকপ্টার, প্রায় ছয় হাজার ট্যাংক এবং ৩৪০টির বেশি নৌ-যুদ্ধজাহাজ ও জলযান। সামরিক জনবল, সরঞ্জাম, প্রাকৃতিক সম্পদ, অর্থায়ন ও ভৌগোলিক অবস্থানের মতো নানা দিক বিবেচনা করে এই সূচক তৈরি করা হয়।
সামরিক জনবল: তিন দেশের যৌথ সক্রিয় সেনা সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ। এছাড়া, রয়েছে বড় আকারের আধা-সামরিক ও রিজার্ভ বাহিনী। ছয় লাখ ৬০ হাজার সক্রিয় সেনা নিয়ে এ তালিকায় শীর্ষে পাকিস্তান। দ্বিতীয় স্থানে থাকা তুরস্কের সক্রিয় সেনা চার লক্ষ ৮১ হাজার এবং সৌদি আরবের রয়েছে দুই লক্ষ ৪৭ হাজার সেনা।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ছবি: রয়টার্স
বিমানবাহিনী: তিনটি দেশের হাতে রয়েছে যৌথভাবে তিন হাজার ৪১৫টি সামরিক বিমান। এর মধ্যে ফাইটার জেট, হেলিকপ্টার, পরিবহন ও প্রশিক্ষণ বিমান রয়েছে। বিমানবহরে সবচেয়ে এগিয়ে পাকিস্তান (১,৩৯৭টি)। এরপর রয়েছে তুরস্ক (১,১০১টি) ও সৌদি আরব (৯১৭টি)।
স্থলবাহিনী: এই জোটের সামরিক বহরে রয়েছে প্রায় ছয় হাজার ৪৬টি ট্যাংক, এক লাখ ৭৯ হাজারের বেশি সাঁজোয়া যান, হাজার হাজার কামান ও রকেট লঞ্চার। সবচেয়ে বেশি ট্যাংক রয়েছে পাকিস্তানের (২,৬৭৭টি)। তুরস্কের রয়েছে দুই হাজার ২৮৪টি এবং সৌদি আরবের এক হাজার ৮৫টি ট্যাংক।
নৌবাহিনী: তিন দেশের সম্মিলিত নৌবহরে মোট ৩৪৪টি জলযান রয়েছে। এর মধ্যে ৩৩টি ফ্রিগেট, ২৪টি কর্ভেট এবং ২২টি সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ অন্তর্ভুক্ত। নৌ শক্তিতে এগিয়ে তুরস্ক (১৯২টি জলযান)। পাকিস্তানের রয়েছে ১২০টি এবং সৌদি আরবের ৩২টি যুদ্ধজাহাজ ও জলযান।
সামরিক বাজেট: প্রতিরক্ষা খাতে এই তিন দেশের বার্ষিক সম্মিলিত বাজেট প্রায় ১২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার (১২৪.৪ বিলিয়ন ডলার)। প্রতিরক্ষা ব্যয়ে সবচেয়ে এগিয়ে সৌদি আরব; ২০২৬ সালে তাদের বরাদ্দ ছিল ছয় হাজার ৩৯০ কোটি ডলার। বিপরীতে তুরস্কের বাজেট পাঁচ হাজার ১৪০ কোটি এবং পাকিস্তানের ৯১০ কোটি ডলার।
একে অন্যের পরিপূরক শক্তি
মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক রাজনৈতিক ঝুঁকি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ জানান, এই চুক্তির আসল শক্তি লুকিয়ে আছে তিন দেশের ভিন্ন ভিন্ন সামরিক সক্ষমতা এক সুতোয় বাঁধা পড়ার মধ্যে।
তার মতে, “সৌদি আরব দেবে বিশাল মূলধন, কৌশলগত অবস্থান, অবকাঠামো ও রাজনৈতিক প্রভাব।
অন্যদিকে তুরস্কের রয়েছে উন্নত সামরিক-শিল্প ভিত্তি, আধুনিক ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, সেন্সর প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, নৌ-সিস্টেম এবং ন্যাটোভিত্তিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা।”
“একইভাবে পাকিস্তান জোগাবে বিশাল পেশাদার সৈন্যবাহিনী, যুদ্ধের বাস্তব অভিজ্ঞতা, নিজস্ব অস্ত্র উৎপাদন ক্ষমতা এবং পারমাণবিক প্রতিরোধ শক্তি।”
এই জোটের অর্থ কার জন্য কী?
সৌদি আরব: হরমুজ প্রণালী ও বাব আল-মানদেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্য পথগুলোতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে। এই চুক্তির মাধ্যমে রিয়াদ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে তাদের প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বে বৈচিত্র্য আনল।
একই সঙ্গে তুরস্কের উন্নত প্রযুক্তি ও পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তিকে পাশে পেল।
পাকিস্তান: বিশ্বের যে নয়টি দেশের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, পাকিস্তান তার একটি। ১৯৯৮ সালে দেশটি প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়। ২৫ কোটির বেশি জনসংখ্যার এই দেশটি অস্ত্র আমদানির জন্য মূলত চীনের ওপর নির্ভরশীল।
তুরস্ক: ১৯৫২ সালে ন্যাটোতে যোগ দিলেও তুরস্কের নিজস্ব কোনো পারমাণবিক অস্ত্র নেই। তবে ন্যাটোর অংশীদারিত্ব চুক্তির আওতায় নিজ দেশে মার্কিন পারমাণবিক বোমা বা ওয়ারহেড সংরক্ষণ করে তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা ডেভিড ডেস রচেস জানান, পশ্চিমা দেশগুলো থেকে সময়মতো অস্ত্র পাওয়ার অনিশ্চয়তা দূর করতেই সৌদি আরব এই বিকল্প পথ বেছে নিয়েছে। তুরস্ক ও পাকিস্তান চাইলেই দ্রুত বড় পরিসরে ১৫৫ মি. মি. আর্টিলারি শেলের মতো প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করতে পারবে।
অন্যদিকে, তুরস্ক ও পাকিস্তানের জন্য এই চুক্তি সৌদি আরবের বিশাল আর্থিক ও সামরিক বাজারে প্রবেশের বড় সুযোগ তৈরি করল। কারণ, দুটি দেশেরই অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা তাদের নিজেদের চাহিদার চেয়ে বেশি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাইদ এম বেলবাগি জানান, ওয়াশিংটনের জন্যও এই চুক্তির হিসাব-নিকাশ বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
পাকিস্তান মার্কিন সহায়তার ওপর নির্ভর করে, সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের বড় ক্রেতা, আর তুরস্ক হচ্ছে ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী।
তাই এই সমঝোতার নেপথ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বেশ কৌতূহল উদ্দীপক।
আন্দ্রেয়াস ক্রিগ মনে করেন, গোয়েন্দা তথ্য, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির জন্য এখনো মার্কিন সহায়তা জরুরি।
তবে আঞ্চলিক শক্তিগুলো এখন আর শুধু ওয়াশিংটন নির্ভর না থেকে নিজেদের মধ্যকার সম্পদ যোগ করে শক্তি বাড়াতে চাইছে।
“আগের নিরাপত্তা মডেলটি ছিল চাকার কেন্দ্র থেকে ছড়িয়ে পড়া স্পোকের মতো- যার কেন্দ্রে ছিল ওয়াশিংটন এবং বাকি দেশগুলো নিরাপত্তার জন্য কেবল আমেরিকার দিকে চেয়ে থাকত। কিন্তু এখন যা তৈরি হচ্ছে, তা হলো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে সরাসরি অনুভূমিক সংযোগ” বলেন ক্রিগ।
নতুন করে যোগ দিতে পারে কোন দেশ?
চুক্তি স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর বাইরে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কেবল মিসরের নাম আলোচনায় এসেছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান মিসরকে এই জোটের এক ‘স্বাভাবিক অংশীদার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
কারিগরি বিষয়গুলো সমাধান হলেই কায়রো এতে যোগ দেবে বলে আশা করছেন তিনি।
ক্রিগ উল্লেখ করেন, মিসরের বিশাল সামরিক বাহিনী, কৌশলগত অবস্থান এবং সুয়েজ খালের ওপর নিয়ন্ত্রণ এই জোটকে সামরিক ও কৌশলগতভাবে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে যাবে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, মিসর হয়তো সরাসরি কোনো সামরিক বাধ্যবাধকতায় জড়াতে বা বিদ্যমান চুক্তিগুলোর ওপর প্রভাব পড়ে- এমন কিছু করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক গবেষণা সংস্থা ‘চ্যাথাম হাউসের’ গবেষক করিম এলগেন্দি বলেন, “মিসর তখনই এতে যুক্ত হবে, যখন নিশ্চিত করা হবে যে এই চুক্তি ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের সামরিক সহায়তার সম্পর্ককে ক্ষুণ্ন করবে না, আগের শান্তি চুক্তিগুলোকে ঝুঁকিতে ফেলবে না এবং কখন ও কোথায় যুদ্ধ করবে- সেই স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কায়রোর হাতেই থাকবে।”