কোনো ধরনের পূর্ব ঘোষণা ছাড়া ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া, আর তীব্র গরমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকা—গত এক সপ্তাহ ধরে এভাবেই কাটে সিলেট নগরবাসীর দিনরাত্রি। এই নজিরবিহীন লোডশেডিংয়ে শিক্ষার্থী, ছোট-বড় ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীসহ সর্বস্তরের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা কার্যত স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। ক্ষুব্ধ নাগরিকরা এরই মধ্যে নগরীর বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ সমাবেশও করেছেন।
নগরীর বাসিন্দাদের প্রধান অভিযোগ—কখন বিদ্যুৎ যাবে আর কখন আসবে, তার কোনো নির্দিষ্ট শিডিউল না থাকায় দৈনন্দিন কাজের কোনো পরিকল্পনা করা যাচ্ছিল না।
খাসদবীর এলাকার বাসিন্দা ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা নাসিমা আক্তার তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে বাসাবাড়ির দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে। রান্নাবান্না ও খাওয়াদাওয়া ঠিকমতো করা যাচ্ছে না। স্কুলে গিয়েও দেখা যাচ্ছে বিদ্যুৎ না থাকায় বাচ্চাদের নানা সমস্যা হচ্ছে। অনেকে বাসায় ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারছে না। তাছাড়া কারও কারও মাথাব্যথা, শরীর ঝিমঝিম করাসহ শারীরিক নানা সমস্যাও দেখা দিচ্ছে।”
বিদ্যুৎনির্ভর সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজের গতি নেমে এসেছে শূন্যের কোঠায়। রাজা ম্যানশনের ‘আনন্দ গ্রাফিক্স ও প্রকাশন’-এর স্বত্বাধিকারী বিমান তালুকদার নিজের দুশ্চিন্তার কথা জানিয়ে বলেন, “গত কয়েকদিনে কাস্টমারের দেওয়া অনেক কাজ আটকে আছে। গত এক সপ্তাহে যেভাবে চলছিল, এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা লাটে উঠতে বেশি দিন লাগবে না। বড় দুশ্চিন্তায় ছিলাম! আজ কারেন্ট থাকায় কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে, দু-একজনের কাজ কমপ্লিট করতে পেরেছি।”
সিলেট বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত ৬-৭ দিন সিলেটে চাহিদার তুলনায় ৩০ শতাংশেরও বেশি লোডশেডিং করতে হয়েছে। এর নেপথ্যে কাজ করেছে মূলত দুটি যান্ত্রিক ও জোগানজনিত কারণ।
জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সংকট: সামুদ্রিক এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের কারণে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়। পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় দেশের বেশ কয়েকটি পাওয়ার স্টেশন বন্ধ হয়ে যায়, যার প্রভাব পড়ে সিলেটের বিদ্যুৎ বরাদ্দে।
কুমারগাঁও কেন্দ্রে যান্ত্রিক ত্রুটি: স্থানীয়ভাবে সিলেটে কুমারগাঁও ২২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের ‘স্টিম টারবাইন’-এ যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দেয়। ফলে ২২৫ মেগাওয়াটের এই কেন্দ্রটি থেকে বর্তমানে মাত্র ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে, অর্থাৎ ১২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন আটকে আছে।
মোবাইল ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে পড়াশোনা করছেন এক শিক্ষার্থী। ছবি: চরচা
বিদ্যুৎ ঘাটতির সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সিলেট পিডিবির সহকারী প্রকৌশলী জারজিসু রহমান রনি বলেন, “গত বুধবার সর্বোচ্চ চাহিদার সময় (পিক আওয়ারে) ২৫৫ থেকে ২৭০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ২১০ মেগাওয়াট। আর সর্বনিম্ন চাহিদার সময় (অফ-পিক আওয়ারে) ২০০ মেগাওয়াটের বিপরীতে ১৭৫ মেগাওয়াট সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছিল।”
আজ সকাল থেকে এলএনজি গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হতে শুরু করায় এবং দেশের বেশ কিছু বন্ধ থাকা পাওয়ার স্টেশন চালু হওয়ায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। আজ থেকে সিলেটে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেছে পিডিবি।