ভারতের সঙ্গে এবার সরাসরি রেলপথে যোগাযোগ স্থাপন করতে চাইছে রাশিয়া। দেশটির সংবাদ সংস্থা তাসকে এ কথা জানিয়েছেন রুশ উপ-প্রধানমন্ত্রী মারাত খুশনুলিন।
তাসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খুশনুলিন বলেন, বসফরাস ও হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরতা কমাতে রাশিয়ার বিকল্প স্থলপথ নিয়ে ভাবা উচিত।
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে বাধা প্রতিনিয়তই বাড়ছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই বিকল্প বাণিজ্যপথ তৈরির এই প্রস্তাব সামনে এল।
গত ৭ আগস্ট নয়াদিল্লিতে ভারত-রাশিয়া আধুনিকায়ন ও শিল্প সহযোগিতা বিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের দ্বাদশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দুই দেশ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি টিভি১৮ এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বৈঠকে রেল পরিবহন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়। এর মধ্যে রেল অবকাঠামো, বন্দে ভারত ট্রেন এবং রেলওয়ের সিগন্যালিং সরঞ্জাম নিয়ে সহযোগিতার বিষয় ছিল। এ ছাড়া খনি, সার, চালকবিহীন আকাশযান, থ্রিডি প্রিন্টিং, রাশিয়ার এসজে-১০০ আঞ্চলিক বিমান এবং বিমানের ইঞ্জিন তৈরির বিষয়েও দুই দেশ আলোচনা করেছে।
রাশিয়ার এ প্রস্তাবের কারণ কী?
তাসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সম্ভাব্য রুট সম্পর্কে খুশনুলিন জানান, বিকল্প এই পথ তুর্কমেনিস্তান, ইরান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে যেতে পারে। ভারত পর্যন্ত যোগাযোগ তৈরি করতে পারে–এমন যেকোনো রুটকে কার্যকর হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: রয়টার্স
ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভি বলছে, প্রস্তাবিত এই নেটওয়ার্ক বাস্তবায়িত হলে রাশিয়া ও ভারতের মধ্যে সরাসরি স্থলপথে রেল-পণ্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি হবে।
খুশনুলিন তাসকে বলেন, “ভারত মহাসাগর পর্যন্ত একটি রেলপথ করা যায় কি না, ভেবে দেখা উচিত। বসফরাস ও হরমুজ প্রণালিতে ঝুঁকির কারণে বিকল্প পথের প্রয়োজন হতে পারে। এই রুট তুর্কমেনিস্তান, ইরান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে যেতে পারে। ভারতের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হয় এমন যে কোনো বিকল্পই গ্রহণযোগ্য।”
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে একযোগে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসারায়েল। জবাবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ইসরায়েল, বাহরাইন, জর্ডন, ইরাক, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে। সেই সঙ্গে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতেও ইরান অবরোধ ঘোষণা করে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। তাসের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের প্রায় ২৫ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হলো বসফরাস প্রণালি। এটি কৃষ্ণ সাগরকে মারমারা সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তুরস্কের হাতে। তবে উদ্বেগ বাড়লেও তুরস্ক জানিয়েছে, বসফরাস প্রণালি এখনো খোলা রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে চলমান এই উত্তেজনার কারণে সমস্যায় পড়েছে ভারত ও রাশিয়া দুই দেশই। এবার সেই সমস্যার সমাধানেই এই বড় বিকল্পের কথা ভাবছে রাশিয়া।
সিএনবিসি টিভি১৮ বলছে, প্রস্তাবিত রেলপথ চালু হলে রাশিয়া এসব গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে ভারত মহাসাগরের দিকে পণ্য পরিবহনের বিকল্প ব্যবস্থা পাবে।
রাশিয়ার আন্তর্জাতিক রেলপথ
রাশিয়ার আগে থেকেই একটি বড় আন্তর্জাতিক রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে। রাশিয়ার সরকারি রেল সংস্থা ফেডারেল প্যাসেঞ্জার কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, দেশটির যাত্রীবাহী রেল ব্যবস্থা ইউরোপ ও এশিয়ার ১৯টি দেশের সঙ্গে ৪০টি আন্তর্জাতিক দূরপাল্লার রুটে চলাচল করে।
এই দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে চীন, মঙ্গোলিয়া, উত্তর কোরিয়া, কাজাখস্তান, কিরঘিজিস্তান, উজবেকিস্তান, আজারবাইজান, বেলারুশ, মলদোভা, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, পোল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া, এস্তোনিয়া ও ফিনল্যান্ড।