মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি পদে যাওয়া প্রায় নিশ্চিত হওয়ার পর বিএনপির ভেতরে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- দলের পরবর্তী মহাসচিব কে?
আলোচনায় আছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সমীকরণে সালাহউদ্দিন আহমদের নামই তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে দলীয় সূত্রগুলো বলছে।
এর পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে সামনে আসছে তার সম্ভাব্য মন্ত্রণালয় পরিবর্তন।
দল ও সরকারের একাধিক সূত্রে জানা যায়, মির্জা ফখরুলের জায়গায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে সালাহউদ্দিন আহমদকে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বর্তমানে সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় স্বরাষ্ট্রের দায়িত্বে রয়েছেন। সেখানে দায়িত্ব পালনের পর তাকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে, কেন এই পরিবর্তন?
দলীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের মন্ত্রণালয় পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন থেকেই এই পরিবর্তন হতে পারে। তবে একই সঙ্গে বিএনপির সাংগঠনিক নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ কাঠামোর সঙ্গেও বিষয়টি সম্পর্কিত হতে পারে বলে মনে করছেন দলের নেতাদের কেউ কেউ।
যদিও, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের জন্য সালাহউদ্দিন আহমদের নাম আলোচনায় এলেও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন হয়নি।
কিন্তু যদি শেষ পর্যন্ত স্বরাষ্ট্র থেকে সালাহউদ্দিন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে যান, তাহলে মহাসচিব পদে তার সম্ভাবনাও অনেকটাই জোরালো হয়ে উঠবে- এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাছাড়া, বিএনপির ইতিহাস বলছে, এই মন্ত্রণালয়টির সঙ্গে দলের মহাসচিব পদের একটি পুরানো রাজনৈতিক যোগসূত্র রয়েছে।
রিজভীও কেন আলোচনায়?
তবে পুরো সমীকরণে রুহুল কবির রিজভীকে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। বিএনপির দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় থাকা, দলের কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার কারণে মহাসচিব হিসেবে রিজভীর নামও জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছে।
আর একটি বিষয় রিজভীকে কিছুটা এগিয়ে দিতে পারে।
তিনি এবারের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেননি এবং মন্ত্রিসভাতেও নেই। ফলে মির্জা ফখরুলের পদত্যাগের পর কাউন্সিল না হওয়া পর্যন্ত তাকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করার সুযোগ তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে বলে দলের কয়েকজন নেতা মনে করছেন।
রিজভী নিজেও অবশ্য মহাসচিব হওয়ার আলোচনা সম্পর্কে প্রকাশ্যে কোনো নিশ্চয়তা দেননি। এ বিষয়ে তার বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে ভালো জানেন।
সালাহউদ্দিন কেন এগিয়ে?
সালাহউদ্দিন আহমদকে মহাসচিবের দৌঁড়ে এগিয়ে রাখার পেছনে সবচেয়ে বড় যুক্তি হিসেবে সামনে আসছে বিএনপির দীর্ঘদিনের একটি রাজনৈতিক রেওয়াজ।
১৯৯১ সালের পর বিএনপি যতবার রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে, ততবারই দলের মহাসচিবের সঙ্গে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের একটি সরাসরি যোগসূত্র দেখা গেছে।
১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করার পর দলের মহাসচিব আবদুস সালাম তালুকদারই দায়িত্ব পেয়েছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের।
২০০১ সালে বিএনপি আবার ক্ষমতায় এলে একই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান দলের তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া। ১৯৯৬ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত বিএনপির মহাসচিব থাকা মান্নান ভূঁইয়া ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীও ছিলেন।
সেই ধারাবাহিকতার সবশেষ উদাহরণ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ২০২৬ সালে বিএনপি সরকার গঠন করার পর দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুলকে দেওয়া হয়েছিল স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও।
প্রায় সাড়ে তিন দশকের এই ধারাবাহিকতাই এখন সালাহউদ্দিন আহমদের সম্ভাবনাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
এখানেই সালাহউদ্দিন আহমদ এগিয়ে থাকছে বলে মনে করছেন দলের অনেকে। তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন এবং একই সঙ্গে তাকে যদি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে বিএনপির আগের তিন মেয়াদের রাজনৈতিক বিন্যাসের সঙ্গেও তা মিলে যাবে।
আবদুস সালাম তালুকদার, আবদুল মান্নান ভূঁইয়া এবং মির্জা ফখরুল- তিনজনের ক্ষেত্রেই দলের মহাসচিবের দায়িত্বের সঙ্গে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিল।
সেই হিসাবে সালাহউদ্দিন আহমদ যদি মির্জা ফখরুলের স্থলাভিষিক্ত হয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেন, তাহলে বিএনপির প্রায় ৩৫ বছরের একটি রাজনৈতিক রেওয়াজও অক্ষুণ্ন থাকবে বলে মনে করছেন দলটির জেষ্ঠ্য নেতৃত্বের অনেকেই।
আর এ কারণেই রুহুল কবির রিজভীর নাম আলোচনায় থাকলেও, বর্তমান সমীকরণে সালাহউদ্দিন আহমদকেই মহাসচিব পদের সবচেয়ে এগিয়ে থাকা প্রার্থী হিসেবে দেখছেন তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুজন এবং সরকারের মন্ত্রিসভায় থাকা একজন ও প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টাও জানিয়েছেন, দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সালাহউদ্দিন আহমদকেই দলের মহাসচিব করার ক্ষেত্রে পছন্দের শীর্ষে রেখেছেন।
স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য চরচাকে বলেন, “আমরা তো আগেই বলেছি, এ ধরনের সিদ্ধান্তের অভিভাবক আমাদের দলীয় প্রধানের। তবে, ব্যক্তিগতভাবে আমার ধারণা সালাহউদ্দিন আহমেদই দলের মহাসচিব হতে পারেন।”
সিদ্ধান্ত কি এত সহজ?
সমীকরণটি এতটা সরল নয়। কারণ বিএনপির মহাসচিব নির্বাচন কেবল মন্ত্রিসভার পদবণ্টনের ওপর নির্ভর করে না। দলের সাংগঠনিক প্রয়োজন, আগামী জাতীয় কাউন্সিল, মাঠপর্যায়ের নেতৃত্ব এবং সরকার ও দলের মধ্যে সম্পর্ক- সবকিছুই বিবেচনায় আসবে।
বিএনপির সর্বশেষ স্থায়ী কমিটির বৈঠক সূত্রে জানা গিয়েছিল, জাতীয় কাউন্সিলের আগে একজনকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হতে পারে। পরে কাউন্সিলের মাধ্যমে স্থায়ী সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
সেই ক্ষেত্রে রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করে দল চালানোর একটি মডেলও সামনে আসতে পারে বলে মনে করছেন দলটির নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ।
আবার সালাহউদ্দিনকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার পাশাপাশি সরাসরি দলের মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়ার পথও খোলা থাকতে পারে।
অর্থাৎ, বিএনপি যদি সরকার ও দলকে কিছুটা আলাদা কাঠামোয় পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে রিজভীর সম্ভাবনা নতুন করে জোরালো হতে পারে।
দলের একজন ভাইস চেয়ারম্যান চরচাকে বলেন, “রাজনীতিতে নানা সমীকরণ থাকে, বৈশ্বিক প্রভাবও একদম উড়িয়ে দেয়া যায় না। সব সমীকরণ মিলিয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো কিছু বলা যায় না। নিশ্চয় আমাদের দলীয় প্রধান একজন উপযুক্ত কাউকেও মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব দেবেন।”
মির্জা ফখরুলের পর বিএনপির নতুন অধ্যায়
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২০১১ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব নেন। ২০১৬ সালের জাতীয় কাউন্সিলে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিব নির্বাচিত হন। ফলে প্রায় দেড় দশক ধরে দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক নেতৃত্ব তার হাতেই ছিল।
দলের রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনয়ন পেয়েই মহাসচিবের পদ ও স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ ছেড়েছেন মির্জা ফখরুল। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে ছাড়তে হবে মন্ত্রিসভার দায়িত্বও। একই সঙ্গে তার ঠাকুরগাঁও-১ আসনও শূন্য হবে।
একজন নেতার বিদায়ের সঙ্গে তাই বিএনপির সামনে একসঙ্গে তৈরি হয়েছে তিনটি বড় শূন্যতা- রাষ্ট্রের শীর্ষ সাংবিধানিক পদে নতুন যাত্রা, সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে নতুন নেতৃত্ব এবং দলের মহাসচিব পদে উত্তরসূরি নির্বাচন।
এই তিন সমীকরণের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মহাসচিবের প্রশ্নটি।
সালাহউদ্দিন আহমদ যদি সত্যিই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছেড়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেন, তাহলে বিএনপির অতীতের রাজনৈতিক রেওয়াজ তার পক্ষে একটি শক্তিশালী যুক্তি হয়ে দাঁড়াবে।
আর সেখানেই বর্তমান হিসাব বলছে, রুহুল কবির রিজভী আলোচনায় থাকলেও সালাহউদ্দিন আহমদই আপাতত মহাসচিবের দৌঁড়ে এগিয়ে থাকা নাম।
তবে শেষ কথা বলবে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় কাউন্সিল।
মির্জা ফখরুলের ১৬ বছরের অধ্যায়ের পর বিএনপির মহাসচিবের চেয়ারটি কার হাতে যায়, সেটিই এখন দলের ভেতরে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন।