
বিচ্ছিন্নতার এই যুগে সমাজের মানবিক রূপান্তরের পথ কী?
“যে জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের—মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা।”–জীবনানন্দ দাশ পঙ্ক্তিটি অনায়াসেই আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয় এক গভীর ও নিগূঢ় সত্তাতাত্ত্বিক সত্যের মুখোমুখি।

রাষ্ট্রপতি পদে শেষ পর্যন্ত বিএনপি দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেই প্রার্থী করেছে। আজ বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে মির্জা ফখরুলের প্রার্থিতা চূড়ান্ত করেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার পরই মির্জা ফখরুল দলের মহাসচিব পদ থেকে সরে দাঁড়ান। ১৯৯১ সালের পর এই প্রথম রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। সেবারে বিরোধী দলের প্রার্থী ছিলেন বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী, এবারে এলডিপি প্রধান অলি আহমদ, বীর বিক্রম।
রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী নিয়ে বিএনপির মধ্যে গত কয়েকদিন ধরেই নানামুখী আলোচনা চলছিল। সেটি এ কারণে নয় যে, মির্জা ফখরুলের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ঘাটতি আছে। বরং এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দলের হাল ধরে রাখা ব্যক্তির অনুস্থিতিতে দল ও সরকার পরিচালনায় কী কী সমস্যা হতে পারে, সেটাই ছিল বিবেচনার বিষয়। রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার পাশাপাশি অরাজনৈতিক দু-একজন আলোচিত ব্যক্তির নামও শোনা গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত বিএনপি ‘অরাজনৈতিক বৃত্ত’ থেকে বেরিয়ে দলের পরীক্ষিত নেতাকেই বেছে নিল।
অতীতে বিএনপি যাদের রাষ্ট্রপতি পদে বেছে নিয়েছিল, তাদের মধ্যে আবদুর রহমান বিশ্বাস ছাড়া কেউ আস্থা রাখতে পারেননি। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব বদরুদ্দোজা চৌধুরী রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর ৭ মাসের মাথায় বিদায় নেন, বিএনপি নেতৃত্বের আস্থা হারানোর কারণে। অন্যদিকে, দলের বাইরে থেকে আসা অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মদ এক-এগারোর কুশীলবের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করেন এবং তাকে দিয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযান পরিচালনা করে তৎকালীন সরকার। সেই সময়ে বিএনপিকে বিভক্ত করারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত সেটি সফল হয়নি।
১৯৮১ সালে ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার প্রথমে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও পরে স্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন। কিন্তু তার নির্বাচনের কয়েক মাসের মাথায় সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে। সেই সময়ে বিএনপির নেতৃত্বের একাংশ এরশাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিএনপি ভাঙেন।
তবে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা ক্ষমতাসীন বিএনপির অনুকূলে। রাজনীতির মাঠে বিএনপির ‘চিরশত্রু’ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসন আছে। জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির নেতৃত্বে যে বিরোধী দল আছে, ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো শক্তি তাদের নেই বলেই মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। সংসদের প্রথম দুই অধিবেশনেও তারা খুব ভালো করেছে, এটাও বলা যাবে না। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও জনজীবনের মৌলিক সমস্যাগুলো নিয়ে বিরোধী দল সরকারকে কোণঠাসা না করে জুলাই সনদ ও গণভোট ইত্যাদি নিয়েই বেশি সময় ব্যয় করেছে।
এই মুহূর্তে বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বিরোধী দল নয়। বরং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, বেকারত্ব সমস্যা ও আইন-শৃঙ্খলার অবনিত কীভাবে মোকাবিলা করবে- সেটাই মাথা ব্যথার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় দুই দশক পর ক্ষমতায় আসা দলটির একশ্রেণির নেতা-কর্মীদের মধ্যে বেপরোয়া ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এলাকার কর্তৃত্ব নিয়েও বিভিন্ন স্থানে তারা আত্মঘাতী সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছেন। এ অবস্থায় দলীয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে দলীয় প্রধানের পর যে ব্যক্তিটির প্রতি দলের নেতা-কর্মীরা ভরসা করেন, তিনি ছিলেন ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপি মহলে এই আলোচনাও আছে যে, দলের বেশির ভাগ নেতা নিজস্ব কোটারি বা বলয় রক্ষা করে চললেও মির্জা ফখরুল এর বাইরে ছিলেন। তদুপরি সরকারের সবচেয়ে বড় মন্ত্রণালয় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার কারণে দলের তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সরকারে আসার পরও তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। দলের বাইরে রাজনৈতিক মহলেও তার ভাবমূর্তি প্রায় বিতর্কহীন।
এ রকম একজন নেতার শূন্যস্থান পূরণ করা বিএনপির জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হওয়ায় এই মুহূর্তে চারটি গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য হয়ে যাবে বা গিয়েছে। এসব শূন্য পদ পূরণের বিষয়টি সামনে এসেছে। ইতিমধ্যে তিনি মহাসচিব পদে ইস্তফা দিয়েছেন। সে ক্ষেত্রে দল একজনকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেবে এবং পরবর্তী সম্মেলনে নতুন মহাসচিব নির্বাচিত করবে। কিন্তু সেই সম্মেলন কবে হবে, তা এখনো স্থির করতে পারেনি বিএনপি।
প্রথমে বলা হয়েছিল, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগেই করা হবে। কিন্তু নির্বাচনের আগে দলের সম্মেলন স্থানীয় পর্যায়ে বিভক্তি বাড়াতে পারে, এই চিন্তা থেকে পিছিয়ে দেওয়া হতে পারে। দ্বিতীয়ত, মির্জা ফখরুল একই সঙ্গে দলের মহাসচিব ও সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন। তৃতীয়ত, ঠাকুরগাঁয়ে তার ছেড়ে দেওয়া আসনে কে মনোনয়ন পাবেন, সেটাও দেখার বিষয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে পেয়েছিলেন দুই লাখ ৩৮ হাজার ৮৩৬ ভোট এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন এক লাখ ৪১ হাজার ১৭ ভোট। উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী কে হবেন, তার ওপরও জয়-পরাজয় নির্ভর করবে। মির্জা ফখরুল পদাধিকার বলে স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। সে ক্ষেত্রে নতুন মহাসচিব হয়তো তার শূন্যস্থান পূরণ করবেন।
সরকারের সামনে আরেকটি প্রশ্ন ছিল নতুন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী কে হবেন? উত্তর এরই মধ্যে পাওয়া গেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মন্ত্রিসভায় রদবদল করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব যাচ্ছে সালাহউদ্দিন আহমদের কাঁধে। আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পাচ্ছেন শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। তার এই স্থানান্তরে শূন্য হওয়া পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কার কাঁধে যাচ্ছে- তা অবশ্য এখনো নিশ্চিত নয়। তবে দ্রুতই সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে বিএনপি। বিশেষত গুরুত্বপূর্ণ দুই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বণ্টন অনেক দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করেছে দলটি।
জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে অলি আহমদকে প্রার্থী করা হলেও তার জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কেননা সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি- (ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাহার আসন শূন্য হইবে।”
৭০ অনুচ্ছেদ এখনো বহাল। সে ক্ষেত্রে সরকারি বা বিরোধী দলের কোনো সদস্য নিজ নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দিয়ে সদস্য পদ হারানোর ঝুঁকি নিতে চাইবেন না।
সোহরাব হাসান: সম্পাদক, চরচা

“যে জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের—মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা।”–জীবনানন্দ দাশ পঙ্ক্তিটি অনায়াসেই আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয় এক গভীর ও নিগূঢ় সত্তাতাত্ত্বিক সত্যের মুখোমুখি।

রঞ্জন কর্মকারের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল একান্ত ব্যক্তিগত স্নেহ, শ্রদ্ধা ও পারিবারিক ঘনিষ্ঠতার। বিভুদার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে তিনি আমাদের পরিবারেরও একজন হয়ে উঠেছিলেন। আমার প্রতি তার আচরণ ছিল সবসময় অগ্রজের মতো—স্নেহশীল, আন্তরিক এবং পরামর্শদানে উদার।

১৯৬৬ সালে জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদান শেষে বিজেঞ্জো কোয়েটা ফিরে যাচ্ছিলেন। বালুচ নেতা নওয়াব বুগতি কাগজের মুদ্রায় ‘ওয়ান ইউনিট তোড় দো’ বা এক ইউনিট ছুড়ে ফেলো স্ট্যাম্পে লিখে ছাপ দিতেন।

দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির গৃহীত সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির উৎকর্ষতার পরিচয় বহন করে না।