Chaarcha Logo
Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
১১ অক্টোবর, ২০২৬
১১ অক্টোবর, ২০২৬
Chaarcha logo
সংক্ষেপেকানেক্টম্যাগাজিন

আমরা

আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগবিধিনিষেধ ও শর্তাবলিগোপনীয়তার নীতি
Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
১১ অক্টোবর, ২০২৬
১১ অক্টোবর, ২০২৬
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
Chaarcha logo
সর্বশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
আমরা
  • আমাদের সম্পর্কে
  • যোগাযোগ
  • বিধিনিষেধ ও শর্তাবলি
  • গোপনীয়তার নীতি
এক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণ

সম্পাদক: সোহরাব হাসান, প্রিন্টার্স বিল্ডিং (লেভেল–১৪), ৫ রাজউক অ্যাভিনিউ, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা–১০০০, বাংলাদেশ

|

স্বত্ব © চরচা

Chaarcha Logo
Advertisement
Advertisement
> ভাবনা
পর্ব–৪

টিক্কা খান: বেলুচিস্তানের কসাই

বেলুচিস্তানে চলছে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও স্বাধীনতার লড়াই। প্রাকৃতিক সম্পদে পাকিস্তানের সবচেয়ে সমৃদ্ধ প্রদেশ হওয়া সত্ত্বেও সেখানকার মানুষ সবচেয়ে গরিব। বেলুচদের ইতিহাস ও সংগ্রাম নিয়ে চরচার এই ধারাবাহিক।

সোহরাব হাসান

সোহরাব হাসান

প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০২৬, ২২: ০৬
টিক্কা খান: বেলুচিস্তানের কসাই
টিক্কা খান। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

১৯৫৮ সালের বিদ্রোহের পর বেলুচিস্তানের একেবারে গহিনে সেনাবাহিনীর একটি নতুন গ্যারিসন স্থাপন করে পাকিস্তান সরকার। এতে বেলুচিস্তানে সশস্ত্র বিদ্রোহ আরও ছড়িয়ে পড়ে, যার একটির নেতৃত্ব দেন শের মোহাম্মদ মারি। তিনি প্রচলিত গেরিলা যুদ্ধের চেয়ে চোরাগোপ্তা হামলার পথ বেছে নেন। দক্ষিণে কালওয়াশ এলাকার মেঙ্গল উপজাতি এবং উত্তরে মারি ও বাগতি উপজাতিদের মধ্যে তারা গেরিলা নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করে। গেরিলারা যানবাহনে গুপ্ত হামলা ও ট্রেনে বোমা নিক্ষেপ করতে থাকে। এর জবাবে সেনাবাহিনী নৃশংস অভিযান চালায়, যাতে নেতৃত্ব দেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল টিক্কা খান। এ কারণেই তাকে বেলুচিস্তানের কসাই বলা হয়। একাত্তরে যিনি বাংলাদেশের কসাই নামে কুখ্যাতি পেয়েছিলেন। ১৯৬৯ সালে এক ইউনিট প্রথা ভেঙে দেওয়া পর্যন্ত বেলুচদের এই যুদ্ধ অব্যাহত ছিল। এরপর বেলুচরা আইউবের উত্তরসূরি ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে ‘যুদ্ধবিরতি’তে সম্মত হয়।

Advertisement

তৃতীয় বালুচ বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে সত্তরের দশকে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) পাঞ্জাব ও সিন্ধুতে জয়ী হলেও বেলুচিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে কোনো আসন পায়নি। দুটিতেই জয়ী হয় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) ও তাদের সমর্থকেরা। তখন ন্যাপের নেতৃত্বে ছিলেন আবদুল ওয়ালি খান ও মির গাউস বক্স বিজেঞ্জো। তারা পাঞ্জাবি ও সিন্ধির আধিপত্য ঠেকাতে ছয় দফার আদলে অধিকতর স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানান। তাদের প্রত্যাশা ছিল, পূর্ব পাকিস্তানে ছয় দফা কার্যকর হলে পশ্চিম পাকিস্তানে ছোট প্রদেশগুলোও স্বায়ত্তশাসনের সুবিধা পাবে। কিন্তু ভুট্টোর একগুঁয়েমির কারণে সেই সংবিধান রচনার প্রয়াস সফল হয়নি। তার আগেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে গণহত্যা শুরু করে এবং নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।

প্রাকৃতিক সম্পদে পাকিস্তানের সবচেয়ে সমৃদ্ধ প্রদেশ হওয়া সত্ত্বেও বেলুচিস্তানের মানুষ সবচেয়ে গরিব। ছবি: রয়টার্স
প্রাকৃতিক সম্পদে পাকিস্তানের সবচেয়ে সমৃদ্ধ প্রদেশ হওয়া সত্ত্বেও বেলুচিস্তানের মানুষ সবচেয়ে গরিব। ছবি: রয়টার্স

Advertisement
Advertisement
Advertisement

১৮ ডিসেম্বর ১৯৭২ ভুট্টো খণ্ডিত পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত হন। বেলুচিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে পিপিপির সমর্থন না থাকায় ভুট্টো প্রাদেশিক সরকার গঠন নিয়ে টালবাহানা করেন। অনেক দেনদরবারের পর ভুট্টো গণরায়ের কাছে নতি স্বীকার করেন। ১৯৭২ সালের ২৮ এপ্রিলে গাউস বক্স বেলুচিস্তানের গভর্নর হিসেবে শপথ নেন। ১ মে ন্যাপের নেতা আতাউল্লাহ মেঙ্গলের নেতৃত্বে গঠিত হয় বেলুচিস্তানের প্রাদেশিক সরকার। এরপর উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশেও( বর্তমান পাখতুন খাওয়া) মুফতি মাহমুদের নেতৃত্বে গঠিত হয় ন্যাপ-জমিয়াতুল উলেমার কোয়ালিশন সরকার। কিন্তু ভুট্টো মনেপ্রাণে তা মেনে নিতে পারেননি। তিনি দুই প্রাদেশিক সরকার উৎখাত করতে নানা কূটকৌশলের আশ্রয় নেন। ইতিমধ্যে বেলুচদের মধ্যে পাঞ্জাববিরোধী মনোভাব বাড়তে থাকে এবং কোয়েটাসহ কয়েকটি স্থানে হামলার ঘটনা ঘটে। রহস্যজনকভাবে ইসলামাবাদে ইরাকি নিরাপত্তা অ্যাটাচের বাসভবন থেকে ৩০০ সোভিয়েত সাব-মেশিনগান উদ্ধার করা হয়।

বেলুচিস্তানে ‘স্বাধীনতা’র লড়াই ও পাকিস্তান balochistan (2)

পাকিস্তান সরকারের অভিযোগ, সোভিয়েতের সহায়তায় এসব অস্ত্র আনা হয়েছিল বেলুচ বিদ্রোহীদের জন্য। অভিযোগ প্রমাণের আগেই ভুট্টো বেলুচিস্তানের মেঙ্গলের ন্যাপ সরকারকে বরখাস্ত করেন। প্রতিবাদে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের সরকার পদত্যাগ করে। পরে রহস্য উদ্ঘাটিত হয়। এসব অস্ত্র আনা হয়েছিল ইরানে কুর্দিদের প্রতিরোধ লড়াইয়ে সহায়তা করতে, যার সঙ্গে পাকিস্তানি গোয়েন্দারা জড়িত ছিলেন।

ভুট্টোর ষড়যন্ত্র তত্ত্ব

মেঙ্গলের সরকার বরখাস্ত হওয়ার পর আবার বেলুচ গেরিলারা সংগঠিত হয় এবং ১৯৭৪ সালের এপ্রিলে সেনা কনভয়ে গুপ্ত হামলা চালায়। জবাবে ভুট্টো বেলুচিস্তানে ফের সেনা অভিযান চালান এবং তিন বেলুচ নেতা মির গাউস বক্স বিজেঞ্জো, আতাউল্লাহ খান মেঙ্গল ও খায়ের বক্স মারিকে জেলে পাঠান। পরবর্তী চার বছর বেলুচিস্তানে সশস্ত্র লড়াই চলতে থাকে। গেরিলাদের মোকাবিলার একপর্যায়ে পাকিস্তান সরকার সেখানে ৮০ হাজার সেনাসদস্য পাঠায়।

জুলফিকার আলী ভুট্টো। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
জুলফিকার আলী ভুট্টো। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

অন্যদিকে বেলুচদের প্রতিরোধের মাত্রা বেড়ে যায়। ১৯৭৪ সালের জুলাইয়ে গেরিলারা অন্যান্য প্রদেশের সঙ্গে বেলুচিস্তানের সড়ক ও রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ফলে বেলুচিস্তান থেকে পাঞ্জাবে কয়লার চালান যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। বেলুচ বিদ্রোহীরা খনির কূপগুলোতেও হামলা চালায়। ভুট্টোর বেলুচবিরোধী অভিযানে ইরানের শাহ ৩০টি মার্কিন কোবরা হেলিকপ্টার পাঠান; যা দিয়ে প্রতিরোধ ঘাঁটিগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয়। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ হয় ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে, যে সময়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পোড়ামাটি নীতি গ্রহণ করে। ১৯৭৪ সালের শীতকালে চামালংয়ে শত শত বেলুচ যখন বার্ষিক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগদানের উদ্দেশ্যে সপরিবারে সমবেত হয়, তখনই বিমান থেকে বোমা ফেলে তাদের হত্যা করা হয়। বেলুচরা এর পাল্টা জবাব দিলেও সেনাবাহিনীর আক্রমনের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয়।

গাফফার খান থেকে ওয়ালি খানKhan_Abdul_Ghaffar_Khan (1) (1)

এ সময় অধিকাংশ বেলুচ বিদ্রোহী গ্রুপ আফগানিস্তানে আশ্রয় নেয়। ভুট্টো বিদ্রোহ নির্মূল করার দাবি করলেও সফল হননি। ১৯৭৬ সালে মির খায়ের বক্স মারির নেতৃত্বে বেলুচিস্তান পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট (বিপিএলএফ) দল গঠিত হয়।

১৯৭৭ সালে ক্ষমতায় এসে জেনারেল জিয়াউল হক বেলুচ জাতীয়তাবাদীদের ভুট্টোবিরোধী মনোভাব কাজে লাগান। তিন বেলুচ নেতা মির গাউস বক্স, আতাউল্লাহ মেঙ্গল ও আকবর খান বুগতিকে মুক্তি দিয়ে তিনি তাদের সঙ্গে আপসরফার উদ্যোগ নেন। কিন্তু মারি জনগোষ্ঠীর একটি বিদ্রোহী গ্রুপ পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধযুদ্ধ চালিয়ে যায়। ১৯৯০-এর দশকে বালুচ স্টুডেন্ট ইউনিয়ন (বিএসইউ) পুনর্গঠিত হয় এবং তারাও প্রতিরোধে অংশ নেয়।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রধান হাতিয়ার ছিল ধর্ম। মুসলিম লীগের নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভারতবর্ষের মুসলমানদের জন্য একটি রাষ্ট্র চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই রাষ্ট্র কেমন হবে, সে সম্পর্কে তার স্পষ্ট ধারণা ছিল না। তিনি মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র পাকিস্তান গঠন করলেও ভারতীয় মুসলমানদের একটি বড় অংশ তার বাইরেই থেকে যায়।

‘এক ইউনিট ছুড়ে ফেল’

পঞ্চাশের দশকের শুরুতে কৌশলগত কারণে বেলুচ নেতারা একপর্যায়ে মুসলিম লীগে যোগ দেন, যাদের মধ্যে ছিলেন গাউস বক্স বিজেঞ্জো, মির আহমেদ খান প্রমুখ। কিছুদিন পরই তারা বুঝতে পারেন, মুসলিম লীগ কখনো তাদের অধিকার মেনে নেবে না। ১৯৫৫ সালে প্রদেশগুলো একীভূত করে পশ্চিম পাকিস্তানকে এক ইউনিটের অধীনে আনা হলে বেলুচ জাতীয়তাবাদীরা তা মানতে পারেনি এবং তারা কালাত পিপলস পার্টি গঠন করে। ১৯৫৬ সালে বেলুচিস্তানের, পশতুন উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের খোদাই খিদমতগার পাঞ্জাবের আজাদ পাকিস্তান পার্টি, সিন্ধুর মাহাজ ও সিন্ধু হারি কমিটি মিলে গঠন করা হয় পাকিস্তান ন্যাশনাল পার্টি (পিএনপি), যাতে জাতীয়তাবাদী, বামপন্থী ও কমিউনিস্টরাও ছিলেন। ১৯৫৭ সালে মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ থেকে বের হয়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠন করলে পিএসসির নেতারা সেই দলে যোগ দেন এবং সেটি দেশের বৃহত্তম বিরোধী দলে পরিণত হয়।

মির গাউস বক্স বিজেঞ্জো বহুবার কারাভোগ করেছেন এবং নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আইয়ুব খানের আমলে জেলখানায় তার ওপর নির্যাতনের বিবরণ দিয়েছেন সহযোদ্ধা মির জুলখান নাসির: তারা গাউস বক্স আমাদের থেকে আলাদা করে ফেলে এবং নির্যাতন চালায়। যখন তাকে ফিরিয়ে আনা হয়, আমি চিনতে পারছিলাম না। তিনি প্রাণে বেঁচে ছিলেন সত্য, কিন্তু তাকে দেখে মনে হয়েছিল, বুড়ো হয়ে গেছেন। তাকে দেখে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়ি। তখন তিনি সান্ত্বনা দিলেন, ও কিছু নয়।

১৯৬৬ সালে জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদান শেষে বিজেঞ্জো কোয়েটা ফিরে যাচ্ছিলেন। বালুচ নেতা নওয়াব বুগতি কাগজের মুদ্রায় ‘ওয়ান ইউনিট তোড় দো’ বা এক ইউনিট ছুড়ে ফেলো স্ট্যাম্পে লিখে ছাপ দিতেন। একদিন বাগতির ঘরে বসা ছিলেন বিজেঞ্জো ও সাইফুর রহমান মাজারি। এবং আরও কেউ কেউ। নওয়াবের কর্মচারী রেলওয়ে স্টেশন থেকে টিকিট কিনতে যান। এরপর টিকিট-ফেরত অর্থ পকেটে রাখেন। বিজেঞ্জো এর পরের ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন এভাবে: ‘সকালে পুলিশ হোটেলে অভিযান চালায় এবং আমার সঙ্গে থাকা মুদ্রা দেখতে চায়। আমি যখন নোট বের করি, দেখি ৫০ টাকার একটি নোটে “ওয়ান ইউনিট তোর দো” লেখা। তারা নোট আটক করে এবং আমাকে গ্রেপ্তার করে কোয়েটা জেলে পাঠায়।’

সেই ঘটনাটি বরাবর বিজেঞ্জোর কাছে রহস্যজনক মনে হয়েছে। নওয়াব বুগতি কেন সোৎসাহে তার কর্মচারীকে দিয়ে তার ট্রেনের টিকিট আনালেন? সে সময়ে মুদ্রায় ওয়ান ইউনিট তোড় দো আন্দোলন বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। এ ঘটনায় বিজেঞ্জোর ১৪ বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়।

বিজেঞ্জোর বইয়ে আরও জানা যায়, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যেসব গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চলেছে, সে সম্পর্কে পাকিস্তানি জনগণ কিছুই জানত না। সরকার বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম জানতে দেয়নি। বিদেশি পত্রপত্রিকার খবরকে তারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অপপ্রচার বলে মনে করত। বেনজির ভুট্টোর বই ডটার অব ইস্টেও এর সাক্ষ্য আছে। একাত্তরে তিনি যখন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলেন, সহপাঠীরা তার দিকে সন্দহের চোখে তাকাতেন। পাকিস্তানে সংগঠিত গণহত্যা নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্নও করতেন। কিন্তু পাকিস্তানের পত্রিকায় সে সম্পর্কে কোনো কিছু প্রকাশ করত না।

গণতান্ত্রিক ও সশস্ত্র— দুই পথেই বেলুচদের সংগ্রাম চলছে। ছবি: রয়টার্স
গণতান্ত্রিক ও সশস্ত্র— দুই পথেই বেলুচদের সংগ্রাম চলছে। ছবি: রয়টার্স

২৫ মার্চের অভিযান সম্পর্কে গাউস বক্স যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা অন্যান্য পাকিস্তানি নেতার থেকে ভিন্ন। তার ভাষ্য, এটি ছিল নিরস্ত্র নারী-পুরুষ ও শিশুর ওপর বর্বরোচিত গণহত্যা। এর বিরুদ্ধে ৩০ হাজার বাঙালি সেনা, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেল ও পুলিশ সদস্য যে ক্যাম্প ছেড়ে বেরিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন, তাদের অনেকে জনগণের সঙ্গে মিশে যান, অনেকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে যান। দলত্যাগী সেনা কর্মকর্তারা হাজার হাজার বাঙালি যুবককে সামরিক প্রশিক্ষণ দেন। একজন স্বাধীনতা সংগ্রামীই অন্য দেশের বা জাতির স্বাধীনতার সংগ্রামকে এতটা আবেগ ও দরদ দিয়ে উপলব্ধি করতে পারেন।

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বনাম মুক্তির লড়াই

বিজেঞ্জোর বইয়ের নাম ইনসার্চ অফ সলিউশন্স: অ্যান অটোবায়োগ্রাফি অব গাউস বক্স বিজেঞ্জো। কীসের অনুসন্ধান? আপন জাতিসত্তার ও স্বাধীনতার। সংঘাতের পথ ছেড়ে তিনি বারবার সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান চেয়েছেন। যে রাষ্ট্র তার হৃদয়ে বহমান, কখনো দৃশ্যমান হয়নি, সেই রাষ্ট্রের জন্য সংগ্রাম করেছেন আজীবন, বারবার জেল খেটেছেন, অত্যাচার-নির্যাতন ভোগ করেছেন। কিন্তু নীতির সঙ্গে আপস করেননি। একজন ব্যতিক্রমী ও মানবদরদি রাজনীতিক হিসেবে তার নিজের দেশের এবং বহির্বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের সঙ্গে থেকেছেন।

বেলুচ আন্দোলনের দুই ধারাmir baks

নাতিদীর্ঘ এই বইতে লেখক নিজের বেড়ে ওঠার সঙ্গে ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের চালচিত্র তুলে ধরেছেন। আমাদের অনেকেরই ধারণা ছিল, একদা কালাত বা বর্তমান বেলুচিস্তান বরাবর পাকিস্তানেরই অংশ ছিল (লন্ডনে পাকিস্তানি ছাত্রনেতা রহমাত আলী প্রথম ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান নাম উচ্চারণ করেন, তাতে বেলুচিস্তান থেকে ‘স্তান’ নেওয়া হয়েছিল কোনো বেলুচকে না জিজ্ঞেস করেই। আর বাংলার কোনো স্থানই ছিল না) । ধারণাটি একেবারেই ভুল।কীভাবে পাকিস্তানি শাসকেরা বেলুচিস্তান দখল করে নেয়, সেখানকার স্বাধীনতার যোদ্ধাদের কী নির্মমভাবে দমন করে, তার সংক্ষিপ্ত অথচ বস্তুনিষ্ঠ বিবরণ আছে এই বইতে। আরও আছে পাকিস্তানি শাসকদের অপশাসন, নীতি ও অদর্শহীন কর্মকাণ্ড, সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের ষড়যন্ত্রের কথা। ক্ষমতার জন্য মরিয়া রাজনৈতিক দলগুলো ও নেতাদের ঝগড়া-বিবাদ ও ব্যর্থতার সুযোগ নিয়েই বারবার সেখানে সামরিক শাসন জেঁকে বসে। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানি শাসকেরা বাঙালি-ভীতিকে ব্যবহার করেছেন। এরপর কখনো পাঠান, কখনো বেলুচি কখনো মুহাজির-ভীতিকে। আসলে শুরু থেকে পাকিস্তানি রাজনীতিতে যে পাঞ্জাবি শোভিনিজম ছিল, এখনো তা বহাল আছে। এমনকি পাঠান সম্প্রদায় থেকে আসা সামরিক শাসক আইউব ও ইয়াহিয়াও তাদের ‘প্রভুত্ব’ মেনে নিয়েছেন। (শেষ)

বিষয়: পাকিস্তানবেলুচিস্তানস্বাধীনতাবিদ্রোহী
Advertisement
সর্বশেষ
  • ১

    সেনাবাহিনী ও সেনাপ্রধানকে জড়িয়ে অপপ্রচারে প্রভাবিত না হওয়ার অনুরোধ আইএসপিআরের

  • ২

    ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা রুটে ফ্লাইট স্থগিত করেছে বিমান

  • ৩

    যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ায় বন্দুক হামলায় নিহত ৯

  • ৪

    ফিলিস্তিনের নির্বাচন কেন স্থগিত করলেন আব্বাস?

  • ৫

    রিয়াদের কিং খালেদ বিমানবন্দরে হামলায় কয়েকজন আহত, কার্যক্রম বন্ধ

সম্পর্কিত
  • ভারত: গণ-আন্দোলনের মুখোমুখি এক অনমনীয় রাষ্ট্র

    ভারত: গণ-আন্দোলনের মুখোমুখি এক অনমনীয় রাষ্ট্র

    সরকার ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব এবং নেপাল ও বাংলাদেশে কথিত বিদেশি হস্তক্ষেপের প্রসঙ্গ টেনে এই আন্দোলনকে বিদেশি শক্তির কারসাজি হিসেবে চিহ্নিত করে এর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা করবে। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই, যারা বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ইচ্ছুক ছিলেন, তাদের কাছেই জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের গভীরতা স্পষ্ট ছিল।

  • সরকারি কর্মী: বেতন বৃদ্ধি যৌক্তিক ও সময়োচিত

    সরকারি কর্মী: বেতন বৃদ্ধি যৌক্তিক ও সময়োচিত

    দু বছর পর যখন এ বেতন স্কেল পুরো কার্যকর হবে তখন মুদ্রাস্ফীতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সেটা দেখার বিষয়। এর মাঝে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। বাড়ানো ছাড়া হয়তো উপায়ও ছিল না। তবে এর ফলে বাড়বে সকল ধরনের পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়সহ ভোগ্যপণ্যের দাম।

  • ১৯৫৪ সালের পূর্ব পাকিস্তান আইনসভায় নির্বাচিত অমুসলিম ছিলেন ৭২ জন, এখন বাংলাদেশে ৪

    ১৯৫৪ সালের পূর্ব পাকিস্তান আইনসভায় নির্বাচিত অমুসলিম ছিলেন ৭২ জন, এখন বাংলাদেশে ৪

    ২০২৪-এর পর থেকে এই অন্তর্ভুক্তিমূলক শব্দটা আমরা বেশি শুনছি। এটা ভালো লক্ষণ। কিন্তু যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল এবং শিডিউলড কাস্টের ব্যাপারে, নিম্নবর্গের ব্যাপারে অন্তর্ভুক্তিমূলকের দশা কিন্তু খুবই খারাপ।

  • আকাশ যাদের জন্য ছোট হয়ে আসছে

    আকাশ যাদের জন্য ছোট হয়ে আসছে

    শেষ বিচারে কোনো সম্প্রদায় দেয়াল তুলে টিকে থাকতে পারে না। লায়লা খালেদ একসময় আরব বিশ্বে নায়িকা ছিলেন, আজ বিশ্বের কোনো বিমানবন্দর তার নাম শুনলে সতর্ক হয়ে যায়।