পাকিস্তানে পাঠান বা পাখতুনরা প্রথম জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূচনা করেন। পাখতুন নেতা আবদুল গাফফার খান কখনোই পাকিস্তান মেনে নিতে পারেননি। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের পক্ষের গণভোট তিনি বর্জন করেছিলেন। তারপরও মুসলিম লিগ ৫১ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি। গাফফার খানের ছেলে ওয়ালি খানও ছিলেন বাম ধারার নেতা। ভুট্টোর সঙ্গে একাধিকবার বিরোধে জড়িয়েছেন। জেল খেটেছেন। বিরোধের একপর্যায়ে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, “আমাদের দুজনের জন্য একটি কবর খোঁড়া হয়েছে। কে আগে ঢুকবে, সেটাই প্রশ্ন।”
ওয়ালি খান ছিলেন বাবার মতো বামাদর্শের অনুসারী। তিনি নিজেকে প্রথমে পাঠান, পরে পাকিস্তানি বলে পরিচয় দিতেন। ওয়ালি খানের একটি বিখ্যাত উক্তি হলো— “আমি ৬ হাজার বছর ধরে পাখতুন, ১৩০০ বছর ধরে মুসলমান ও ২৫ বছর ধরে পাকিস্তানি।”
১৯৯০ সালে নির্বাচনের পর ওয়ালি খান বলেছিলেন, দেশের প্রত্যেক নাগরিক নিজেদের প্রথমে সিন্ধ, পশতুন, বালুচ ও পাঞ্জাবি ভাবেন। তারা কেউ নিজেদের পাকিস্তানি ভাবেন না। বৃহত্তর প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের ওপরই পাকিস্তানের অস্তিত্ব নির্ভর করছে। কিন্তু ক্ষুদ্রতর স্বায়ত্তশাসনও তারা ভোগ করতে পারছেন না। বিগত পিপিপি সরকারের আমলে সীমান্ত প্রদেশের নাম পাল্টিয়ে খাইবার পাখতুনখাওয়া করা হয়েছে।
১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর যেসব পাকিস্তানি নেতা আওয়ামী লীগের ছয় দফার প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন ওয়ালি খান। ১৯৭৩ সালের সংবিধানে তিনি পাখতুন ও বালুচদের অধিকতর স্বায়ত্তশাসন দাবি করলে ভুট্টো ১০ বছরের মধ্যে তা পূরণ করার আশ্বাস দেন। ওয়ালি খান, বালুচ নেতা আতাউল্লাহ মেঙ্গল ও গাউস বক্স বেজেঞ্জো তার কথায় আশ্বস্ত হয়ে সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তানে ন্যাপের সরকার গঠন করলেও কয়েক মাসের ব্যবধানে ভুট্টো তাদের ক্ষমতাচ্যুত করেন।
কালাত থেকে বেলুচিস্তান
আজ যে ভূখণ্ডটি বেলুচিস্তান নামে পরিচিত, ১৯৪৭-এ দেশ বিভাগের আগে যার নাম ছিল কালাত, তা কখনোই ভারতীয় উপমহাদেশের অংশ ছিল না। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকেরা যখন ক্ষমতা হস্তান্তর করে, তখনো কালাতের অবস্থান ছিল অন্যান্য দেশীয় রাজ্য কিংবা ভারত ও পাকিস্তান ডমিনিকান থেকে আলাদা। ১৮৭৬ সালের চুক্তি অনুযায়ী, কালাত একধরনের ‘স্বাধীন ও সার্বভৌম’ রাষ্ট্রের মর্যাদা ভোগ করত।
যখন উপমহাদেশে ব্রিটিশ সরকার ছিল, কালাতের শাসকদের পক্ষে মুসলিম লীগের নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন এর বেতনভুক আইনি উপদেষ্টা। তিনি তখন কালাতের স্বাধীনতার পক্ষে আইনি লড়াই চালিয়েছেন। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর জিন্নাহ কালাতের স্বাধীনতা খর্ব করতে নানা কৌশলের আশ্রয় নেন; এমনকি সেনা অভিযান চালাতেও দ্বিধা করেননি।
পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট। পরদিন ১৫ আগস্ট কালাতের শাসক মির আহমেদ ইয়ার খান, যিনি খান সাহেব নামে অধিক পরিচিত ছিলেন, বেলুচিস্তানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেন। ইতিমধ্যে কোয়েটা ও লাসবেলার শাসক নিজ নিজ রাজ্যকে কালাতের সঙ্গে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেন। এর আগে ৫ আগস্ট ১৯৪৭ কালাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে দিল্লিতে লর্ড মাউন্টব্যাটেন, কালাতের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মধ্যে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কালাতের স্বাধীনতা খর্ব করতে নানা কৌশলের আশ্রয় নেন। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স
ব্রিটিশ রীতি অনুযায়ী, কালাতেও দারুল আওয়াম ও দারুল উমরাহ নামে পার্লামেন্টের দুটি কক্ষ ছিল। দুই কক্ষেই সর্বসম্মত প্রস্তাব নেওয়া হয়, কালাত স্বাধীন রাষ্ট্র থাকবে, পাকিস্তান বা ভারতের সঙ্গে যুক্ত হবে না। এতে সমতার ভিত্তিতে পাকিস্তানের সঙ্গে একটি চুক্তি করার কথা বলা হয়, যদিও সেই চুক্তি কখনোই হয়নি। তার আগেই পাকিস্তান সরকার কালাতকে দখল করতে নানা ফন্দিফিকির আঁটে।
২ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কালাতের শাসক খান সাহেবকে পাকিস্তানে যোগদানের জন্য অনুরোধ জানিয়ে একটি চিঠি লেখেন। চিঠিটি এখানে তুলে ধরা হলো:
আমার প্রিয় খান সাহেব,
আপনার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আজ কতিপয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করে অত্যন্ত খুশি হয়েছি, যিনি আপনার পক্ষ হয়ে এসেছিলেন। আমরা বিষয়াদি নিয়ে কথা বলেছি এবং তিনি আপনাকে আলোচনার ফল জানাবেন।
আপনার বন্ধু, শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আমি আপনাকে পরামর্শ দেব অবিলম্বে পাকিস্তানে যোগ দিতে। আমি আশা করি, আপনি সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করবেন এবং চূড়ান্ত উত্তর জানাবেন; করাচিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আপনি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
আপনার অনুগত
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ
এই অনুরোধের এক মাসের ব্যবধানে ১ এপ্রিল ১৯৪৮ পাকিস্তান সেনাবাহিনী কালাতে সামরিক অভিযান চালায় এবং খান সাহেবকে গ্রেপ্তার করে। তারা তাকে দিয়ে বশ্যতা স্বীকার করিয়ে নেয়। কিন্তু তার ভাই প্রিন্স আবদুল করিম কালাতের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং পাকিস্তানের অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে বালুচ ন্যাশনাল লিবারেশন কমিটির (বিএনএলসি) নামে স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৫০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া পর্যন্ত তার সংগ্রাম অব্যাহত ছিল। এরপর তিনি ২২ বছর বেঁচে ছিলেন, যার ১৬ বছরই কাটাতে হয় পাকিস্তানের কারাগারে।
আফগানিস্তানের অসহযোগিতা
আবদুল করিম খানের প্রত্যাশা ছিল, আফগানিস্তান তাদের সংগ্রামের প্রতি সমর্থন জানাবে। কেননা, আফগানিস্তান বরাবরই বেলুচ ও পাঠান-অধ্যুষিত এলাকা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তির বিরোধী ছিল। এমনকি তারা পাকিস্তানের জাতিসংঘে অন্তর্ভুক্তিরও বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু তিনি আফগানিস্তানের কাছ থেকে তেমন সহায়তা পাননি। বেলুচ জাতীয়তাবাদীরা যখন অন্য দেশে অন্তর্ভুক্তির চেয়ে স্বাধীনতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেয়, তখন আফগানিস্তান সমর্থন প্রত্যাহার করে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পাকিস্তানে প্রথম স্বাধীনতাসংগ্রাম শুরু করে বেলুচরা, ১৯৪৮ সালে। বাঙালির স্বাধীনতাসংগ্রাম শুরু ১৯৭১ সালে এবং নয় মাসের ব্যবধানে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। বেলুচদের সংগ্রাম এখনো চলছে।
পাকিস্তান বলতে অনেকের ধারণা, দেশটির সম্ভবত সবাই শোষক ও নির্যাতনকারী। কিন্তু বেলুচ জাতীয়তাবাদী নেতা গাউস বক্স বিজেঞ্জোর লেখায় সেই ধারণা অনেকাংশে ভুল প্রমাণ করেছে। পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ বিশেষ করে, বেলুচ, পাঠান ও সিন্ধিরাও পাঞ্জাবিদের শোষণ ও বঞ্চনার শিকার। তারা বাঙালিদের ছয় দফা আন্দোলনে উজ্জীবিত হয়েছিল এ কারণে যে পাকিস্তানে সত্যিকার ফেডারেল-ব্যবস্থা চালু হলে তার সুবিধা পশ্চিম পাকিস্তানের ওই তিন সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীও পাবে।
বেলুচদের সংগ্রামের জানা-অজানা কাহিনী নিয়ে মির গাউস বক্স বিজেঞ্জো লিখেছেন, সার্চ অফ সলিউয়েশন। বইটি একজন ব্যক্তির জীবনী হলেও স্বাধীনতাকামী একটি জাতির সংগ্রামের কাহিনিও বিবৃত হয়েছে এতে। বিজেঞ্জো ছিলেন কালাতের প্রথম রাজনৈতিক দল কালাত স্টেট ন্যাশনাল পার্টির (কেএলএফসি) সাধারণ সম্পাদক এবং দারুল আওয়াম বা কালাত জাতীয় পরিষদের প্রধান।
১৯৪৭ সালের ১৪ ডিসেম্বর কালাত জাতীয় পরিষদে দেওয়া তার ভাষণ স্মরণীয় হয়ে আছে। তিনি বলেছিলেন:
আমরা মুসলমান। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে আমাদের স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে হবে এবং এই কারণে অন্য কারও সঙ্গে একীভূত হতে হবে। মুসলমান হওয়ার কারণে যদি আমাদের পাকিস্তানের সঙ্গে একীভূত হওয়া প্রয়োজন হয়ে থাকে, তাহলে আফগানিস্তান ও ইরানের মতো মুসলিম দেশগুলোরও পাকিস্তানের সঙ্গে একীভূত হতে হয়। ...সম-সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে আমরা ওই দেশটির সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়তে প্রস্তুত আছি, কিন্তু একীভূত হতে নয়। যদি পাকিস্তান আমাদের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে গণ্য করে, তাহলে আমরা বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে প্রস্তুত আছি। আর পাকিস্তান যদি তা না করে এবং গণতান্ত্রিক নীতিমালা অগ্রাহ্য করতে থাকে, তা কখনোই গ্রহণযোগ্য হবে না।...যদি আমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করতে বাধ্য করা হয়, তাহলে প্রতিটি বেলুচ সন্তান জাতীয় স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করবে। [সূত্র: কালাত জাতীয় পরিষদে দেওয়া ভাষণ (১৯৪৭-১৯৪৮)] (চলবে)