দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত। তবে মূল্যস্ফীতির চাপ, অতিরিক্ত সুদহার, আমদানিতে কড়াকড়ি এবং ডলার সংকটের প্রভাবে এই খাতে ঋণের গতি কমে গেছে। অন্যদিকে, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি এবং অভ্যন্তরীণ আয় কমে যাওয়ায় পরিচালনা ব্যয় মেটাতে ব্যাংক খাতের ওপর সরকারের নির্ভরতা বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নতুন কৌশল খুঁজে সরকারকে এই সংকট থেকে বের হতে হবে। নয়তো, এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের শিল্প খাত ও কর্মসংস্থানে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের এক হতাশাজনক চিত্র দেখা গেছে। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এই খাতে মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ছিল ১৬ লাখ ৮৫ হাজার ২৭১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বেসরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা, শতাংশের হিসাবে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ ঋণ বেড়েছে।
কিন্তু বছরের মাঝামাঝি সময়ে এসে ঋণের এই গতি আরও নেতিবাচক দিকে গেছে। চলতি বছরের জুন শেষে বেসরকারি খাতে মোট ঋণের স্থিতি ১৮ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছালেও বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। মে মাসে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং এপ্রিলে তা ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির সময় যখন বিশ্বজুড়ে সব ধরনের যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছিল; সেই সংকটের মধ্যেও দেশে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল সাড়ে ৭ শতাংশের ওপরে। মহামারির সময়ের চেয়েও স্বাভাবিক সময়ে প্রবৃদ্ধি কম হওয়াটা দেশের শিল্প ও বাণিজ্য খাতের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা।
রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম চরচাকে বলেন, “বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ইতিহাসে সর্বনিম্ন। কিন্তু রূপালী ব্যাংকের ক্ষেত্রে সেটা ঠিক নয়। আমাদের ব্যাংকে বেসরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে।”
বেসরকারি খাতে ঋণ বাড়ানোর জন্য সরকার কী ধরনের উদ্যোগ নিতে পারে জানতে চাইলে তিনি চরচাকে বলেন, “আমরা আসলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসরণ করি। বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের যেসব নির্দেশনা দেবে, আমরা তা পালন করব। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক এসএমই খাতে ঋণ বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। আমরা সেই নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করব।”
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেসরকারি ঋণে মন্দার পেছনে বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নিয়ামক কাজ করছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও অনিশ্চয়তার কারণে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও চামড়াশিল্পের চাহিদা বহির্বিশ্বে কমে গেছে।
তাই দেশের বড় উদ্যোক্তারা নতুন কোনো কারখানা স্থাপন বা পুরনো ব্যবসার সম্প্রসারণ বন্ধ রেখেছে। এর প্রভাবে ব্যাংক থেকে নতুন মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র বা এলসি খোলার হারও তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
একই সঙ্গে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে সংকুচিত মুদ্রানীতি অনুসরণের যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, তা ঋণের বাজারকে আরও সংকুচিত করেছে। অতিরিক্ত সুদের পাশাপাশি ডলারের সংকট এবং স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন ব্যবসায়ের পরিচালনা ব্যয় কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই অবস্থায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্পায়নের চাকা সচল রাখতে বেসরকারি ঋণপ্রবাহ দ্রুত স্বাভাবিক করা জরুরি বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর চরচাকে বলেন, “সরকার যদি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যাংক খালি করে দেয়, তাহলে বেসরকারি খাতে ঋণ কমবে, এটাই বাস্তবতা। সরকারকে ব্যাংক ঋণ কমাতে হবে। এটা আমি সব সময় বলি, বেসরকারি খাতে ঋণ না বাড়লে এই খাতে কর্মসংস্থান বাড়বে না, দেশের জন্য এটা খুবই দরকার।”
আহসান এইচ মনসুর আরও বলেন, “অনেক সময় ব্যাংকগুলো গ্রাহককে ঋণ দিতে আগ্রহ দেখায় না। তারা সরকারের নিরাপদ খাতে বিনিয়োগ করতে বেশি আগ্রহী। আর সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে অনিয়ম তো আছেই। ব্যাংক চালাতে সরকারকে আরও পেশাদার হতে হবে।”
ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ বাড়ছে
বেসরকারি খাতে যেখানে প্রয়োজনীয় পুঁজির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে, সেখানে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের অর্থ তুলে নেওয়ার হার আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার ব্যাংক খাত থেকে মোট ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এই অঙ্ক কেবল বিশালই নয়, বরং অর্থ বছরের শুরুতে সরকারের লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও প্রায় ৩০ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার হার বেড়েছে প্রায় ৭৭ শতাংশ। রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের স্থবিরতা এবং অন্য খাত থেকে কাঙ্ক্ষিত অর্থ সংগ্রহ করতে না পারার কারণে সরকারকে তার দৈনন্দিন ও পরিচালন ব্যয় মেটাতে বাধ্য হয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছে যেতে হচ্ছে।
নতুন অর্থবছরেও সরকারের ব্যাংক নির্ভরতার চিত্রে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়নি। বরং চলতি অর্থবছরের প্রথম ১৩ দিনের মধ্যেই সরকার ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত ৯ হাজার ২০৯ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে। শুরুতেই এত পরিমাণ ঋণ নেওয়ার প্রবণতা নির্দেশ করে, সরকারের ট্রেজারি ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি প্রকট আকার ধারণ করেছে এবং অভ্যন্তরীণ আয় বাড়ানোর নতুন কোনো কৌশল কাজ করছে না।
কেন ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ বাড়ছে?
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর সরকারের নির্ভরতা হুট করে বাড়েনি। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বেশ কিছু সংকট তৈরি হওয়ার কারণেই সরকার ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে।
সরকারের এই অস্বাভাবিক ব্যাংক ঋণ বেশি নেওয়ার পেছনে প্রধানত তিনটি বিষয় কাজ করছে। প্রথমত, রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ব্যর্থতা ও বিশাল ঘাটতি সরকারের অর্থসংস্থানের প্রধান পথকে অবরুদ্ধ করে ফেলেছে। দেশের বাজেট বাস্তবায়নে যে পরিমাণ কর সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়, পর পর কয়েক অর্থবছর ধরে কাঠামোগত দুর্বলতা ও অর্থনৈতিক মন্দার কারণে এনবিআর সেই লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। সে কারণে সরকারি পরিচালন ব্যয় এবং উন্নয়নমূলক কাজের খরচ জোগাতে সরকারকে অন্য উৎসের সন্ধান করতে হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, অতীতে সরকারের অর্থসংস্থানের অন্যতম প্রধান একটি নিরাপদ উৎস ছিল সাধারণ মানুষের কাছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রির ক্ষেত্রে একাধিক কঠোর নিয়মকানুন আরোপ করেছে। এতে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমে গেছে। এই পরিস্থিতিতেও সরকার বাধ্য হয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে।
তৃতীয়ত, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি এবং অভ্যন্তরীণ পরিচালনা ব্যয়ের পাশাপাশি অতীতে নেওয়া দেশি-বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির কারণে সরকারের প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে আগের নেওয়া বড় বড় মেগা প্রকল্প এবং অন্যান্য অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময় চলে আসায় বিপুল পরিমাণ অর্থ কেবল ঋণের সুদ মেটাতেই চলে যাচ্ছে। রাজস্ব আয় না বাড়লেও এই বাধ্যতামূলক ব্যয় কমানোর কোনো সুযোগ সরকারের হাতে নেই। তাই ঘাটতি মেটাতে সরকারকে বাধ্য হয়ে ব্যাংক খাত থেকেই ঋণ নিতে হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, “সরকারের উচিত এমন কৌশল বের করা, যেন তাকে ব্যাংক থেকে কম ঋণ নিতে হয়। এর জন্য দরকার অর্থের নতুন উৎস খোঁজা।”
যা বলছে বাংলাদেশ ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান চরচাকে বলেন, “বেসরকারি খাতে ঋণ বাড়ানো শুধু ব্যাংক বা গ্রাহকের বিষয় না। এর সঙ্গে দেশের ব্যবসায়িক ইনফ্রাস্টাকচাকের (অবকাঠামো) বিষয়টি চলে আসে। ধরুন, একজন গ্রাহক ঋণের জন্য ব্যাংকে গেলেন। ব্যাংক তাকে ফাইন্যান্স করল। কিন্তু গ্যাস সংকটে তার কারখানা চলছে না। তাহলে যেদিন থেকে তিনি ঋণ নিয়েছিলেন, সেদিন থেকেই তার সুদ গণনা শুরু হলো। এতে তো লাভ হলো না। এসব বিষয়ও মাথায় রাখতে হবে।”
তবে সরকার এসব বিষয় ঠিক করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আশা করছি, খুব দ্রুত একটা ইতিবাচক টার্ন আমরা দেখতে পাব। ডিসেম্বরের মধ্যে হয়ত সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে।”