সবকিছু ঠিক থাকলে এই মাসের শেষের দিকেই ডিজিটাল ব্যাংকের অনুমোদন দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ১২ থেকে ১৩টি ডিজিটাল ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হতে পারে। বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও শিল্পগোষ্ঠী এসব ব্যাংকের লাইসেন্স পেতে আবেদন করেছে। দেশের আর্থিক খাতে প্রযুক্তিনির্ভর সেবার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে ডিজিটাল ব্যাংক–এমনই আশা সংশ্লিষ্টদের।
কিন্তু এই ডিজিটাল ব্যাংকের সম্ভাব্য আগমনে কয়েকটা প্রশ্ন সামনে আসছে। এতদিন মোবাইলে আর্থিক সেবা বলতে সাধারণ মানুষ মূলত বিকাশ-নগদের মতো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসই বুঝেছে। এর সঙ্গে ডিজিটাল ব্যাংকের পার্থক্য কোথায়?একইসঙ্গে দেশের অধিকাংশ প্রচলিত ব্যাংক এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমেও কিছু সেবা দিচ্ছে। টাকা জমা করা, টাকা তোলা থেকে শুরু করে এখন অনেক কিছুই ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে করা যায়। তাহলে প্রশ্ন উঠছে, যেহেতু প্রচলিত ব্যাংকের সেবাগুলো এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমেই নেওয়া যায়, তাহলে নতুন করে আবার ডিজিটাল ব্যাংক কেন প্রয়োজন? আলাদা কী থাকবে ডিজিটাল ব্যাংকে?
এমএফএস বনাম ডিজিটাল ব্যাংক
প্রথমে আলোচনা করা যাক মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ও ডিজিটাল ব্যাংকের পার্থক্যের বিষয়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) মূলত একটি ডিজিটাল ওয়ালেট বা পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম–যা মূলত এক হিসাব থেকে অন্য হিসাবে দ্রুত অর্থ স্থানান্তর, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, মার্চেন্ট পেমেন্ট এবং ক্যাশ ইন বা ক্যাশ আউটের মতো সুবিধা দিচ্ছে।
অন্যদিকে, ডিজিটাল ব্যাংক হলো একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ব্যাংক। এই ব্যাংকিংয়ের জন্য কোনো অফিস, অর্থাৎ ইট-পাথরের বিল্ডিংয়ে যেতে হবে না।
বরং ব্যাংকিংয়ের সব সেবা পুরোপুরি অ্যাপ বা ডিজিটাল মাধ্যমে পরিচালিত হবে।
এমএফএস এবং ডিজিটাল ব্যাংকের মধ্যে মূল পার্থক্যটি বোঝা যাবে এই দুটির সেবার পরিধি ও পরিচালনার নিয়ম-কানুনে।
এমএফএস বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে গ্রাহক সাধারণত নিজের জমানো টাকা দিয়ে লেনদেন করতে পারেন, বা নির্দিষ্ট কিছু এজেন্টের মাধ্যমে নগদ উত্তোলন করতে পারেন।
এই এমএফএস বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রতিষ্ঠানগুলো নিজে লোন দিতে পারে না। কোনো থার্ড পার্টি কোম্পানির লোন সে ‘মধ্যস্থতাকারী’ হিসেবে পরিচালনা করে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রতিষ্ঠান বিকাশ সাম্প্রতিক সময়ে ন্যানো লোন বা ক্ষুদ্রঋণ পরিচালনা করছে।
‘পরিচালনা করছে’ কথাটা এই কারণে বলা হচ্ছে, কারণ ঋণটা সে নিজে দিচ্ছে না। এই ন্যানো লোন দিচ্ছে বাংলাদেশের একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক–সিটি ব্যাংক।
অর্থাৎ, এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার, এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো নিজে লোন দিতে পারে না বা ডিপিএস গ্রহণ করতে পারে না।
তবে অন্য কোনো কোম্পানির লোন বা ডিপিএস পরিচালনা করতে পারে। এখানে গ্রাহক ও ব্যাংকের মাঝখানে ‘মধ্যস্থতাকারী’ হিসেবে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ঢুকে পড়ছে।
ডিজিটাল ব্যাংকের ক্ষেত্রে সেটা হবে না। ডিজিটাল ব্যাংক নিজেই তার গ্রাহককে ঋণ দেবে।
এমএফএসের সঙ্গে ডিজিটাল ব্যাংকের বড় পার্থক্য এর তহবিল ব্যবস্থাপনা ও গ্রাহকের অ্যাকাউন্টের ধরনে।
এমএফএসের নিজস্ব কোনো সরাসরি ডিপোজিট বা জমার লাইসেন্স থাকে না, তারা কোনো মূল বাণিজ্যিক ব্যাংকে একটা ট্রাস্ট অ্যাকাউন্ট বা কাস্টডিয়াল অ্যাকাউন্ট তৈরি করে সেখানে নিজের গ্রাহকের অর্থ জমা রাখে।
অন্যদিকে, ডিজিটাল ব্যাংক সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকের শিডিউলড বা তফসিলি ব্যাংকিং লাইসেন্স নিয়ে পরিচালিত হবে। ফলে এখানে জমানো অর্থ সরাসরি ব্যাংকের আমানত হিসেবে বিবেচিত হবে।
ইন্টারনেট ব্যাংকিং বনাম ডিজিটাল ব্যাংক
এবার আমরা আলোচনা করব দেশের প্রচলিত ব্যাংকগুলোর অ্যাপ বা ইন্টারনেটভিত্তিক সেবা–অর্থাৎ, ইন্টারনেট ব্যাংকিং এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তাবিত ডিজিটাল ব্যাংকের পার্থক্য নিয়ে। ইন্টারনেট ব্যাংকিং এবং ডিজিটাল ব্যাংকের বিষয়টিকে অনেকে একইভাবে দেখলেও এদের অবকাঠামো ও সেবা প্রদানের পদ্ধতিতে রয়েছে মৌলিক কিছু পার্থক্য।
প্রচলিত ব্যাংকের ইন্টারনেট ব্যাংকিং হলো মূলত শাখাভিত্তিক সেবার একটি অনলাইন মাধ্যম, যেখানে শারীরিক শাখা ও কাউন্টারের ওপর ভিত্তি করেই ডিজিটাল সেবাগুলো পরিচালিত হয়। এমনকি অনেক ব্যাংকে আপনি যে তাদের ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবা নিতে চান, সে আবেদন করতে হয় কাগজে লেখা পত্রে। অন্যদিকে প্রস্তাবিত ডিজিটাল ব্যাংকের কোনো ভৌত শাখা, কাগজের নথি বা ম্যানুয়াল কাউন্টার থাকবে না। বরং এর সম্পূর্ণ ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালিত হবে শতভাগ স্বয়ংক্রিয় ও প্রযুক্তিভিত্তিক প্রক্রিয়ায়।
সাধারণ ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে মূলত ফান্ড ট্রান্সফার, বিল পেমেন্ট বা ব্যালেন্স দেখার মতো সীমিত সেবা পাওয়া যায়। বর্তমানের ইন্টারনেট ব্যাংকিং অ্যাপের মাধ্যমে ডিপিএস খোলা যায়। ঋণের আবেদনও করা যায়, তবে সেটা শর্তসাপেক্ষ এবং এখানে অঙ্কটাও সীমিত। ঋণের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই ও অনুমোদনের জন্য সশরীরে শাখায় যেতে হয়।
তবে ইদানীং কিছু ব্যাংকের ক্ষেত্রে শাখায় সশরীরে উপস্থিত না হয়েও খুব ক্ষুদ্র ঋণ পাওয়া যায়। তবে এর পেছনে মূলত কাজ করে প্রচলিত ধারারই ব্যাংকিং সিস্টেম। অর্থাৎ, একজন গ্রাহক যখন ঋণের আবেদন করেন, তখন সেটা ম্যানুয়াল পদ্ধতিতেই যাচাই-বাছাই হয়। গ্রাহক অনলাইনেই আবেদন করেন, কিন্তু কর্মকর্তারা নিজেই সেটা যাচাই-বাছাই করেন।
কিন্তু ডিজিটাল ব্যাংকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যালগরিদম ব্যবহার করে গ্রাহকের লেনদেনের ইতিহাস ও ক্রেডিট স্কোর বিশ্লেষণ করা হয়। ফলে কোনো কাগজের নথি ছাড়াই তাৎক্ষণিকভাবে সরাসরি অ্যাপের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ঋণ দেওয়া সম্ভব হয়।
হিসাব খোলার প্রক্রিয়াতেও আসবে বড় পরিবর্তন।
প্রচলিত ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনেক সময় প্রাথমিক বায়োমেট্রিক বা ফর্ম পূরণের জন্য ব্যাংকের শাখায় যাওয়ার প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে ডিজিটাল ব্যাংক শতভাগ কাগজবিহীন ও স্বয়ংক্রিয় অনবোর্ডিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে, যেখানে জাতীয় পরিচয়পত্র এবং ফেশিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির মাধ্যমে মুহূর্তেই যেকোনো জায়গা থেকে অ্যাকাউন্ট খোলা যাবে।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য আধুনিক ব্যাংকিংয়ের সুবিধাও এনে দেবে ডিজিটাল ব্যাংকিং। প্রচলিত ব্যাংকগুলো সাধারণত নির্দিষ্ট জামানত বা নথিপত্র ছাড়া এই শ্রেণিকে সহজে ঋণ দিতে চায় না। ডিজিটাল ব্যাংক তাদের দৈনন্দিন অনলাইন লেনদেন ও আয়ের অ্যালগরিদম দেখে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডিজিটাল ওভারড্রাফট ও ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল লোন সুবিধা দেবে, যা প্রচলিত ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে একেবারেই অনুপস্থিত।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ইন্টারনেট ব্যাংকিং হলো একটি ভৌত বা প্রচলিত ব্যাংকের ছোট্ট একটা জানালা মাত্র। অন্যদিকে, ডিজিটাল ব্যাংক হলো সম্পূর্ণ শাখাবিহীন, অটোমেটিক ব্যাংকিংয়ের এক নতুন দরজা। বিশেষ করে ব্যাংক সেবার বাইরে থাকা বৃহৎ জনগোষ্ঠী ও তরুণ প্রজন্মের কাছে ঝামেলাহীন আর্থিক সেবা পৌঁছে দিতে এই ব্যাংকিং মাধ্যম বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।