অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বিলকিস বেগম বিকেলের চায়ে চুমুক দিতেই এল একটি ফোনকল। সেই কলে তাকে বলা হলো, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও কার্ড ‘হোল্ড’ হয়ে গিয়েছে। কার্ড সচল করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে নেওয়া হলো ডেবিট কার্ডের নিরাপত্তা তথ্য ও ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি)। মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যেই তার ভিসা ডেবিট কার্ড থেকে আট দফায় আড়াই লাখ টাকা চলে গেল বিকাশের বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে।
রাজধানীর শান্তিনগরের ব্যাংক এশিয়ার গ্রাহক বিলকিসের সঙ্গে এভাবেই প্রতারণা করেছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। ভুক্তভোগী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও ব্যাংকে লিখিত অভিযোগ করলেও এখনো অর্থ উদ্ধারের কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না। তদন্তও এগোচ্ছে ধীরগতিতে।
এটা শুধু বিলকিস বেগমের গল্প নয়। দেশে প্রতি বছর আর্থিক প্রতারণার শিকার হচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ। খুব কম ক্ষেত্রেই টাকা উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে।
পরিসংখ্যান কী বলছে
দেশের আর্থিক জালিয়াতি এবং সাইবার ক্রাইমের সবশেষ তথ্যের জন্য পুলিশ সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা কামরুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই প্রতিবেদককে কী কী তথ্য লাগবে তা লিখে পাঠাতে বলেন। সেগুলো পাঠানোর পাঁচ দিন পরও কোনো ধরনের তথ্য দেননি। পরে যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
তবে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের (সিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুন থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত ১১ মাসে ৩ হাজার ৪৬৫টি আর্থিক প্রতারণা-সংক্রান্ত অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতারণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হ্যাক, ব্যাংক হিসাব ও কার্ড-সংক্রান্ত জালিয়াতি এবং ক্লোনিং-সংক্রান্ত অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, ডিএমপির সাইবার সাপোর্ট সেন্টারে গত বছরের ২০ নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচ মাসে ৯০৫টি সাইবার জিডি জমা পড়েছে বলে জানা গেছে। এসব অভিযোগের বড় অংশই ছিল মোবাইল ব্যাংকিং, টেলিগ্রাম ও ফেসবুকভিত্তিক প্রতারণা সম্পর্কিত।
ফেরা যাক বিলকিস বেগমের কাছে। দীর্ঘ ২৩ বছর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন তিনি। কী ঘটেছিল তার সঙ্গে?
বিলকিস বেগম জানান, গত ১৬ জুলাই বিকেলে তার মোবাইলে ফোন আসে। অপর প্রান্ত থেকে ব্যাংক এশিয়ার শান্তিনগর শাখার কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে বিলকিসকে বলা হয়, তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও ডেবিট কার্ড ‘হোল্ড’ হয়ে গেছে। ১৬ জুলাই ছিল বৃহস্পতিবার। সামনে শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় বিষয়টি নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
এর কিছুক্ষণ পর নিজেকে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তা দাবি করে ফোন করেন ‘আকরাম’ নামের অন্য এক ব্যক্তি। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন সার্কুলার ও নিয়মের কথা বলে তিনি বিলকিস বেগমের আস্থা অর্জন করেন। এরপর কার্ডের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য এবং মোবাইলে আসা একাধিক ওটিপি সংগ্রহ করেন।
হতাশা প্রকাশ করে বিলকিস বেগম চরচাকে বলেন, “আমি ভেবেছিলাম কার্ড সচল করার জন্যই এসব তথ্য লাগছে। ওটিপি কাউকে দেওয়া যায় না, সেটা আমার জানা ছিল না। আমার চোখের সামনে দিয়ে বারবার টাকা কেটে নেওয়ার ম্যাসেজ আসছিল। কিন্তু আমি কেমন যেন হিপনোটাইজ হয়ে গিয়েছিলাম মনে হয়।”
পরে বিলকিসের জামাতা বিষয়টি বুঝতে পেরে দ্রুত ব্যাংকের কাস্টমার কেয়ারে ফোন করে কার্ডটি ব্লক করেন। কিন্তু ব্যাংক জানায়, এরই মধ্যে টাকা ব্যাংক থেকে বের করে নিয়েছে প্রতারক চক্র।
আট দফায় টাকা গেছে বিকাশে
ব্যাংক এশিয়ার কমিউনিকেশন অফিসার আবদুল ওয়াদুদ চরচাকে বলেন, “গ্রাহকের অভিযোগ পাওয়ার পর ব্যাংকের সাইবার ইউনিট তদন্ত করে দেখেছে, মোট আটটি লেনদেনে ২ লাখ ৪৯ হাজার ৯৫০ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। একই তথ্য, পরদিনই বিলকিস বেগমকে সরবরাহ করেছে ব্যাংক এশিয়ার শান্তিনগর শাখা।”
চরচার হাতে থাকা ব্যাংকের ট্রানজেকশন স্টেটমেন্টে দেখা যায়, ১৬ জুলাই মাত্র প্রায় ৩০ মিনিটের মধ্যে আটটি পৃথক ‘কার্ড টু বিকাশ এড মানি’ লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর করা হয়। ভিসা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে প্রতিটি লেনদেনই সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে দেখা যায়।
আবদুল ওয়াদুদ বলেন, “ব্যাংক বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে বিকাশকে জানিয়েছে।” তবে এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট বিকাশ অ্যাকাউন্টগুলো নিষ্ক্রিয় (ডিঅ্যাকটিভ) হয়ে গেছে বলেও জানান তিনি।
তদন্তের অগ্রগতি কত দূর?
প্রতারণার এই ঘটনা নিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা হাতিরঝিল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আরাফাত বিন ইউসূফ বলেন, “এটি প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ হওয়ায় তদন্তের জন্য পুলিশের বিশেষায়িত সাইবার ইউনিটে আবেদন পাঠানো হয়েছে।”
আরাফাত বলেন, “সাইবার ইউনিটের রিপোর্ট পাওয়ার পরই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। পুরো প্রক্রিয়ায় এক থেকে তিন মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।”
আরাফাতের দাবি, প্রাথমিকভাবে ব্যাংক থেকে পাওয়া তথ্যে অর্থ কোন নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টে গেছে, তার বিস্তারিত তথ্য না থাকায় তদন্তে জটিলতা তৈরি হয়েছে। এই কমকর্তা অভিযোগ করে বলেন, “ব্যাংক থেকে কোন বিকাশ অ্যাকাউন্টে টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, সেসব নম্বরগুলো দিচ্ছে না।”
অথচ ভুক্তভোগী নারী চরচাকে জানিয়েছেন, তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংক তাদের কোন বিকাশ অ্যাকাউন্টে কত টাকা ট্রান্সফার করা হয়েছে, তা সরবরাহ করেছে। অর্থাৎ, তদন্ত কমকর্তা সাইবার ইউনিটে জিডির কপি পাঠানো ছাড়া এ বিষয়ে আর কোনো পদক্ষেপই নেননি। অথচ যে নম্বরগুলের জন্য এই কমকর্তা তিন মাস সময় অপেক্ষা করতে প্রস্তুত, সে তথ্য এরই মধ্যে ভুক্তভোগীর হাতেই রয়েছে।
এ বিষয়ে বিলকিস বেগম চরচাকে বলেন, “জিডি করার পর পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের সাথে আর যোগাযোগ করেনি পুলিশ। যদি যোগাযোগ করত, তাহলে প্রয়োজনীয় এই কাগজটি দেওয়া যেত।”
তদন্তে দীর্ঘসূত্রিতার এ বিষয়ে সিআইডির সাইবার ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত ডিআইজি সাইফুদ্দিন শাহীন চরচাকে বলেন, “এই ধরনের কেসগুলোতে তদন্ত করতে কিছুটা সময় লাগে কারণ প্রচুর ফোন নম্বর ফিল্টারিং করতে হয়। এই প্রতারকরা সরাসরি নিজের নাম বা নম্বর ব্যবহার করে না। তবে তিন মাস সময় লাগার কথা নয়। তবে লোকেশন ট্র্যাক করা এবং অপরাধীদের প্রযুক্তিগত জালিয়াতি ভেদ করতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।”
বাংলাদেশ ব্যাংক। ছবি: বাসস
বিকাশ কী বলছে?
বিকাশের হেড অব কমিউনিকেশন শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম বলেন, “বিষয়টি তদন্তাধীন থাকায় আইনগত কারণে নির্দিষ্ট ঘটনাটি নিয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়।” তিনি বলেন, “এ ধরনের প্রতারণা মূলত গ্রাহকের অসতর্কতার সুযোগ নিয়েই সংঘটিত হয়। তাই ব্যবহারকারীদের আরও সচেতন হতে হবে।”
ডালিম বলেন, “বিকাশের একটি বিশেষ দল ২৪ ঘণ্টা কাজ করে। তদন্তকারী সংস্থা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা বাংলাদেশ ব্যাংক তথ্য চাইলে তারা আইন অনুযায়ী তাৎক্ষণিকভাবেই সহযোগিতা করার জন্য প্রস্তুত।”
কী বলছে বাংলাদেশ ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম ডিপার্টমেন্ট (পিএসডি) প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), চেক ও কার্ডভিত্তিক লেনদেনে মোট ৮১ হাজার ৪২৩টি প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রতারকরা হাতিয়ে নিয়েছে ৯২ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যার মধ্যে ৮২ কোটি ৭২ লাখ টাকা এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সামগ্রিক অর্থ পুনরুদ্ধারের হার মাত্র ১০ দশমিক ৭ শতাংশ।
এদিকে পুলিশের এক গবেষণায় দেখা গেছে, অনলাইন হয়রানির ৮৯ শতাংশ ভুক্তভোগী কখনো মামলা করেন না। আবার যেসব মামলা হয়, তার ৭২ শতাংশ শেষ পর্যন্ত খারিজ হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল আর্থিক প্রতারণার ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা থাকায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে প্রতারক খুঁজে পেতে সংকটে পড়তে হয় তদন্ত কর্মকর্তাদের। এর কারণ হিসেবে সিআইডির সাইবার ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত ডিআইজি সাইফুদ্দিন শাহীন চরচাকে বলেন, “প্রতারকরা গ্রামের দরিদ্র বা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ভুয়া সিম রেজিস্ট্রেশন করিয়ে নেয়। তদন্তে দেখা যায়, সিমটি হয়তো ৭৫ বছরের কোনো বৃদ্ধের নামে নিবন্ধিত, যিনি নিজেও জানেন না তার নামে ১০টি সিম তোলা হয়েছে।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে প্রতারণার ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে আরেক ধরনের সংকটে পড়তে হয় বলে জানান সিআইডির এই শীর্ষ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, “আমাদের একটি বড় দুর্বলতা হলো ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্রতিষ্ঠানের সাথে আমাদের কোনো সরাসরি চুক্তি নেই। তারা আমাদের কোনো ডেটা দেয় না বা আমাদের কল শোনে না। আমরা সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছি, যাতে এই প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে চুক্তি করা হয়, যেন আমরা যেকোনো সময় প্রয়োজনীয় তথ্য বা ডেটা পেতে পারি।”
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বর্তমানে প্রযুক্তিগত ত্রুটির চেয়ে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বা মানুষের বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে প্রতারণার ঘটনা বেশি ঘটছে। বিলকিস বেগমের সাথে একই ঘটনা ঘটেছে। ব্যাংক বা বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা পরিচয়ে ফোন করে ওটিপি, কার্ডের নিরাপত্তা কোড বা ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে কয়েক মিনিটের মধ্যেই অর্থ সরিয়ে নিচ্ছে প্রতারক চক্র।
তাদের পরামর্শ, কোনো ব্যাংক, বিকাশ বা বাংলাদেশ ব্যাংক কখনো ফোন করে ওটিপি, পিন, সিভিভি বা কার্ডের নিরাপত্তা তথ্য জানতে চায় না। এ ধরনের তথ্য কাউকে দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। সন্দেহজনক ফোন পেলে সঙ্গে সঙ্গে কল কেটে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের অফিশিয়াল হটলাইনে যোগাযোগ করতে হবে।
এ বিষয়ে সাইফুদ্দিন শাহীন বলেন, “সাইবার অপরাধের শিকার হলে আমাদের কল সেন্টারের নির্দিষ্ট নম্বরগুলোতে যোগাযোগ করার সুযোগ আছে। আমরা প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্ব সহকারে দেখার চেষ্টা করি। নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আমরা সেটির রহস্য উদঘাটনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। আমাদের একটি বিশেষ টিম ২৪ ঘণ্টাই কাজ করছে।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান চরচাকে বলেন, “প্রতারণা রোধে ও গ্রাহক সচেতনতা বৃদ্ধিতে ব্যাংকগুলোকে জোর তৎপরতা চালানোর নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ধরনের প্রতারণার ঘটনায় গ্রাহক সচেতনতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”