নবারুণ ভট্টাচার্য্য সত্তর দশকের শুরুতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নকশালদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের প্রেক্ষাপটে লিখেছিলেন, এ মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয়। একই স্লোগান আমরা শুনেছিলাম বাংলাদেশে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময়ও। সেই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী সরকার বিদায় নিয়েছে। কিন্তু মৃত্যু বন্ধ হয়নি। বরং নিরাপত্তাহীনতা আরও জেঁকে বসেছে।
শিশু ও নারীর জীবনই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে অনিরাপদ। মৃত্যুর ভয়াল থাবার হাত থেকে রক্ষার উপায় নেই কারও। যে কোনো উছিলায় জীবন কেড়ে নেয় দুর্বৃত্তরা।
প্রায় প্রতিদিনই পত্রিকায় বেদনায় মুচড়ে যাওয়া ও ‘বুক ভারী করা কাহিনী’ ছাপা হয়। টেলিভিশনে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব বীভৎস ছবি প্রকাশ পায়, দেখলে সুস্থ থাকা কঠিন। একেকটি ছবি একেকটি বেদনার গল্প।
কুমিল্লায় ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীম নামের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীকে জীবন দিতে হয়েছে একটি আইফোনের জন্য। দুদিন আগে বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় তার হাতে একটি আইফোন ছিল। সমাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মা সন্তানের নিখোঁজ হওয়ার বার্তা দিয়ে সবার কাছে আকুতি জানান। থানায় ডায়রি হয়। কিন্তু কোথাও তের বছর বয়সী অপ্রতীমের খোঁজ মেলেনি। দুদিন পর তার রক্তাক্ত লাশ মিলল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে লালমাই পাহাড়ের জঙ্গলে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, কিশোর গ্যাংয়ের তিন সদস্য আইফোন কেড়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যই ছেলেটিকে খুন করে।
দ্বিতীয় ঘটনাটি খুলনার। খুলনার নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আজমুল হোসেন আরও কয়েকজন ছাত্রের সঙ্গে খানজাহান আলী রোডের একটি মেসে থাকতেন। চুরি করে ভাত খাওয়া ও টাকা নেওয়ার অজুহাতে মেসের অন্য বাসিন্দারা তাকে পিটিয়ে হত্যা করে, যাদের মধ্যে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থীও ছিল। ঘাতকেরা ছাদে নিয়ে তাকে মারধর করে পাঁচতলা থেকে নিচে ফেলে দেয়। হত্যার আগে তারা চুয়াডাঙ্গায় থাকা আজমুলের বাবাকে ফোন করে বলেন, “আপনার ছেলে আমাদের জিনিসপত্র চুরি করেছে। এক লাখ টাকা নিয়ে আসেন।” বাবা ফোন পেয়ে খুলনায় এসে আর ছেলেকে দেখতে পাননি। ততক্ষণে সে লাশ হয়ে গেছে।
মানুষ কত নৃশংস হলে রুমমেটকে খুন করে বাবার কাছে টাকা চাইতে পারেন। আমরা লিবিয়ার বন্দীশিবিরের কথা জানি, যেখানে আটক অভিবাসীদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে দেশে বাবা–মাকে ফোন করে টাকা চেয়ে নেয় একশ্রেণির দালাল।
একই দিনে দুই পরিবারের ছয়জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে মানিকগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের তাহিরপুর থেকে। তাহিরপুরে স্ত্রী চাকরি নিয়ে বিদেশে যাওয়ার তিন দিনের মাথায় স্বামী তিন শিশু সন্তানকে খুন করে নিজেও আত্মহত্যা করেছেন। মানিকগঞ্জে দেড় বছরের মেয়ে, স্ত্রীসহ সৌদি প্রবাসীর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
প্রতিদিনই এ ধরনের রোমহর্ষক হত্যার ঘটনা ঘটছে, অথচ আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের চৈতন্নোদয় নেই।
জাতীয় জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থা মুন অ্যালার্ট–এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দেড় শতাধিক শিশু নিখোঁজ হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১১৮ শিশুকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও বাকিদের তথ্য জানা যায়নি। বাড়ির আশপাশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক, বাজার ও বিভিন্ন জনসমাগমপূর্ণ স্থান থেকে এসব শিশু নিখোঁজ হয়ে থাকে। গত ৮ মাসেই ৩৬ নিখোঁজ শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। বাকিরা কোথায়—থানা পুলিশ কী তার খবর জানে?
এসব হত্যার খবর আমাদের স্তম্ভিত করে। বিচলিত করে। যে দেশে শিশু–কিশোরেরা নিরাপদ নয়, সেদেশকে সভ্য বলা যায় না। এসব ঘটনার পেছেন যেমন পারিবারিক অশান্তি ও দারিদ্র্য আছে, তেমনি আছে সামাজিক অস্থিরতা। আছে উত্তরপ্রজন্মকে ঠিকমতো গড়ে না তুলতে পারার ব্যর্থতা।
আমাদের পারিবারিক বন্ধন ক্রমেই শিথিল হয়ে উঠেছে, রাজনীতি হয়ে উঠেছে হিংসাত্মক। আমরা মনুষ্যত্ববোধ হারিয়ে না ফেললে একটি আইফোনের জন্য কেউ একটি শিশুকে হত্যা করতে পারে না, ভাতের জন্য সতীর্থকে পিটিয়ে মেরে ফেলতে পারে না।
খুলনায় আজমুল হোসেনের ঘটনা চব্বিশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে এক পাগল যুবকের মৃত্যুর ঘটনাই মনে করিয়ে দেয়। ছেলেটি সারাদিন ক্যাম্পাসে ঘোরাঘুরি করত, ক্ষুধা লাগলে হলের শিক্ষার্থীদের কাছে ভাত চেয়ে খেত। কিন্তু সেদিন হলের শিক্ষার্থীরা তাকে চোর সন্দেহে মারধর করেছেন। এরপর খাবার দিয়েছেন। খাবার দেওয়ার পর আবার মেরেছে মৃত্যু নিশ্চিত করা পর্যন্ত। একজন ভবঘুরে বা পাগল যুবকের প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এ রকম আচরণ করতে পারে!
কারও বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ থাকলে তাকে মেরে ফেলতে হবে? তারা থানা–পুলিশে দিতে পারত। তারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বলতে পারত। কিন্তু সেসব না করে একুশ বছর বয়সেই একটি ছেলের জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দেওয়া হলো।
আমরা কী রকম নিষ্ঠুর সমাজে বাস করছি! কুমিল্লায় তের বছরের শিশুটির ফুটফুটে চেহারা দেখলে যে কারও মায়া হবে। কিন্তু কিশোর গ্যাংয়ের মায়া হয়নি। অপ্রতীমের মা আর্তনাদ করে বলেছেন, ‘ওরা যদি ১০টি আইফোন চাইত দিতাম। কিন্তু আমার সন্তানকে মেরে ফেলল কেন? এখন আমি কী নিয়ে বাঁচব?’
অপ্রতীমকে হত্যার প্রতিবাদে ঢাকা–চট্টগ্রাম সড়ক অবরোধ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে একদিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। সর্বস্তরের মানুষ শোক করেছে। কিন্তু কোনো শোক বা প্রতিবাদই আর অপ্রতীমকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না।
অপ্রতীমের মৃত্যুতে সমস্ত দেশ শোকে স্তব্ধ হলেও আমাদের রাজনীতিকদের চৈতন্ন্যোদয় হয়েছে বলে মনে হয় না। ক্ষমতাসীনেরা সবকিছু ঠিক আছে বলে জনগণকে সান্ত্বনা দেবে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিদের ধরার বাহবাও নিতে চাইবে। বিরোধী দল আইনশৃঙ্খলার অবনতির জন্য সরকারের কঠোর সমালোচনা করে পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে দায়িত্ব শেষ করবে।
কেননা সরকারি ও বিরোধী দলের রাজনৈতিক এজেন্ডায় সাধারণ মানুষ নেই। আছে, কীভবে রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করার নানা কৌশল।
লেখক: সম্পাদক, চরচা