মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের গতিপথ যখন নতুন একটি মোড়ে এসে পৌঁছেছে, ঠিক তখনই অঞ্চলটিতে একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন যৌথবাহিনী গত ফেব্রুয়ারিতে যে সামরিক সংঘাতের সূচনা করেছিল, তা কার্যত সমাপ্তির পথে গিয়ে ঠেকেছে। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে একটি অচল অবস্থা বা স্থবিরতার মধ্য দিয়ে সেই যুদ্ধের এক পর্যায় শেষ হয়েছে। তবে এখন যা শুরু হতে যাচ্ছে, তা সম্পূর্ণ নতুন এবং এই পরিস্থিতি পুরো অঞ্চলকে কোন অনিশ্চিত গন্তব্যে নিয়ে যাবে তা এখনও স্পষ্ট নয়।
পশ্চিমের ভূখণ্ডে এখন একটি নতুন আঞ্চলিক পরাশক্তির উত্থান ঘটছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে দশকের পর দশক ধরে পশ্চিমা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং ক্রমাগত যুদ্ধের হুমকির মুখে ইরানকে বিশ্বসমাজ থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন ও অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। তবে ফেব্রুয়ারির যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নির্ধারিত সামরিক লক্ষ্যগুলোর একটিও অর্জনে সফল হতে না পেরে নিজেদের সামরিক সীমাবদ্ধতা ও অকার্যকারিতা প্রদর্শন করেছে। এর ফলে যেসব নিষেধাজ্ঞার দেয়াল দিয়ে ইরানকে এতদিন কোণঠাসা করে রাখা হয়েছিল, তা ভেঙে দেশটি মধ্যপ্রাচ্যে একটি প্রভাবশালী আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।
বাস্তবতার নিরিখে বিবেচনা করলে, বর্তমানে ইরানের এই ঐতিহাসিক পরিবর্তন ও পুনরুত্থানের প্রক্রিয়াটি অতীতে কূটনীতির মাধ্যমে বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে চীনের আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ফিরে আসার ইতিহাসের সঙ্গে বহুলাংশে মিলে যায়। ১৯৪৯ সালের কমিউনিস্ট বিপ্লবের পর থেকে বিশ্বসমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন, অবরুদ্ধ ও বর্জিত অবস্থায় রাখা হয়েছিল চীনকেও। পরবর্তীকালে কূটনীতি ও সমঝোতার মাধ্যমে বৈশ্বিক মঞ্চে চীনের নতুন করে প্রবেশ ঘটে এবং দেশটিতে গৃহীত অভ্যন্তরীণ সংস্কার কার্যক্রমই মূলত চীনকে আজকের বিশ্বসেরা অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে পরিণত করার পথ প্রশস্ত করেছিল।
তবে চীনের উত্থানের সঙ্গে ইরানের বর্তমান গতিপথের মূল পার্থক্য দুটি জায়গায়। প্রথমত, ইরান চীন বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো কোনো বৈশ্বিক পরাশক্তি হতে যাচ্ছে না, বরং তারা বিশ্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কৌশলগত ভৌগোলিক অঞ্চলে প্রভাবশালী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ে ইরানের পুনরায় প্রবেশ বা আগমন চীনের তুলনায় অনেক বেশি বিশৃঙ্খল, সংঘাতময় ও সহিংস হতে চলেছে। কারণ ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর যে আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার গভীরে ইরানকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, সেখান থেকে বের হয়ে আসতে তাদের সামরিক পথ বেছে নিতে হয়েছে। ইরানের সমগ্র অবকাঠামো ধ্বংসের কোনো চরম চেষ্টা ছাড়া আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে দেশটির এই উত্থানকে থামানো এখন প্রায় অসম্ভব।
ইরানের এই আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভাবের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল এবং সহিংসতার ঝুঁকিতে পূর্ণ। শেষ পর্যন্ত ইরানের কোন রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী ক্ষমতার শীর্ষে উঠে নীতি নির্ধারণের দায়িত্ব নেবে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। চীনের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৭০-এর দশকে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে প্রবল অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার লড়াই অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে ডেং জিয়াওপিংয়ের মতো সংস্কারপন্থী নেতারা শীর্ষ নেতৃত্বে আসার পরেই চীন তার বৈশ্বিক পথ উন্মোচনের দিকে অগ্রসর হতে পেরেছিল।
১৯৬৬ সালে সাংস্কৃতিক বিপ্লব ও ডেং জিয়াওপিংয়ের অপসারণ, ১৯৭১ সালে লিন বিয়াওর ব্যর্থ অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা এবং মঙ্গোলিয়ায় বিমান দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু, চৌ এনলাইয়ের উত্থান এবং তার বিরুদ্ধে চারজন নেতার তথাকথিত ‘গ্যাং অব ফোর’-এর অবস্থান, চৌ এনলাইয়ের মৃত্যুর পর ডেং-এর দ্বিতীয় দফায় পদচ্যুতি এবং ১৯৭৬ সালে মাও সেতুংয়ের মৃত্যুর পর ডেং-এর চূড়ান্তভাবে ক্ষমতায় পুনর্বাসন—এই দীর্ঘ ও রক্তাক্ত ইতিহাস পার হয়েই চীন নতুন পথ বেছে নিয়েছিল।
মাও সেতুংয়ের মৃত্যুর পরেই কেবল চীন দৃঢ়ভাবে তার অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কার কর্মসূচির সূচনা করে এবং মাওয়ের কট্টর চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে আসে। এরপর ধীরগতিতে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ও পরীক্ষামূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য চীনের দরজা খুলে দেওয়া হয়। এই সচেতন নীতিই কয়েক দশক পার করে চীনকে একটি আন্তর্জাতিক পরাশক্তিতে রূপান্তর করেছিল।
বর্তমানে ইরানও তার ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে ঠিক এই ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাদের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রয়াণ এবং মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে সামরিক বিজয় অর্জনের দাবির পর, ইরানকেও এখন অভ্যন্তরীণ চরম রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ হতে হচ্ছে।
ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তারা অতীতের কট্টর মতাদর্শেই আবদ্ধ থাকবে, নাকি একটি সম্পূর্ণ নতুন ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হবে। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে বহু বছর সময় লাগবে। তবে চীনের সঙ্গে ইরানের প্রধান তফাৎ হলো, ইরানে এই পুরো রাজনৈতিক প্রক্রিয়াটি উন্মোচিত হচ্ছে একটি সক্রিয় যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে।
ইরানের ভেতরে স্পষ্টতই একটি বাস্তবতাবাদী ও প্রাগম্যাটিক গোষ্ঠী রয়েছে, যারা যুদ্ধের ইতি টেনে দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজে মনোনিবেশ করতে চায়। তবে তাদের সমান্তরালে সমান শক্তিশালী আরেকটি দলীয় বা সামরিক গোষ্ঠী রয়েছে, যারা আগ্রাসনকারীদের ওপর একটি চরম অপমানজনক পরাজয় চাপিয়ে দেওয়ার জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আফগানিস্তানে তালেবান যেভাবে মার্কিন বাহিনীকে আকস্মিক ও বিশৃঙ্খলভাবে পলায়নের পথ বেছে নিতে বাধ্য করেছিল, এই গোষ্ঠীটি মধ্যপ্রাচ্যেও মার্কিন সেনাদের ক্ষেত্রে ঠিক সেই একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে চায়।
যুক্তরাষ্ট্র যদি শেষ পর্যন্ত এই অঞ্চল ছেড়ে চলে যায়, তাহলেই মূলত আসল খেলা শুরু হবে। মার্কিন সেনাদের পশ্চাদপসরণের পর ইরানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী তাদের পূর্ণ মনোযোগ ঘোরাবে পারস্য উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর দিকে। যুদ্ধজনিত ক্ষতিপূরণ আদায়ই হবে তখন তাদের মূল লক্ষ্য। ইরান ইতিমধ্যেই এই যুদ্ধের বিপুল বিল আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করেছে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ফাইনান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে, ২০২৫ সালের জুনের যুদ্ধে ইরানের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তার উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ না দেওয়া পর্যন্ত কোনো পারমাণবিক আলোচনায় ফেরা সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্র তখন এই দাবিকে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের মার্চ মাসে মার্কিন প্রস্তাবের জবাবে এবং এপ্রিল মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে ইরান ২৭০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণের শর্ত যুক্ত করে। এমনকি ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত খসড়ায় এই ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ৩০০ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের এই বিশাল ক্ষতিপূরণের দাবিকে আর কোনোভাবেই হালকাভাবে বা উপহাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার পাশাপাশি ইরান আগামী দিনগুলোতে এই দাবি আদায়ে আরও বেশি চাপ সৃষ্টি করবে। যুক্তরাষ্ট্র যখন দেখবে এই সংঘাত তাদের নিজস্ব কোনো স্বার্থ রক্ষা করছে না এবং তারা সরে দাঁড়াবে, তখন মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় ধনী রাজতন্ত্রগুলোকেই এই বিল পরিশোধের মুখোমুখি হতে হবে। আর একবার যদি উপসাগরীয় দেশগুলো এই বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করা শুরু করে, তবে তা সেখানেই শেষ হবে না; একের পর এক নতুন আর্থিক দাবি তাদের সামনে উপস্থাপন করা হবে।
একত্রিত মার্কিন-ইসরায়েলি জোট যদি পুরো ইরানকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়ার মতো কোনো বিপর্যয়কর পদক্ষেপ না নেয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে একটি পরাশক্তি হিসেবে ইরানের উত্থান এখন ঠেকানো অসম্ভব। বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশটির সমগ্র অবকাঠামো ধ্বংসের ঘটনা ঘটে যাওয়া বেশ অনিশ্চিত হলেও তা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে ইরানের ক্ষমতায়ন ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। হরমুজ প্রণালীর ওপর নিজেদের আধিপত্য সুসংহত করার পর তাদের পরবর্তী লক্ষ্য হবে উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর বিপুল ধন-সম্পদ। সেই সম্পদ ও ধন-দৌলত এখন সরাসরি হুমকির মুখে পড়েছে।
চীনের বিপ্লবোত্তর ইতিহাস বিশ্বের জন্য অত্যন্ত শিক্ষাগ্রহণের মতো একটি বিষয়। এটি আমাদের দেখায় কীভাবে একটি বিপ্লবোত্তর রাষ্ট্র নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো সঠিকভাবে পরিচালনা করে বৈশ্বিক বাণিজ্য, অর্থায়ন ও কূটনীতির মূলধারায় পুনর্বাসিত হতে পারে এবং নিজেদের জন্য সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করতে পারে। ইরান কি চীনা মডেল অনুসরণ করে প্রজ্ঞার পরিচয় দেবে, নাকি তাদের এই নতুন অর্জিত সামরিক সুবিধাকে কেবল প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবে এবং ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ হারাবে—তা আজ পুরো বিশ্বের জন্য এক বিশাল প্রশ্ন চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লেখক: ব্যবসা ও অর্থনীতি বিষয়ক সাংবাদিক
(লেখাটি পাকিস্তানি দৈনিক ডন-এর সৌজন্যে প্রকাশিত হলো)