যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ছয় মাস আগে ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তা মূলত একটি দুর্বল শত্রুর বিরুদ্ধে একটি দ্রুত গতির অভিযান হিসেবে পরিকল্পিত হয়েছিল। জানা যায়, এই অভিযানের পেছনে প্রাথমিক অনুঘটক ছিল ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইরান জুড়ে শুরু হওয়া তীব্র অসন্তোষ ও জনবিক্ষোভ। সেই ঘটনা ইসরায়েল ও মার্কিন নেতৃত্বকে এই বিশ্বাসে চালিত করেছিল যে তেহরানের সরকার পতনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে এবং তাদের কেবল একটি চূড়ান্ত ধাক্কার প্রয়োজন।
এই অভিযানের শুরুতে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, এই যুদ্ধটি বড়জোর এক মাস থেকে ছয় সপ্তাহ স্থায়ী হবে এবং এমনকি এর চেয়েও দ্রুত শেষ হতে পারে। কিন্তু সেই অনুমানের বিপরীতে গিয়ে এই সংঘাত একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম রূপান্তরকারী ঘটনায় পরিণত হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিণতি শেষ পর্যন্ত ৯/১১-এর সন্ত্রাসী হামলা কিংবা ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের প্রভাবকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এই যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবগুলোর একটি হলো পারস্য উপসাগরের আরব রাষ্ট্রগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান নিরাপত্তা নিশ্চিতকারী হিসেবে যে ভূমিকা ছিল, তাতে মারাত্মক আঘাত লাগা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ওয়াশিংটন ধীরে ধীরে ব্রিটেনের কাছ থেকে এই ভূমিকা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল। বর্তমান যুদ্ধটি এই নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুটি মৌলিক দুর্বলতাকে উন্মোচিত করেছে। প্রথমত, ইরানের মতো একটি মধ্যম সারির শক্তির ধারাবাহিক ও বিধ্বংসী আক্রমণের হাত থেকে উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর তেল অবকাঠামো এবং মূল অর্থনৈতিক পরিষেবাগুলো রক্ষা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয়ত, ইরান ও ইয়েমেনে তাদের মিত্র হুতিদের ক্রমবর্ধমান হামলার মুখে এই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করতে ওয়াশিংটন ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এই ব্যর্থতার গুরুত্ব কেবল সামরিক ক্ষেত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কারণ ১৯৯০-৯১ সালের ‘অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম’-এর মাধ্যমে অর্জিত মার্কিন সামরিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তাই ছিল স্নায়যুদ্ধ-উত্তর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এটি কেবল মধ্যপ্রাচ্যের আরব রাজতন্ত্রগুলোর পররাষ্ট্রনীতিকেই প্রভাবিত করেনি, বরং তাদের আর্থিক সিদ্ধান্তগুলোকেও পরিচালিত করেছিল। তারা ওয়াশিংটনের সাথে তাদের সামরিক সম্পর্কের কারণেই যুক্তরাষ্ট্রে বিশাল অংকের অর্থ বিনিয়োগ করত।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক সক্ষমতার পতনকে অনুধাবন করতে হলে ১৯৯০ সালের সেই ঐতিহাসিক ডেজার্ট স্টর্ম অভিযানের সাথে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করা প্রয়োজন। ওই সময়ে সৌদি আরবকে রক্ষা করতে এবং ইরাককে পরাজিত করতে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৫ লাখ ৪০ হাজার সেনা সমাবেশ করেছিল, যা ছিল তৎকালীন সমগ্র মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর সক্রিয় সদস্যের চারভাগের একভাগ। মার্কিন সেনাবাহিনীর ১৮টি সক্রিয় ডিভিশনের মধ্যে সাতটি এবং মেরিন কোরের তিনটি ডিভিশনের মধ্যে দুটি এই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। তদুপরি যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন ১৫টি বিমানবাহী রণতরীর মধ্যে ছয়টি এবং প্রায় সাড়ে ৬ হাজারটি যুদ্ধবিমানের মধ্যে ১৬০০টি যুদ্ধবিমান সেই অভিযানে মোতায়েন করা হয়েছিল। সেই যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত কম মানবিক মূল্যে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি নিরঙ্কুশ বিজয় এনে দিয়েছিল। যদিও যুদ্ধের আগে মার্কিন পরিকল্পনাকারীরা আশঙ্কা করেছিলেন যে প্রায় ২০ হাজার সৈন্য হতাহত হতে পারে যার মধ্যে ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার নিহতের সম্ভাবনা ছিল, তবুও সেই বিশাল ক্ষতির ঝুঁকি এবং কংগ্রেসে তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ সেই অভিযানে এগিয়ে গিয়েছিলেন।
আজকের পরিস্থিতির সাথে বিগত সেই সময়ের বৈপরীত্য অত্যন্ত বিস্ময়কর, কারণ যুক্তরাষ্ট্র এখন মধ্যপ্রাচ্যে ১৯৯০ সালের বাহিনীর সাথে দূরতম সাদৃশ্যপূর্ণ কোনো সামরিক শক্তিও একত্র করতে পুরোপুরি অক্ষম। ইরানের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের জন্য বর্তমানে মাত্র ৫০ হাজার মার্কিন সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছে, যাদের সহায়তায় রয়েছে মাত্র ৩০০টির মতো বিমান এবং দুটি বিমানবাহী রণতরীসহ ২০টির কিছু বেশি যুদ্ধজাহাজ। অধিকন্তু ওয়াশিংটন আগের মতো তার ঐতিহ্যগত মিত্রদেরও এই যুদ্ধে বিশাল পরিসরে একত্রিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৯০ সালে কেবল যুক্তরাজ্যই ইরাকবিরোধী অভিযানে ৩৫ হাজার সৈন্য পাঠিয়েছিল, অথচ চলমান এই যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো মিত্র দেশ এমন উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেনি। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, শীর্ষস্থানীয় পশ্চিমা পরাশক্তিটি তার গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ সংগঠিত করার ক্ষমতা এবং মিত্রদের সামরিক শক্তিকে কাজে লাগানোর সামর্থ্য উভয়ক্ষেত্রেই একটি বস্তুগত অবনতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
মজার বিষয় হলো, বিশ্বজুড়ে সামরিক খরচের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের যে বিশাল একক প্রাধান্য ছিল, তাতে কিন্তু বড় ধরনের কোনো পতন ঘটেনি। ১৯৯০ সালে বৈশ্বিক মোট সামরিক ব্যয়ের প্রায় ৩৫ থেকে ৩৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করত যুক্তরাষ্ট্র, যা ২০২৫ সালেও বজায় ছিল প্রায় ৩৩ শতাংশের কাছাকাছি। এই সামরিক খরচের পরিসংখ্যান ও বাস্তব সামরিক সক্ষমতার মধ্যে তৈরি হওয়া ব্যবধান মূলত প্রমাণ করে যে, কেবল প্রতিরক্ষা বাজেটের আকার দেখে সামরিক শক্তি পরিমাপের চেষ্টা করা কতটা ভুল হতে পারে। তবে এই সম্পদের সংকটই একমাত্র কারণ নয়; এর চেয়েও বড় কারণ হলো ওয়াশিংটনের হাতে থাকা বিশাল প্রযুক্তিগত ও সামরিক সক্ষমতাকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে না পারা। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, কৌশলগতভাবে এবং কারিগরিভাবে যুক্তরাষ্ট্রের এখনো সেই ক্ষমতা রয়েছে যার মাধ্যমে তারা একটি বিস্তৃত যৌথ সামরিক অভিযান পরিচালনা করে ইরানকে পরাস্ত ও সে দেশের সরকারকে উৎখাত করতে পারে। এমনকি ১৯৯০ সালে ইরাকে যে পরিমাণ সৈন্য ব্যবহার করা হয়েছিল, তার চেয়ে অনেক কম সৈন্য দিয়েই তা করা সম্ভব। কিন্তু এখানে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সেই বিজয়ের মানবিক ও রাজনৈতিক মূল্য।
ইরানে যেকোনো ধরনের বড় মাপের স্থল অভিযান পরিচালনা করার অর্থ হলো হাজার হাজার মার্কিন সেনার হতাহত হওয়া, যার মধ্যে শত শত কিংবা হাজার হাজার সেনার মৃত্যু ঘটতে পারে। ১৯৯০ সালে যে মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থা এই ধরনের বড় ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি স্বীকার করতে দ্বিধা করেনি, আজকের মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থা সেই মানবিক মূল্য চুকাতে একদমই প্রস্তুত নয়। ২০২৬ সালের ৫ এপ্রিল বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর একজন এফ-১৫ মার্কিন পাইলটকে উদ্ধার করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যে নজিরবিহীন অভিযান পরিচালনা করেছিল, তা তাদের এই ভয় ও মানসিকতার চরম প্রমাণ দেয়। রিপোর্ট অনুযায়ী, সেই একজন মাত্র পাইলটকে বাঁচাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ১৭৬টি বিমান মোতায়েন করে এবং এই উদ্ধারকাজ পরিচালনা করতে গিয়ে তারা তিনটি মানবচালিত বিমান এবং দুই থেকে তিনটি হেলিকপ্টার হারায়, যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার। নিজ দেশের একজন সৈনিককে বাঁচানোর এই মানবিক ও সামরিক তাগিদ প্রশংসনীয় হলেও, বাস্তব কৌশলগত যুদ্ধের বিচারে কোনো সামরিক বাহিনী যখন একই সাথে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ জয়ের উদ্দেশ্যে লড়ছে, তখন একজন ব্যক্তির ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে এমন মাত্রাতিরিক্ত সম্পদ অপচয় করতে পারে না।
মার্কিন এই অত্যধিক সতর্কতা যুদ্ধের অন্যান্য ক্ষেত্রেও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। তাদের পদাতিক বাহিনীকে সবচেয়ে বিপজ্জনক বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো থেকে সম্পূর্ণ দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো ইরানের উপকূল থেকে কৌশলগতভাবে অনেক নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করছে, যা বাস্তবে তাদের নিজস্ব আক্রমণাত্মক সক্ষমতা ও কার্যকারিতাকে মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিয়েছে। এমনকি সাশ্রয়ী অভিযান সত্ত্বেও যে সামান্যসংখ্যক মার্কিন হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, ওয়াশিংটন সে সম্পর্কে পাবলিক ডোমেইনে অত্যন্ত কম তথ্য প্রকাশ করার চেষ্টা করছে। এটি ১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিকের সেই দুঃসাহসী ও উন্মুক্ত দৃষ্টিভঙ্গির সম্পূর্ণ বিপরীত।
এর পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে বিশাল আর্থিক সীমাবদ্ধতার চাপ। ১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে মার্কিন বাজেটের খরচ হয়েছিল প্রায় ৬৪ বিলিয়ন ডলার, যা পরোক্ষ খরচসহ ছিল ১২০ বিলিয়ন ডলার এবং বর্তমান মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করলে যা দাঁড়ায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। অন্যদিকে ২০২৬ সালের জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালনা করা চলতি অভিযানের খরচ ইতোমধ্যেই প্রায় ৩৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং বর্তমানে এটি ৫০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি গিয়ে ঠেকেছে, যদিও এটি এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত রাজনৈতিক বা সামরিক সাফল্য নিশ্চিত করতে পারেনি।
অতএব, এই যুদ্ধের পাঠ কেবল এই সহজ দাবিতে সীমাবদ্ধ নয় যে মার্কিন সামরিক শক্তি পৃথিবী থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিপুল সামরিক প্রযুক্তি ও আর্থিক সম্পদের মালিক। আসল পরিবর্তনটি ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেই সম্পদকে এক জায়গায় পুঞ্জীভূত করার ক্ষমতা, মিত্রদের একত্রিত করার সামর্থ্য এবং চূড়ান্ত রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় মানবিক ও আর্থিক মূল্য স্বীকার করার রাজনৈতিক সদিচ্ছার ক্ষেত্রে। অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম দেখিয়েছিল, মার্কিন সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব তার চরম শিখরে ঠিক কেমন রূপ নিতে পারে। কিন্তু বর্তমান ইরান যুদ্ধ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতা বিশ্বমঞ্চে উন্মোচন করছে—একটি পরাশক্তি যে এখনো শত্রুর ওপর অপরিসীম ধ্বংসলীলা ও ক্ষতি সাধন করতে সক্ষম, কিন্তু নিজ দেশের রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের সেই বিশাল সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক বিজয়ে রূপান্তরিত করতে ক্রমেই ব্যর্থ হচ্ছে।
লেখক: রাশিয়ার এইচএসই ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর কম্প্রিহেনসিভ ইউরোপিয়ান অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের পরিচালক।
(লেখাটি আরটি ডট কমের সৌজন্যে প্রকাশিত।)