চরচা: বিএনপি এখন সরকারে। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় দলের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
রুহুল কবির রিজভী: চ্যালেঞ্জ তো থাকবেই। পদে পদে এটিকে মোকাবিলা করে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়াটাই প্রধান কাজ। রাজনৈতিক নেতৃত্বের জায়গা থেকে সেটা চেষ্টা করব। অনেক সংকট থাকবে, অনেক সমস্যা থাকবে। সেগুলো নিরসন করে করে আমাদের সামনের দিকে এগোতে হবে।
চরচা: এখন দলের চেয়ারম্যান ও দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাকে ঘিরে দলের প্রত্যাশা কী?
রুহুল কবির রিজভী: আমাদের প্রত্যেকেরই বিশ্বাস এবং আমাদের প্রেরণার একটা উৎসস্থল এখন তারেক রহমান। কারণ, তার পিতা ও মায়ের যে অসমাপ্ত কাজ, সেই কাজগুলোকে তিনি পূর্ণতা দিচ্ছেন এবং পূর্ণতা দান করবেন।
এটা তার প্রতিটি বক্তব্যের মধ্যে, অভিপ্রায়ের মধ্যে রয়েছে। নির্বাচনের প্রাক্কালে দলের যে ইশতেহার, ৩১ দফা যে কর্মসূচি এবং তার আগে ম্যাডামের দেওয়া ২০৩০ ভিশন–সেগুলোর সমস্ত নির্যাস নিয়ে তিনি আজ দেশ গঠন ও পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করেছেন। নিরলস পরিশ্রম, আন্তরিকতা ও সততার সঙ্গে তিনি সামগ্রিকভাবে গোটা দেশকে বিবেচনা করে মানুষের স্বার্থে, মানুষের কল্যাণের স্বার্থে কাজ করে যাচ্ছেন।
চরচা: নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে সরকারের কাজকে কীভাবে দেখছেন?
রুহুল কবির রিজভী: একটার পর একটা কর্মসূচি (সম্পর্কে) তিনি নির্বাচনের আগে বলেছিলেন। সেই প্রতিশ্রুতি পূরণে তার যে নিরলস প্রচেষ্টা, অক্লান্ত প্রচেষ্টা–সেটা আপনারা দেখছেন।
সেটা ফ্যামিলি কার্ড হোক, কৃষক কার্ড হোক, প্রবাসী কার্ড হোক, খাল খনন হোক, বৃক্ষরোপণ হোক, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সম্মানী হোক অথবা পুরোহিতদের সম্মানী হোক–প্রত্যেকটি বিষয়ে যেগুলো প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সেগুলো নিয়েই তিনি কাজ শুরু করেছেন।
ছয় মাস পূর্ণ হলো। এই ছয় মাসে এই কাজগুলোর কী অগ্রগতি, সেটা নিয়ে আমরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটা ব্রিফিং করেছি। সেখানে কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে, তার কথা বলা হয়েছে। কিছু কিছু (ক্ষেত্রে) লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি কাজ হয়েছে।
বিশেষ করে বৃক্ষরোপণের ক্ষেত্রে ছয় মাসে টার্গেট ছিল আড়াই কোটি বৃক্ষরোপণ। সেখানে আমাদের তিন কোটির মতো হয়েছে। আর অন্যান্য যে কর্মসূচি, কোনোটা ছুঁই ছুঁই, কোনোটা (লক্ষ্যমাত্রা) অতিক্রম করে গেছে, কোনোটার লক্ষ্যমাত্রা পূর্ণ হয়েছে।
চরচা: এসব কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বিএনপির সাফল্যটা কোথায় দেখছেন?
রুহুল কবির রিজভী: যে দলের নেতৃত্বে আমরা কাজ করছি, বিএনপির চেয়ারম্যান ও দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার এই কাজগুলোর মধ্য দিয়ে আমাদের সার্থকতা হলো–জনগণের কাছে বিএনপি যে অঙ্গীকার করেছে, সেটা নির্বাচনে হোক, আন্দোলন-সংগ্রামে হোক, সেখান থেকে সে বিচ্যুত হয়নি। এটা বিএনপিকে গৌরব দান করেছে। এটা আমাদের গর্বিত অতীত।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। ছবি: চরচা
রাষ্ট্রনায়ক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে পথ দেখিয়েছেন, যে দর্শন দেখিয়েছেন, যে কাজ শুরু করেছেন, সেটাকে পূর্ণতা দান করেছেন নিজের বিশ্বাস, আস্থা এবং অঙ্গীকার পূরণের মধ্যে দেশনেত্রী খালেদা জিয়া। ঠিক একই কাজটা করছেন তারেক রহমান, বিএনপির সম্মানিত চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী।
সুতরাং যে দলের একটি গৌরবোজ্জ্বল অতীত আছে, সেই দল নিঃসন্দেহে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করবে।
চরচা: বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের কোন বিষয়গুলোকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন?
রুহুল কবির রিজভী: বিএনপির নানা কর্মসূচির মধ্যে তিনটা প্রত্যয় খুব শক্ত–যেটার সঙ্গে দল কখনোই আপস করেনি। সেটা হচ্ছে–বহুদলীয় গণতন্ত্র, স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব।
সার্বভৌমত্বকে শক্তিশালী করা, স্বাধীনতাকে রক্ষা করা এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার যে অঙ্গীকার, এই জায়গা থেকে বিএনপি কোনোদিনই বিচ্যুত হয়নি। এটা নিয়েই বিএনপি এগিয়ে চলে। এখানে কোনো ছাড় দেয়নি বিএনপি। যেমন দেননি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, যেমন দেননি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, ঠিক তেমনি দিচ্ছেন না জনাব তারেক রহমান। এটাই আমাদের সবচেয়ে গর্বের দিক।
চরচা: বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী দলের জন্য কতটা আনন্দের, আর কতটা বেদনার?
রুহুল কবির রিজভী: যেকোনো সংগঠন, প্রতিষ্ঠান বা যেটাই হোক না কেন, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী মানেই হচ্ছে আনন্দঘন পরিবেশ। সেই প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের মধ্যে সেদিন একটা প্রাণবন্ততা থাকে। দলের প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছর অতিক্রম করছে–এটা একদিকে আনন্দ।
তবে এই দলকে যিনি পুনর্গঠিত করেছেন, একেবারে তৃণমূলের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন, শহীদ জিয়ার প্রদর্শিত পথকে আরও মজবুত করেছেন এবং দীর্ঘ সময় এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রতিটি কর্মসূচিতে যার উপস্থিতি আমাদের প্রেরণা দিত, তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই। তিনি দলের চেয়ারপারসন, সাবেক চেয়ারপারসন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া।
এটাই হচ্ছে এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমাদের দুঃখ। প্রতিটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমরা তাকে নিয়ে শহীদ জিয়ার মাজারে যেতাম। অন্যরকম একটা আনন্দঘন পরিবেশ তৈরি হতো সেখানে। আমরা ফাতেহা পাঠ করতাম, পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করতাম। তারপরে নানা কর্মসূচি থাকত, নানাভাবে নানা দিকে সেসব কর্মসূচি পালন করা হতো।
১৯৮১-৮২ সাল থেকে দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে প্রতিটি মুহূর্তে এই দলের প্রধান যে সমস্ত দিবস, সেগুলোর মধ্যমণি ছিলেন তিনি। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই। এটা একটা বেদনাদায়ক দিক।
চরচা: আগামী এক বছরে বিএনপির দলীয় পরিকল্পনা কী?
রুহুল কবির রিজভী: আমাদের দল নিয়ে পরিকল্পনা–দল তো সরকার গঠন করেছে। দলের প্রতিটি নেতা-কর্মীকে সরকারের অংশ বলে মনে করি। দলের যে দর্শন, সেটা ধারণ করে সরকারের অংশ হয়ে থাকবে। আমি যে তিনটি কথা বললাম–বহুদলীয় গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা–এই দর্শনটা বুকে নিয়ে তারা সরকারের অংশ থাকবে।
গণতন্ত্র মানে হচ্ছে নাগরিক অধিকার বা নাগরিক স্বাধীনতা। তাহলে নাগরিকের স্বার্থে সরকার যা করছে, সেই বিষয়গুলো জেনে সেটার ব্যাপারে জনগণকে জানানো এবং সরকারের প্রতিটি কর্মসূচি যাতে সাফল্যমণ্ডিত হয়, সেই বিষয়টি তারা খেয়াল করবে। তারা সেখানে অংশগ্রহণ করবে অন্যভাবে।
যদি খাল খনন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে হয়, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় ছাত্ররা, যুবকেরা সবাই অংশগ্রহণ করত। ও রকম অংশগ্রহণ করলেও সরকারের দায়িত্ব পালন করবে নেতা-কর্মীরা।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। ছবি: চরচা
চরচা: সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়নে নেতা-কর্মীদের জন্য আপনার বিশেষ বার্তা কী?
রুহুল কবির রিজভী: নেতা-কর্মীদের জন্য আরেকটা বার্তা হচ্ছে–তারা কোনো ধরনের অনৈতিক প্রলোভনের সঙ্গে নিজেদের জড়াবে না। নিজের মনকে আলোকিত রাখবে। নিজের মনকে স্বচ্ছ রাখবে। এই কারণে দেখা যাবে, সরকারের কোনো কাজকর্মে যারা বাস্তবায়নের সঙ্গে আছেন, তারা যদি কোনো ধরনের অন্যায় কিছু করেন, তাহলে নেতা-কর্মীরা সেটা ধরে ফেলতে পারবে, সেটা বলতে পারবে, জানাতে পারবে।
এটা সরকারের কর্মসূচি, এটা তারেক রহমান সাহেবের নেতৃত্বে পরিচালিত কর্মসূচি। এখানে কোনো ফাঁকিবাজি চলবে না।
আপনার খাল খনন হচ্ছে, সেখানে দেখা গেল এক হাত সমান গর্ত হয়েছে–এটা হলে তো খাল কাটার যে মূল টার্গেট, সেই টার্গেট পূরণ হবে না। সুতরাং এই জিনিসটা নেতা-কর্মীরা লক্ষ্য করবে, জানবে। জানার পর তারা জানাবে যে না, এখানে ফাঁকিবাজির কাজ হচ্ছে। তারা সেটা কেন্দ্রে জানাবে।
আর নিজেদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ থাকবে। কোনো ধরনের বিভ্রান্তিতে তারা ভুগবে না। এটা মাথার মধ্যে রাখবে। তাহলে আমরা মনে করি, এই দলটিকে আমরা শক্তিশালী হিসেবে গড়ে তুলতে পারব এবং জনসমর্থন আমাদের অব্যাহত থাকবে, জনসমর্থন কমবে না।
চরচা: সাংগঠনিকভাবে আগামী দিনে বিএনপির প্রধান কাজ কী হবে?
রুহুল কবির রিজভী: সাংগঠনিক কার্যক্রম যেটা চলমান আছে, সেটা থাকবে। এরপর যদি জাতীয় কাউন্সিলের তারিখ এবং মাস ঘোষণা করা হয়, তাহলে সেটাকে কেন্দ্র করে জেলা পর্যায়ের কাউন্সিলগুলো, যেগুলো কমপ্লিট হয়নি, সেগুলো চলবে।
থানা পর্যায়ের কাউন্সিল, যেগুলো বাকি আছে, সেগুলো হবে। ইউনিট পর্যায়ে যেগুলো বাকি আছে, সেগুলো হবে। এই কর্মযজ্ঞগুলো চলবে।
এখন যেভাবে চলছে, ইনকমপ্লিট যেগুলো আছে–থানা কাউন্সিল, জেলা কাউন্সিল, তার কার্যক্রম তারা করবে। একটা ওয়ার্কার্স মিটিং করা, কর্মীসভা করা–এগুলো চলবে। যেমন ধরুন, এই ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে নিয়ে জেলায় জেলায় তারা নিজেরা কর্মীসভা করে, নিজেরা একটা কর্মসূচি নেবে। পয়লা সেপ্টেম্বরকে কেন্দ্র করে এটা তারা করতে পারে। এটাও সাংগঠনিক কার্যক্রমের অংশ।
আমরা এ কারণে প্রতিটি জেলায় বলে দিয়েছি যে, তারা নিজেদের উদ্যোগে, নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী আলোচনা সভা করবে, র্যালি করতে পারে, কর্মসূচি নিতে পারে।
চরচা: সাংগঠনিক কার্যক্রমের গতি কি সামনে আরও বাড়বে?
রুহুল কবির রিজভী: যেটা চলমান আছে, সেটা চলমান থাকবে। কখনো কখনো ইন্টেনসিটি বৃদ্ধি পেতে পারে। জাতীয় কাউন্সিল হলে জাতীয় কাউন্সিলের আগে আমরা চেষ্টা করি যে, সর্বোচ্চ জেলা কাউন্সিলগুলো সম্পন্ন করতে। এটাই হলো আমাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম।
এই যে পার্টি অফিসে আসছি, আমাদের যে যুগ্ম মহাসচিব, যুবদলের সব নেতারা আছেন, আগের নেতারা–এই যে কথা বলছি, সাংগঠনিক অবস্থা সম্পর্কে জানছি, এটাও অর্গানাইজেশনাল কাজ। সুতরাং আমাদের কাজ থেমে নেই।