
‘আমরা জেনারেশন নাইন ইলাভেন’
ইতিহাসের পাতায় হয়তো ঘটনাটি এক দিনের। কিন্তু এর প্রভাব আমরা বহন করছি বছরের পর বছর ধরে–আমাদের চিন্তায়, প্রবাসে থাকা প্রিয়জনদের অভিজ্ঞতায়, নিজেদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অভিজ্ঞতায় আর বিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে।
বিদ্যুৎ যায়-আসে। ফ্যান ঘোরে না, মেশিন থামে, শিক্ষার্থীর পরীক্ষার প্রস্তুতি আটকায়। এই দৃশ্য নতুন নয়। কিন্তু সরকার বদলের পর দায়ও বদলে যায়। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার এবং সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, বিদ্যুৎ সংকটের জন্য বিএনপি সরকারের ন্যূনতম দায় নেই। দায় বিগত সরকারের। পরে তিনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন ‘বিগত সরকার’ মানে আওয়ামী লীগ সরকার। বিএনপির পক্ষ থেকেও একই সুর- আওয়ামী লীগ ১৫ বছরে গ্যাসের কূপ খনন করেনি, অনুসন্ধান করেনি। প্রশ্নটা এখানেই। যদি কূপই না খোঁড়া হয়, তাহলে সাড়ে ১৫ বছর দেশ চলল কী দিয়ে? আর ২০০৬ সালে ৩৫০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা নিয়ে ক্ষমতা ছাড়া একটি দল, ২০২৪ সালে এসে কেন ১৭ হাজারের বেশি চাহিদাও সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে?
সংখ্যা কথা বলে। ২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত সরকারের শেষ সময়ে দেশের স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল প্রায় ৩৫০০ মেগাওয়াট, চাহিদা ছিল ৫৫০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি। ঘাটতি মেটানোর উপায় ছিল না বলেই লোডশেডিং তখন নিত্যসঙ্গী। সেই বছরের কানসাটের ঘটনা এবং ঢাকার শনির আখড়া-যাত্রাবাড়ীতে তৎকালীন এমপিকে ধাওয়ার ঘটনা সেই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ। এরপর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে প্রথম কাজই করে দ্রুত বিদ্যুৎ দেওয়া।
ভয়াবহ লোডশেডিং থেকে মুক্তি দিতে উচ্চমূল্যের কুইক রেন্টাল প্লান্ট আনা হয়। সমালোচনা সত্ত্বেও এই সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিক স্বস্তি দেয়। পাশাপাশি বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র, গ্রিড সম্প্রসারণ এবং সঞ্চালন লাইনের কাজ শুরু হয়। ফল হিসেবে ২০২৪ সাল নাগাদ দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়ায় প্রায় ২৮ হাজার থেকে ৩০ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে, যেখানে পিক চাহিদা গ্রীষ্মে ১৬ হাজার থেকে ১৭ হাজার মেগাওয়াট। ২০২৬ সালের মে মাসে বিএনপি সরকারের সময়ে সর্বোচ্চ ১৭ হাজার ২০১ মেগাওয়াট উৎপাদনের রেকর্ডও হয়েছে। তার মানে উৎপাদন ক্ষমতার অভাব এখন মূল সমস্যা নয়।
তাহলে সমস্যাটা কোথায়? জ্বালানি। বিদ্যুৎকেন্দ্র বানিয়ে দিলেই চলে না, তেল-গ্যাস-কয়লা লাগে। ‘বিগত সরকারের’ আমলে কয়লাভিত্তিক প্লান্ট হয়েছে, রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প এগিয়েছে, এলএনজি টার্মিনাল বসেছে। কয়লা দিয়ে প্রায় ৮ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা হরমুজ প্রণালির টানাপোড়েন এড়িয়ে ইন্দোনেশিয়া বা অস্ট্রেলিয়া থেকে আনা সম্ভব। কিন্তু গ্যাসের ক্ষেত্রে গল্পটা ভিন্ন। ২০০৮ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বড় কোনো নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হয়নি।
ভোলায় নতুন স্তরে গ্যাস পাওয়া গেছে, পরিত্যক্ত কূপও চালু হয়েছে, তবে সাগরে বড় অনুসন্ধান নিয়ে বিতর্ক, আন্দোলন এবং চুক্তি জটিলতার কারণে অগ্রগতি ধীর ছিল। ফলে চাহিদা বাড়লেও দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমেছে। ঘাটতি মেটাতে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ডলারের দাম বাড়া এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের টানাপোড়েন ইত্যাদি আমদানিকে আরও ব্যয়বহুল করেছে।
বর্তমান বিএনপি সরকারের সামনে তাই দুই চাপ। একদিকে ডলার বাঁচাতে হবে, অন্যদিকে শিল্প-কারখানা চালু রাখতে গ্যাস-তেল কিনতেই হবে। রিজার্ভ ধরে রাখার চিন্তা থেকে জ্বালানি আমদানি কমালে লোডশেডিং বাড়ে। আবার লোডশেডিং বাড়লে কারখানা বন্ধ হয়, রপ্তানি আয় কমে, রিজার্ভ আরও চাপে পড়ে। এটি দুষ্টচক্র। অন্তর্বর্তী ইউনূস সরকার দেড় বছরে যে সংকট তীব্র হতে দেয়নি, তার কারণ ছিল আগের কেনা এলএনজির চালান, কুইক রেন্টালের চুক্তি নবায়ন এবং চাহিদা কিছুটা কম থাকা। এখন গ্রীষ্মের পিকে এসে সেই বাফার শেষ। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কিছু প্লান্টের রক্ষণাবেক্ষণ। শীতে ওভারহলিং না করে গ্রীষ্মে করা হলে কষ্ট বাড়ে, কারণ তখন বিকল্প কম।
দায় চাপাচাপির চেয়ে জরুরি এখন বাস্তব সমাধান। প্রথমত, গ্যাস খাতের সিস্টেম লস ও চুরি বন্ধ করতে হবে। বিতরণ কোম্পানিগুলোর হিসাবে যে পরিমাণ গ্যাস ‘হারিয়ে যায়’ তা কমানো গেলে আমদানি চাপ অনেকটাই কমে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জ্বালানি মিশ্রণে ভারসাম্য আনা। শুধু গ্যাসের ওপর নির্ভর না করে কয়লা, নবায়নযোগ্য এবং পারমাণবিকের বিদ্যুৎকে বেজ লোডে রাখা। তৃতীয়ত, শিল্প এলাকায় লোডশেডিং না করে বাসাবাড়ি ও অফিসে সময়ভিত্তিক রেশনিং। কলকারখানা বন্ধ হলে রাজস্বও বন্ধ, কর্মসংস্থানও বন্ধ। চতুর্থত, সাগরে অনুসন্ধানে রাজনৈতিক বাধা কমিয়ে দ্রুত চুক্তি করা। কূপ খুঁড়লেই গ্যাস মিলবে এমন নিশ্চয়তা নেই, তবে না খুঁড়লে নিশ্চিতভাবেই মিলবে না।
শেষ কথা হলো, মানুষ পরিসংখ্যান বোঝে না, তারা আলো বোঝে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের বক্তব্য নিয়ে ট্রল হয়, কারণ বাস্তবের সঙ্গে কথার মিল থাকে না। বিদ্যুৎ সভ্যতার মাপকাঠি। যে দেশে মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়ে, সে দেশেই কলকারখানা বাড়ে, স্কুলে কম্পিউটার চলে, হাসপাতালে আইসিইউ চলে। রিজার্ভ বাঁচাতে গিয়ে অর্থনীতিকে অচল করে দিলে লাভ নেই। সরকারকে এখনই ঠিক করতে হবে—অল্প কিছুদিন কষ্ট করে জ্বালানি কিনে শিল্প বাঁচাবে, নাকি জ্বালানি না কিনে লোডশেডিং দিয়ে সাময়িক স্বস্তি দেখাবে। প্রথম পথ কঠিন, কিন্তু টেকসই। দ্বিতীয় পথ সহজ, কিন্তু ভয়ংকর।
জনগণ সহযোগিতা করবে যদি সত্য জানতে পারে। লুকোচুরি নয়, স্বচ্ছ হিসাব, বাস্তব পরিকল্পনা আর দ্রুত বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। নইলে ‘বিদ্যুৎ যায় আসে’ এই বাক্যটাই আগামী দিনের রাজনীতির এপিটাফ হয়ে থাকবে।
সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

‘আমরা জেনারেশন নাইন ইলাভেন’
ইতিহাসের পাতায় হয়তো ঘটনাটি এক দিনের। কিন্তু এর প্রভাব আমরা বহন করছি বছরের পর বছর ধরে–আমাদের চিন্তায়, প্রবাসে থাকা প্রিয়জনদের অভিজ্ঞতায়, নিজেদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অভিজ্ঞতায় আর বিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে।

এইটিজের ফ্যাশনে মেতে পরিবেশের কী ক্ষতি করছেন জানেন?
আজ সকালে আমার বন্ধু বলছিল, ফেসবুক খুললেই সবাই ট্রেন্ডে গা ভাসিয়ে ৮০’র দশকের মতো করে ছবি দিচ্ছে। জানতে চাইছিল–এসব নিয়ে আমার মতামত কী? আমি বললাম, “আমরা এমন একটা অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আমরা সবদিক থেকে; যেমন–বিদ্যুৎ নাই, গ্যাস নাই, বাজার মূল্য অনিয়ন্ত্রিত, চাঁদাবাজি, লং মার্চ, ফুটপাত দখল

রক্ত-মাংসের মানুষকে আস্ত গিলে খাওয়ার এক দেশে!
আত্মহত্যা বা আত্মহনন। এই কাজটি কোনো সমাজেই খুব একটা দুর্লভ কোনো বিষয় নয়। বরং সব ধরনের সমাজেই প্রবলভাবে বিরাজমান যেসব বৈশিষ্ট্য আমরা দেখি, সেগুলোর মধ্যে আত্মহত্যা অন্যতম। সে কারণে আত্মহত্যার চেষ্টাও একটি পরিচিত ঘটনা। তবে কোন সমাজ এই দুটি কাজকে কোন দৃষ্টিতে দেখে বা বিবেচনা করে, সেটিই বলে দেয় কোন

আজও কেন প্রাসঙ্গিক অরওয়েলের ‘১৯৮৪’
জর্জ অরওয়েলের নাইনটিন এইটি ফোর প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪৯ সালে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার কয়েক বছর পর। তবে বইটিকে কেবল তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের সমালোচনা হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য অনেকটাই সীমিত হয়ে যায়। অরওয়েলের চিন্তার পেছনে ছিল ইউরোপে ফ্যাসিবাদ ও সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রব্যবস্থার উত্থান