Advertisement Banner

দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ

বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও ব্যয় বৃদ্ধির চাপে কুপোকাত দেশের পোশাক খাত

মে মাসে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ ছিল না। আর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর চট্টগ্রামে প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়েছে।

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও ব্যয় বৃদ্ধির চাপে কুপোকাত দেশের পোশাক খাত
বিদ্যুৎ সংকটে সবচেয়ে বেশি ভুগছে তৈরি পোশাক খাত। ছবি: রয়টার্স

চলতি মাসের ৭ তারিখে মাধবপুরের কোরটেক্স অ্যাপারেলস কারখানায় কাজে গিয়ে শ্রমিক শ্যামলী খাতুন দেখেন, কারখানার গেটে ছাঁটাইয়ের নোটিশ টাঙানো।

শ্যামলী বলেন, “আমার জন্য নতুন চাকরি খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন হবে। একজন নারী হিসেবে আমার কাজের সুযোগও কম। হয়তো আমাকে আবার গ্রামে ফিরে যেতে হবে।”

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত চাকরি হারানো অন্তত ৯ হাজার ৫০০ শ্রমিকের একজন শ্যামলী খাতুন।

ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবদেনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ আপাতত বন্ধ হলেও বাংলাদেশে এখনো এর প্রভাব চোখে পড়ার মতো। দেশে বিদ্যুৎ সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে। এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ভুগছে তৈরি পোশাক খাত।

পোশাক কারখানার সুতা, নিটিং ও ডাইং মিল চালাতে প্রচুর গ্যাস ও জ্বালানি লাগে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ তেল ও গ্যাস আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। ওই অঞ্চলে অস্থিরতার কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে, ফলে কারখানাগুলোর উৎপাদন খরচও বেড়ে গেছে।

ছবি: রয়টার্স
ছবি: রয়টার্স

বাড়তি খরচ সামলাতে না পেরে গত ৬ জুন ঢাকার বড় পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আল-মুসলিম গ্রুপ তাদের নিটওয়্যার ও ডেনিম কারখানা থেকে প্রায় এক হাজার ৯০০ কর্মী ছাঁটাই করেছে।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্প খাতে ৪০ লাখের বেশি মানুষ কাজ করেন, যাদের বেশিরভাগই নারী। তারা জারা ও এইচঅ্যান্ডএম-এর মতো পশ্চিমা ব্র্যান্ডের জন্য পোশাক তৈরি করেন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের ২৫ শতাংশ মানুষের জীবিকা এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল।

গত বছর দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১৩ শতাংশ। পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের দ্বিতীয়, প্রথমে রয়েছে চীন।

এই সংকট যুদ্ধের আগেই শুরু হয়েছিল।

শিল্প বিশ্লেষক মেহেদী মাহবুব মনে করেন, ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে বাংলাদেশকে নির্ভরযোগ্য উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

ওই সময় দেশজুড়ে আন্দোলনের কারণে অনেক পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল, পাঁচটি কারখানায় আগুনও দেওয়া হয়। এছাড়া গ্রেপ্তার হওয়া আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাও পোশাক কারখানার মালিক ছিলেন। গত তিন বছরে ৪০০টিরও বেশি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্প খাতে ৪০ লাখের বেশি মানুষ কাজ করেন, যাদের বেশিরভাগই নারী। ছবি: রয়টার্স
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প খাতে ৪০ লাখের বেশি মানুষ কাজ করেন, যাদের বেশিরভাগই নারী। ছবি: রয়টার্স

মে মাসে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ ছিল না। আর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর চট্টগ্রামে প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়েছে। উৎপাদন চালিয়ে রাখতে অনেক পোশাক কারখানা ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করছে। কিন্তু জেনারেটর চালু করতে ১০–১৫ মিনিট সময় লাগে।

বাংলাদেশ এথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভের আবিল বিন আমিন দ্য ইকোনমিস্টকে বলেন, পোশাক শিল্পে সময়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই সামান্য দেরিও বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। ফলে ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে।

দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোও আগের তুলনায় বাংলাদেশে কম অর্ডার দিচ্ছে। কারণ উৎপাদনে দেরি হচ্ছে, পণ্য পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে এবং পশ্চিমা দেশগুলোর ক্রেতারাও আগের মতো পোশাক কিনছেন না।

প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের ২৫ শতাংশ মানুষের জীবিকা এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। ছবি: রয়টার্স
প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের ২৫ শতাংশ মানুষের জীবিকা এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। ছবি: রয়টার্স

ঢাকার একটি জ্যাকেট কারখানার মালিক আবদুল্লাহ হিল নাকিব বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তার কারখানার অর্ডার প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে টানা দশম মাসের মতো পোশাক রপ্তানি কমেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি ৮ শতাংশ কমেছে।

তেলের দাম বাড়ায় পোশাক তৈরির কাঁচামালের খরচও বেড়েছে। পোশাক তৈরিতে ব্যবহৃত অনেক উপকরণই পেট্রোকেমিক্যাল থেকে তৈরি। এর মধ্যে রয়েছে সিনথেটিক বা কৃত্রিম তন্তু, রং, কাপড়ের ফিনিশিংয়ে ব্যবহৃত রাসায়নিক, প্লাস্টিকের বোতাম ও জিপার। এসব উপকরণ মিলিয়ে একটি পোশাকের মোট উৎপাদন খরচের প্রায় ৬৫ শতাংশ।

বাংলাদেশে প্রায় ৩০ শতাংশ পোশাক পলিয়েস্টার সুতা ও তন্তু দিয়ে তৈরি হয়। এগুলো ন্যাফথা (একটি পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য) থেকে উৎপাদিত হয়, আর যুদ্ধ শুরুর পর ন্যাফথার দাম প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়েছে।

এ ছাড়া দেশের বেশিরভাগ কারখানা উৎপাদনের পুরো কাজ এক জায়গায় করে না। কেউ সুতা তৈরি করে, কেউ কাপড়, কেউ রং করে, আবার কেউ শুধু পোশাক সেলাই করে। ফলে এক ধাপ থেকে আরেক ধাপে পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়ে যায়। আবদুল্লাহ হিল নাকিবের হিসাবে, তার পরিবহন ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে।

সংকটে থাকা ব্যবসাগুলোকে সহায়তা দিতে মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০০ বিলিয়ন টাকার (প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার) একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। এর সবচেয়ে বড় অংশ পোশাক শিল্পের জন্য রাখা হয়েছে। তবে এই ঋণের সুদ প্রায় ৭ শতাংশ, যা আগে থেকেই আর্থিক চাপে থাকা অনেক কারখানার জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দ্য ইকোনমিস্ট বলেছে, করোনা মহামারির সময় উৎপাদন খরচ বাড়লেও বড় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের দাম বাড়াতে রাজি হয়নি। এবারও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০টি কারখানার অন্তত ৯ হাজার ৫০০ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে ২০২৩ ও ২০২৪ সালের মতো আবারও শ্রমিক অসন্তোষ ও অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সম্পর্কিত