Advertisement Banner

মালয়েশিয়ায় আনোয়ার ইব্রাহিমের সরকার কি বিপদে?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
মালয়েশিয়ায় আনোয়ার ইব্রাহিমের সরকার কি বিপদে?
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। ছবি: রয়টার্স

ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানোর দীর্ঘ যাত্রায় আনোয়ার ইব্রাহিমকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দুর্নীতি ও সমকামিতার অভিযোগে প্রায় ১০ বছর কারাগারে কাটাতে হয়েছে। ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা এই নেতা এখন যেন অন্য এক ধরনের বন্দিদশার মুখোমুখি।

ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্ট বলছে, দীর্ঘদিন ধরে যে পদের জন্য তিনি লড়াই করেছেন, সেই পদে বসার সাড়ে তিন বছরেরও বেশি সময় পর, মালয়েশিয়ার রাজনীতির এই অভিজ্ঞ নেতার চারপাশের দেয়ালগুলো এখন সংকুচিত হয়ে আসছে।

সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা একটি জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আনোয়ার ইব্রাহিম, কিন্তু তার অংশীদার দলগুলো এখন জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজছে।

সামনে মালয়েশিয়ায় দুটি রাজ্যের নির্বাচন হতে যাচ্ছে, যার ফলাফল তার পক্ষে না গেলে বর্তমান সরকারের পতন ঘটতে পারে। দক্ষিণাঞ্চলের ডেটা-সেন্টার পাওয়ারহাউজ হিসেবে পরিচিত 'জহুর' এবং উপদ্বীপের কিছুটা ওপরের দিকে অবস্থিত ছোট রাজ্য 'নেগেরি সেমবিলান'-এর এই ভোটাভুটি সরাসরি কেন্দ্রীয় সংসদের গঠনে কোনো প্রভাব ফেলবে না। তবে জোটের শরিক দলগুলো এই দুই রাজ্যে একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মূলত নিজেদের শক্তি পরীক্ষা করছে।

এই শরিকদের একটি হলো ‘ইউনাইটেড মালয়েস ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন’ (ইউএমএনও)। দলটি ২০১৮ সালে ক্ষমতা হারানোর আগে দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ার শাসনক্ষমতায় ছিল। আনোয়ারের এই বহুদলীয় জোটে দ্বিতীয় সারির ভূমিকা পালন করাটা দলটির সদস্যরা সহজে মেনে নিতে পারছে না।

আরও বড় বিষয় হলো, এর জন্য তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এবং জোটে একক বৃহত্তম দল হিসেবে থাকা চীনা-সংখ্যাগরিষ্ঠ ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন পার্টির (ডিএপি) সঙ্গে হাত মেলাতে হয়েছে। ইউএমএনও নিজেদের মালয়েশিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ মালয় জনগোষ্ঠীর জন্য দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা কোটা ও বিশেষ সুবিধাভিত্তিক (অ্যাফারমেটিভ অ্যাকশন) নীতির পক্ষে। অন্যদিকে, ডিএপি জাতিগত কোটার পরিবর্তে মেধাভিত্তিক (মেরিটোক্রেসি) ব্যবস্থা চালুর পক্ষে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি এই রাজ্য নির্বাচনে ইউএমনও ভালো ফল করে, তবে তা দলটিকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে জোট থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে আগামী নির্বাচনে একা লড়াই করার আত্মবিশ্বাস জোগাতে পারে। এটি নিজে থেকে হয়তো সরকারের পতন ঘটাবে না। কিন্তু ডিএপি-ও জোট ছাড়ার কথা ভাবছে।

আনোয়ার ইব্রাহিম মালয়দের বিশেষ সুবিধা সংক্রান্ত নীতি সংস্কার করতে অস্বীকৃতি জানানোয় ডিএপি-র সাবেক সমর্থকেরা বিপুল সংখ্যায় দলটির ওপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আগামী ১৬ আগস্ট ডিএপি-র প্রতিনিধিরা একটি বিশেষ সম্মেলন করতে যাচ্ছেন, যেখানে তারা সিদ্ধান্ত নেবেন যে তারা আনোয়ারের সাথে থাকবেন কি না। তারা যদি জোট থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়, তবে বর্তমান সরকারের পতন ঘটবে। এর ফলে বর্তমান সংসদের মেয়াদ এক বছরেরও বেশি বাকি থাকতেই আগাম নির্বাচন দিতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এর জন্য আনোয়ার ইব্রাহিম কেবল নিজেকেই দোষ দিতে পারেন। প্রায় তিন দশক ধরে নিজেকে সংস্কারের অগ্রদূত হিসেবে তুলে ধরার পর, ক্ষমতায় এসে তিনি এই বিষয়ে অত্যন্ত ধীরগতিতে ও নামমাত্র কাজ করেছেন। তার সমর্থকেরা অবশ্য যুক্তি দেন যে, জোট সরকারের সমীকরণের কারণে তাকে বুঝেশুনে পা বাড়াতে হচ্ছে। কিন্তু আনোয়ারের নিজের দল পিপলস জাস্টিস পার্টি (পিকেআর)-এর অনেক পুরনো সহযোদ্ধা এই যুক্তির সাথে একমত নন। গত মাসে পিকেআর-এ আনোয়ারের সাবেক ডেপুটি রাফিজি রামলি দল ছেড়েছেন এবং সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে নিজের নতুন দল গঠন করেছেন।

রাজ্য নির্বাচনগুলো হয়তো ইঙ্গিত দেবে যে আনোয়ার ইব্রাহিমের পর মালয়েশিয়ার রাজনীতি কোন দিকে যাচ্ছে। মালয়েশীয় রাজনীতি বিশেষজ্ঞ ব্রিজেট ওয়েলশ-এর মতে, নেগেরি সেমবিলানে মালয় জাতীয়তাবাদী দল ‘ইউএমএনও’ এবং ইসলামপন্থী দল ‘পিএএস’ -এর মধ্যে একটি জোট গঠনের সম্ভাবনা রয়েছে। এটি পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় পর্যায়েও তাদের জোটবদ্ধ হওয়ার পূর্বাভাস হতে পারে। আর তেমন কোনো জোট গঠিত হলে, সেটি আনোয়ার ইব্রাহিমের চেয়েও দেশ সংস্কারের কাজে আরও কম আগ্রহী হবে।

সম্পর্কিত