জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের বিপরীতে নিজেদের ছায়া বাজেট প্রকাশ করেছিল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ছায়া বাজেটে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যয় এবং উন্নয়নের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শুধু প্রস্তাব নয়, বাজেট অধিবেশনে দলটির সংসদ সদস্যদের এ–সংক্রান্ত বক্তব্যও সবার নজর কেড়েছে।
গত কয়েক মাস ধরেই এনসিপির নেতারা দেশের ভূ-নিরাপত্তা, সীমান্ত পরিস্থিতি, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং আঞ্চলিক কৌশলগত পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছেন। কিন্তু সেই আলোচনাকে নতুন মাত্রা দেয় সংসদে দেওয়া একটি বক্তব্য।
গত ১৮ জুন প্রস্তাবিত ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এনসিপির সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মুজাহিদ বলেন, “দেশকে রক্ষা করার জন্য সবাইকে যদি একবেলা না খেয়েও থাকতে হয়, তবুও স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমাদের বাজেট বেশি করে দিন।”
বক্তব্যটি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও এর ভাষা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কারণ, বাংলাদেশের মতো একটি দেশে খাদ্য নিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা এখনো বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ। ফলে ‘না খেয়ে থাকার’ বিনিময়ে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর আহ্বান স্বাভাবিকভাবেই জনপরিসরে প্রশ্ন তুলেছে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, জাতীয় নিরাপত্তা এবং মানবিক নিরাপত্তাকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ’ (বিআইপিএসএস)-এর সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) এ এন এম মুনীরুজ্জামান বলেন, “মানুষের নিরাপত্তা আগে বন্দোবস্ত করতে হবে, মানে হিউম্যান সিকিউরিটি আগে করতে হবে। সাথে সাথে জাতীয় নিরাপত্তা আসবে। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত (করার কাজটি) প্রথম করতে হবে। সেখানে খাদ্য, বাসস্থান–এগুলো অন্তর্ভুক্ত হয়। কাজেই এখানে একটা ভারসম্য বজায় রাখতে হবে। একটাকে বাদ দিয়ে আরেকটা করা যাবে না।”
এই নিরাপত্তা বিশ্লেষকের বক্তব্যে স্পষ্ট যে, নিরাপত্তা কেবল সামরিক শক্তির প্রশ্ন নয়; এটি মানুষের জীবনযাত্রার মান, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
এনসিপির উদ্বেগ: সীমান্ত, মিয়ানমার ও বঙ্গোপসাগর
গত ৬ জুন ‘বাংলাদেশ ২.০: সংস্কার, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের মাধ্যমে টেকসই প্রবৃদ্ধি’ শীর্ষক ছায়া বাজেট প্রকাশ করে এনসিপি। সেখানে প্রতিরক্ষা খাতে মোট ৩৯ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়।
ছায়া বাজেটে দলটি বলেছে, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীল ভূরাজনৈতিক পরিবেশে কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখার জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতে, দেশের নদীবহুল ভূপ্রকৃতি এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক নিরাপত্তা বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন অপরিহার্য।
সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে আতিকুর রহমান মুজাহিদ বিদ্যমান বাজেট কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, “প্রতিরক্ষা খাতে মাত্র ৪২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৩৫ হাজার কোটি টাকাই পরিচালনা ব্যয়। মাত্র ৭ হাজার কোটি টাকা দিয়ে কি আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন সম্ভব?”

তার দাবি, বাংলাদেশের চারপাশে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে। পঞ্চগড়, হিলি, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, ফেনী এবং ‘চিকেন নেক’ অঞ্চলকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হচ্ছে।
মিয়ানমার সীমান্তের সংঘাত পরিস্থিতিকেও তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন। তার মতে, মিয়ানমারে চলমান যুদ্ধ, পার্বত্য চট্টগ্রামে কুকি-চিনসহ বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর উপস্থিতি এবং বঙ্গোপসাগরে ক্রমবর্ধমান ভূ-কৌশলগত প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিকল্পনাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে।
একইসঙ্গে তিনি নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরে বিদ্যমান নৌ-সক্ষমতা এবং আকাশ প্রতিরক্ষার বর্তমান অবস্থা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়।
জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ থেকে ইউএভি ব্রিগেড
এই উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে এনসিপির প্রস্তাব কেবল বাজেট বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দলটি একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা সংস্কার পরিকল্পনা তুলে ধরেছে।
প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা কার্যক্রম, কূটনীতি এবং দুর্যোগ প্রস্তুতির মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য একটি জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ গঠনের কথা বলা হয়েছে। এ লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রতিরক্ষা বাজেটে অতিরিক্ত ৫ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দিয়েছে দলটি।
জাতীয় সক্ষমতা ও সহনশীলতা জোরদার করতে প্রতি বছর ৩০ হাজার তরুণ-তরুণীকে ১০ সপ্তাহব্যাপী সামরিক ও দুর্যোগ-প্রতিক্রিয়া প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একটি আধুনিক রিজার্ভ বাহিনী গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে বর্তমান স্থায়ী সামরিক বাহিনীর দ্বিগুণ আকারের একটি রিজার্ভ বাহিনী গড়ে তোলার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে। বাস্তবায়ন ব্যয় কমানোর জন্য বিদ্যমান বাংলাদেশ আনসারের অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ সুবিধা ব্যবহারের প্রস্তাবও রয়েছে।
প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে আগামী পাঁচ বছরে অন্তত আটটি মধ্যম-পাল্লার ভূমি-থেকে-আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারি সংগ্রহের কথা বলা হয়েছে। সম্ভাব্য ব্যবস্থার মধ্যে LY-80 বা HISAR-O-এর মতো প্ল্যাটফর্মের নামও উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া আক্রমণাত্মক ড্রোন, গোয়েন্দা ও নজরদারি ইউএভি এবং কৌশলগত ড্রোনে সজ্জিত একটি স্বতন্ত্র ইউএভি ব্রিগেড গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দেশে ড্রোন উৎপাদন এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিভিত্তিক শিল্প-পরিবেশ গড়ে তোলার কথাও বলা হয়েছে।
দেশীয় গবেষণা ও উন্নয়ন, সামরিক ইলেকট্রনিক্স, নির্ভুল আঘাত হানার সক্ষমতা এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরভিত্তিক অংশীদারত্বে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনাও এনসিপির প্রতিরক্ষা ভাবনার অংশ।
নিরাপত্তা আগে, নাকি মানুষের মৌলিক চাহিদা?
এনসিপির এই পরিকল্পনা উচ্চাভিলাষী হলেও সমালোচকদের প্রশ্ন হলো–এর অর্থনৈতিক মূল্য কত এবং এর সুযোগব্যয় কী?
বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমোডর ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বলেন, “না খেয়ে তো আপনি স্কুল পাঠাবেন, কলেজ বানাবেন, বিশ্ববিদ্যালয় বানাবেন, রাস্তাঘাট বানাবেন। না খেয়ে যুদ্ধ করা যায় না।”
তার বক্তব্যে একটি মৌলিক নীতিগত প্রশ্ন উঠে আসে। একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কি শুধু অস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র ও সেনা সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে, নাকি শিক্ষিত, সুস্থ ও অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম জনগোষ্ঠীর ওপরও সমানভাবে নির্ভরশীল?
বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তা ধারণায় গত কয়েক দশকে ‘হিউম্যান সিকিউরিটি’ বা মানবিক নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে এখন জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখা হয়।
প্রতিরক্ষা উন্নয়ন, নাকি অগ্রাধিকারের পুনর্বিন্যাস?
এনসিপি অবশ্য বলছে, তাদের প্রস্তাবকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল্লাহ আল ফয়সালের মতে, “ডিফেন্স বাজেটে দুইটা পার্ট থাকে–একটা অপারেটিং বাজেট, আরেকটা হলো এডিপি। আমরা কিন্তু অপারেটিং বাজেট বাড়াইতে বলি নাই। আমরা বলছি এডিপি বাড়ানোর জন্য। এডিপি বাড়ানো মানে কিন্তু আপনি নতুন নতুন পারচেস করতে পারতেছেন।”
অর্থাৎ, দলটির অবস্থান হলো–তারা সেনাবাহিনীর বেতন-ভাতা বা পরিচলন ব্যয় নয়, বরং আধুনিক প্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য উন্নয়নব্যয় বাড়ানোর কথা বলছে।
তবু বিতর্কের কেন্দ্রীয় প্রশ্নটি থেকেই যায়। বাংলাদেশের মতো একটি দেশে সীমিত সম্পদের ব্যবহার কোন খাতে কতটা হবে, সেই অগ্রাধিকার নির্ধারণই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এনসিপি যেখানে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা তুলে প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা দেখছে, সেখানে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করিয়ে দিচ্ছেন–খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানও জাতীয় নিরাপত্তারই অংশ।
ফলে ‘একবেলা না খেয়েও’ প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোর আহ্বান শেষ পর্যন্ত কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি বাংলাদেশের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা অগ্রাধিকারের মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে চলমান বৃহত্তর বিতর্কেরও প্রতিফলন।