Advertisement Banner

চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বায়োটেক যুদ্ধে ক্ষতি হচ্ছে কার?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বায়োটেক যুদ্ধে ক্ষতি হচ্ছে কার?
চীন শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয় গোটা বিশ্বের ওষুধের বাজার ধরে ফেলছে। ছবি: রয়টার্স

নতুন কোনো ওষুধের কল্যাণে যার জীবন বাঁচে, সেই ওষুধটি নিজ দেশে তৈরি নাকি পৃথিবীর অন্য প্রান্তে-তা নিয়ে তার মোটেও মাথাব্যথা থাকে না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নীতিপ্রণেতারা এই বিষয়টি নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন। কারণ চীন শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয় গোটা বিশ্বের ওষুধের বাজার ধরে ফেলছে।

এই কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিপ্রণেতারা এখন চীনের বায়োটেকনোলজি বা জৈবপ্রযুক্তি শিল্পকে নতুন ‘প্রযুক্তি যুদ্ধ’ হিসেবে দেখছেন। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে বিদেশে সংবেদনশীল প্রযুক্তি খাতে দেশটির বিনিয়োগ সীমিত করার আইন ‘সিওআইএনএস অ্যাক্ট’ সংশোধন করার প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে। যাতে এর মাধ্যমে চীনের বায়োটেক লাইসেন্সিং আটকে দেওয়া যায়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা এফডিএ যাতে চীনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের কোনো ডেটা গ্রহণ না করে, সেই দাবিও তুলছেন কেউ কেউ।

যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্বেগের মূল কারণ হলো, ওষুধ আবিষ্কারের বৈশ্বিক চিত্রে এক অভাবনীয় পরিবর্তন। গত বছর বিশ্বজুড়ে যত ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হয়েছে, তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই করেছে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো। অথচ ১০ বছর আগেও এই হার ছিল মাত্র ৬ শতাংশ। নতুন ওষুধ উদ্ভাবনে যুক্তরাষ্ট্রের ঠিক পরেই এখন চীনের অবস্থান।

২০২৫ সালে ৫০ মিলিয়ন ডলার বা তার বেশি মূল্যের বড় বড় লাইসেন্সিং চুক্তির প্রায় অর্ধেকই হয়েছে চীনা কোম্পানিগুলোর সাথে, যা ২০২০ সালেও ছিল শূন্যের কোঠায়। ক্যানসার চিকিৎসার অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ‘অ্যান্টিবডি-ড্রাগ কনজুগেটস’-এর মতো কিছু বিশেষ খাতে তো বলতে গেলে প্রায় সব লাইসেন্সিং চুক্তিই এখন চীনাদের দখলে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনের চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই অগ্রগতিকে ইতিবাচকভাবে না নেওয়াটা হবে একটি মস্ত বড় ভুল। এআই কিংবা সেমিকন্ডাক্টরের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের ভয় থাকে যে তাদের প্রযুক্তি চীনে চুরি হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু জৈবপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিষয়টি পুরো উল্টো। এখানে তথ্যের প্রবাহ চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে আসছে।

জীবন রক্ষাকারী ওষুধের মূল উপাদানের ৭০ শতাংশেরও বেশি আসে চীন থেকে। তাই ওষুধ সাপ্লাই চেইনে তাদের এই একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বিগ্ন হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে উৎপাদনের নিরাপত্তা বাড়ানো আর বৈজ্ঞানিক গবেষণা একসঙ্গে করা-দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। নতুন বিজ্ঞান থেকে লাভবান হওয়া ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের হারানোর কিছুই নেই।

এমনিতেই নতুন ওষুধ আবিষ্কারের গতি এখন বেশ ধীর, তার ওপর চীনের এই অগ্রগতিকে হেয় করা হবে চরম বোকামি। বর্তমানে একটি নতুন ওষুধ বাজারে আনতে প্রায় ২৮০ কোটি ডলার খরচ হয় এবং সময় লাগে ১০ বছরেরও বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিপ্রণেতারা প্রায়ই ওষুধের বাড়তি দাম নিয়ে অভিযোগ করেন।

অথচ, চীনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তথ্য বাদ দেওয়ার মতো সিদ্ধান্তগুলো ওষুধ তৈরির সময় আরও বাড়িয়ে দেবে, খরচ বাড়াবে এবং নতুন ওষুধ খোঁজার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করবে। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস কি আসলেই চায় যে কোনো যুগান্তকারী চিকিৎসা সাধারণ আমেরিকানদের কাছে পৌঁছানোর আগেই ইউরোপ বা এশিয়ার রোগীরা তা পেয়ে যাক?

নতুন ওষুধ আবিষ্কারে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো এখনো বিশ্বে সবার সেরা। ছবি: রয়টার্স
নতুন ওষুধ আবিষ্কারে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো এখনো বিশ্বে সবার সেরা। ছবি: রয়টার্স

কিছু রাজনীতিবিদের ভয়, যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ কোম্পানিগুলো যদি চীনের তৈরি মলিকিউল (ওষুধের প্রাথমিক উপাদান) কেনার পেছনে তাদের গবেষণার বাজেট ঢেলে দেয়, তবে আমেরিকার নিজস্ব বায়োটেক খাতে বিনিয়োগ কমে যাবে। কিন্তু বিনিয়োগ তো আর সীমিত কোনো তহবিল নয় যে এক জায়গায় দিলে অন্য জায়গায় টান পড়বে। এআইয়ের জোয়ারই প্রমাণ করে, যেখানে লাভের সুযোগ বাড়ে, সেখানে টাকার অভাব হয় না। আসল বিষয় হলো, ভুল নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বায়োটেক খাত যেন পথ না হারায়।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য স্বস্তির বিষয় হলো, নতুন ওষুধ আবিষ্কারে দেশটির কোম্পানিগুলো এখনো বিশ্বে সবার সেরা। কোনো সম্ভাবনাময় মলিকিউলকে শেষ ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পার করে, সরকারি অনুমোদন এনে বাজারে ছাড়ার ক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতা সবচেয়ে বেশি। এমনকি চীনের বায়োটেক কর্তারাও আড়ালে স্বীকার করেন যে, ওষুধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এফডিএ বিশ্বের এক নম্বর।

অথচ যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কিছু ভুল সিদ্ধান্ত তাদের এই দাপটকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এফডিএ-র শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে চাকরি ছাড়ার ধুম পড়েছে, যার বড় উদাহরণ সংস্থাটির প্রধান মার্টি ম্যাকারির পদত্যাগ। ওষুধ অনুমোদনের প্রক্রিয়াকে এখন রাজনৈতিক রূপ দেওয়া হচ্ছে। কোম্পানিগুলো যদি ওষুধের দাম কমাতে এবং দেশের মাটিতে কারখানা করতে রাজি হয়, তবেই কেবল তাদের দ্রুত কাজ এগিয়ে নেওয়ার বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।

চিকিৎসা গবেষণায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ’-এর বাজেটও কেটে ফেলা হয়েছে। রাজনৈতিক বা আদর্শগত কারণে মাঝপথেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বেশ কিছু গবেষণা প্রকল্প। একইসাথে, কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র এখন বিদেশি বিজ্ঞানীদের কাছে তার আকর্ষণ হারাচ্ছে, যাদের ওপর এই শিল্প পুরোপুরি নির্ভরশীল। আর এদের মধ্যে একটা বড় অংশই কিন্তু চীন থেকে আসা মেধাবী গবেষক।

চীনের উদ্ভাবনের পথ বন্ধ না করে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত নিজেদের ভেতরের এই ত্রুটিগুলো দূর করা। রোগীদের জন্য সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতি তখনই তৈরি হবে, যখন চীন ও যুক্তরাষ্ট্র-উভয় দেশই সহজলভ্য এবং কার্যকর ওষুধ তৈরি করবে। রোগ যেহেতু কোনো সীমানা মানে না, তাই তার নিরাময়ও কোনো কাঁটাতারে আটকে থাকা উচিত নয়।

তথ্যসূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট

সম্পর্কিত