Advertisement Banner

‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হয় না’, আসলে কী?

তুহিন কান্তি দাস
তুহিন কান্তি দাস
‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হয় না’, আসলে কী?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন কোন স্তরে আসলে গবেষণা হয়? ছবি: চরচা

জনপরিসরে একটা আলাপ আছে— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হয় না। এমনকি অনেক বিশেষজ্ঞ ও নীতিপ্রণেতারাও এমন কথা প্রায়ই বলেন।

আসলেই কী গবেষণা হয় না?

তার আগে মনে পড়ছে আইনস্টাইন-বোস গবেষণার কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বোস ও আলবার্ট আইনস্টাইনের যৌথ গবেষণা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক। বিশ্ববিদ্যালয়টির জন্মের মাত্র ৩ বছর পরের ঘটনা। অথচ যাত্রার শত বছর পার হলেও সত্যেন বোসের মতো বিজ্ঞানী বা গবেষক কি তৈরি হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে? কেন বারবার প্রশ্ন উঠছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা নিয়ে?

১৩টি অনুষদ ও ইনস্টিটিউট, ৮৩টি বিভাগ প্রায় ২ হাজার ফ্যাকাল্টি নিয়ে চলছে বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক কার্যক্রম। ৩৭ হাজারের অধিক নিয়মিত শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। যার ভেতর বিভিন্ন সেশনে ১২ হাজারের অধিক পিএইচডি ও প্রায় ২ হাজার এমফিল শিক্ষার্থী রয়েছেন এই শিক্ষায়তনে। দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে গৌরবের স্বাক্ষর রাখলেও গবেষণা কার্যক্রম নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। কিন্তু কেন, তবে কী করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-গবেষকেরা?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রথমেই আমরা ধারস্থ হয়েছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের প্রবীণ অধ্যাপক (এলপিআর) ড. কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদের। অধ্যাপক মতিন ৩৮ বছর ধরে শিক্ষকতা পেশায় নিযুক্ত আছেন বিশ্ববিদ্যালয়টিতে। বাংলাদেশে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর, আর্সেনিক দূষণ এবং পানির লবণাক্ততার প্রভাব নিয়ে তার বিস্তৃত গবেষণা রয়েছে। ওয়েব অব সাইন্স এবং স্কোপাসের মতো গবেষণা ইনডেক্সে ২৫০ এর বেশি গবেষণা জার্নাল প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “আসলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হয় না এই কথাটা একেবারেই ঠিক না। মূল সমস্যা যেটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসাবেই বেশি হাইলাইট করি।”

কাজী মতিন বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্লাস শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটা গ্রুপ আছে যারা খুব ডেডিকেটেডলি রিসার্চার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাস্টার্স, এমফিল ও পিএইচডি থিসিস, শিক্ষকরা অনুদান থেকে এবং বিভিন্ন সংগঠনের সাথে জয়েন্ট কোলাবোরেশনে বিভিন্নভাবে প্রচুর গবেষণা হচ্ছে।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক (এলপিআর) ড. কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদ। ছবি: চরচা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক (এলপিআর) ড. কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদ। ছবি: চরচা

অধ্যাপক মতিন আরও বলেন, “আমাদের দুর্ভাগ্য হলো বিভিন্ন কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ইতিবাচক দিক যেগুলো আছে যেমন— গবেষণা হচ্ছে, ভালো পেপার প্রকাশ হচ্ছে, এইগুলো হাইলাইটেড হয় না। হাইলাইটেড হয় কোথায় শোভাযাত্রা হয়, কোথায় উৎসব হয়, কোথায় আন্দোলন হয় সেগুলো নিয়েই বেশি কথা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এইটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ জ্ঞান সৃজন করা, জ্ঞান বিতরণ করা— এইগুলা হয়ে যায় সেকেন্ডারি আর মুখ্য হয়ে যায় অন্যান্যগুলা। এই জন্য অনেকেই জানে না যে গবেষণা হয়। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর থেকে আমরাও জানি না।”

দেখা যাক আসলে পরিস্থিতি কী?

চলতি বছরের শুরুতে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে সায়েন্টিফিক বাংলাদেশ। এতে ২০২৫ সালে স্কোপাস ইনডেক্সভুক্ত জার্নালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মোট ১ হাজার ৭৪৫টি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। ওই বছর সবচেয়ে বেশি গবেষণা হয়েছে সামাজিক বিজ্ঞান, পরিবেশ ও ওষুধ সম্পর্কিত গবেষণা ক্ষেত্রগুলোতে। সবচেয়ে বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশ হওয়ার তালিকায় শীর্ষ তিন জার্নালের মধ্যে রয়েছে প্লস ওয়ান, সায়েন্টিফিক রিপোর্টস ও হেলিয়ন।

এসব গবেষণায় যুক্ত ছিল বিশ্বের অন্য দেশও। গবেষণা সমন্বয়ক হিসেবে শীর্ষ তিন দেশের তালিকায় শুরুতেই আছে যুক্তরাষ্ট্র (৩১০), সৌদি আরব (১৪৮) এবং যুক্তরাজ্য (১৩১)। আর দেশের ভেতরে এসব গবেষণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী হিসেবে যেসব প্রতিষ্ঠান ছিল, তার মধ্যে শীর্ষে আছে বিসিএসআইআর (১১৫), ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (৮৫) এবং ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি (৭৮)।

এ ক্ষেত্রে অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেনের কথা বলা যায়। বর্তমানে জাপান সরকারের সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এজেন্সি (জেএসটি) এবং জাইকার অর্থায়নে ‘সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি রিসার্চ পার্টনারশিপ ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট’ (এসএটিআরইপিএস) প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছেন মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের এই শিক্ষক। পাশাপাশি জাপানের সাসাকওয়া পিস ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে দুই বছর মেয়াদি একটি প্রকল্পের আওতায় গবেষণা কার্যক্রমের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বিশ্বের শীর্ষ গবেষণা পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে তার গবেষণা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাস্তবে পূর্ণোদ্যমে চলছে ৫/৬টি গবেষণা কেন্দ্রের কার্যক্রম। ছবি: চরচা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাস্তবে পূর্ণোদ্যমে চলছে ৫/৬টি গবেষণা কেন্দ্রের কার্যক্রম। ছবি: চরচা

ড. আনোয়ার হোসেন চরচাকে বলেন, “এই রিসার্চটা হচ্ছে মূলত ঢাকা মেট্রোপলিটনে যে হসপিটালগুলো আছে এতে যে বর্জ্যগুলো উৎপাদন করে এইগুলা আমরা কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া নদীতে ফেলে দিচ্ছি। এর সাথে প্যাথজেনিক ব্যাকটেরিয়া, এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স জিন নদী হয়ে পরিবেশে চলে যাচ্ছে। আমাদের এই প্রজেক্টের মাধ্যমে কিছু হসপিটালে লো-কস্ট টেকনোলজি পাইলটিং করবো। যার মাধ্যমে এই হসপিটাল ওয়েস্ট অর্ডারকে যেন আমরা নদীতে ফেলার আগেই জীবাণুমুক্ত করতে পারি। এর ফলে পানি থেকে হিউম্যান প্যাথজেনিক ব্যাকটেরিয়া এবং এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স জিন মুক্ত করার মাধ্যমে সেইফ একটা পরিবেশ আমরা তৈরি করতে পারবো। তিনি আরও জানান, জাইকার অর্থায়নে এই প্রজেক্টে জাপানের ৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি একটি রিসার্চ ইন্সটিটিউট পলিসি সহায়তা দেবে।”

এই তালিকায় আরও আছেন আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফাতেমা আক্তার এবং সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কে এম আজম চৌধুরীসহ আরও অনেকের নাম। ড. ফাতেমা আক্তার কাজ করছেন হাওর অঞ্চলে বজ্রপাত এবং বন্যার আগাম পূর্বাভাস গবেষণা প্রকল্প নিয়ে এবং ড. আজম চৌধুরী বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত ইউজিসির তত্ত্বাবধায়নে হিট (HEAT) প্রকল্পের আওতায় সমুদ্র অর্থনীতি নিয়ে কাজ করছেন।

তাহলে কেন বারবার বলা হয় যে, গবেষণা হয় না?

এই প্রসঙ্গে অধ্যাপক ড. কাজী মতিন বলেন, “আমার যে অভিজ্ঞতা এইখানে আস্তে আস্তে গবেষণার ক্ষেত্র অনেক বেড়েছে, সুযোগ-সুবিধা অনেক বেড়েছে কিন্তু এখনো অপ্রতুল। অনেক ক্ষেত্রে যেমন প্রায়োগিক গবেষণা-প্যাটেন্ট এইগুলিতে আমরা আমাদের যারা প্রতিদ্বন্দ্বী আছে তাদের তুলনায় এখনো অনেক পিছিয়ে।”

এবার দেখে নেওয়া যাক–বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন কোন স্তরে আসলে গবেষণা হয়?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ ধরনের গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। মাস্টার্স, এমফিল এবং পিএইচডি শিক্ষার্থীদের একাডেমিক থিসিস পেপার, শিক্ষকদের একাডেমিক অগ্রগতির জন্য স্বপ্রণোদিত গবেষণা জার্নাল এবং এনজিও-ইন্ডাস্ট্রি-করপোরেট কোলাবোরেশন প্রজেক্ট জার্নাল। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে পরিচালিত হচ্ছে ৫৬টি গবেষণা কেন্দ্র ও ব্যুরো। এসব গবেষণা কেন্দ্র-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ৫৬টির মধ্যে ৩৫টির কার্যক্রম চলমান। তবে বাস্তবে পূর্ণোদ্যমে চলছে ৫/৬টির কার্যক্রম। সব সেন্টার মিলে বছরে প্রকাশিত হয় ২০ থেকে ৬০টি জার্নাল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সেলগুলোর কো-অর্ডিনেশন ও মনিটরিংয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সেল (ডিউআরসিএমসি)-এর পরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ শাহাদাত হোসেন চরচাকে বলেন,“বর্তমানে এই রিসার্চ সেন্টারগুলোর সবগুলো একইভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। কিছু কিছু আছে যেগুলোতে হয়তো কোনও কার্যক্রম নাই কিন্তু সেন্টারটা নামে আছে। আবার কিছু সেন্টার তাদের প্রয়োজনের কাজের চেয়ে অধিক কাজ করছে। এই সেলগুলোকে সমন্বিতভাবে পরিচালনার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মনিটরিং ও কো-অর্ডিনেশন সেলকে দুই বছর আগে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমরা সেটা নিয়ে কাজ করছি। কিন্তু আমাদের একসেসরিজ, লজিস্টিক, স্পেইস এবং জনবল সেগুলো পুরোপুরিভাবে প্রস্তুত না।”

গবেষণার ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যতিক্রম উচ্চতর বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র। ছবি: চরচা
গবেষণার ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যতিক্রম উচ্চতর বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র। ছবি: চরচা

এসব কেন্দ্রের সক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও জনবল ও তহবিল সংকটের মধ্য দিয়েই কাজ করে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে অবশ্য ব্যতিক্রম উচ্চতর বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র। এখান থেকে প্রতি বছর ৫০-৬০টি প্রকাশনা ‘ওয়েব অব সায়েন্স’ এবং ‘স্কোপাস’-এর মতো কিউ-১ জার্নালে প্রকাশিত হচ্ছে। ৩০ জন স্থায়ী বিজ্ঞানী কর্মরত আছেন এই সেন্টারে।

ফিজিক্যাল সায়েন্স, ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্স, ক্যামিক্যাল-বায়োলজিক্যাল সায়েন্স ফ্যাকাল্টির শিক্ষকদের গবেষণা সুবিধা নিশ্চিত করতে অভিন্ন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ২০০৩ সালে সেন্টারটি প্রতিষ্ঠিত হয়। সেন্টারটির পরিচালক অধ্যাপক ড. আমিনুল ইসলাম তালুকদার চরচাকে বলেন, “

ফিজিক্যাল সায়েন্স, ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্স, ক্যামিক্যাল-বায়োলজিক্যাল সায়েন্স ফ্যাকাল্টির শিক্ষকদের গবেষণা সুবিধা নিশ্চিত করতে অভিন্ন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ২০০৩ সালে সেন্টারটি প্রতিষ্ঠিত হয়। সেন্টারটির পরিচালক অধ্যাপক ড. আমিনুল ইসলাম তালুকদার চরচাকে বলেন, “আমি হিসেব করতেছিলাম প্রতিবছর ৫০-৬০টি মাঝে মাঝে এর চেয়ে বেশি প্রকাশনা আন্তর্জাতিক ইন্ডেক্সড জার্নালে প্রকাশিত হয় এই সেন্টার থেকে। এবং আমি বলবো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাংকিংয়ে একটা ভালো ভূমিকা রাখছে কারস (উচ্চতর বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র) থেকে প্রকাশিত জার্নালগুলো।”

কিউএস র‍্যাংকিং ২০২৬ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৫৮৪। ‘এলসভিয়ার’ কর্তৃক প্রকাশিত ২০২৫ সালের দুই শতাংশ শীর্ষ বিজ্ঞানী তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৫ জন শিক্ষক-গবেষক স্থান পেয়েছেন। গবেষকদের প্রকাশিত গবেষণাপত্র, সাইটেশন, এইচ-ইনডেক্স, কনসিসটেন্সি এবং সহ-লেখকদের প্রভাবের ওপর ভিত্তি করে এই তালিকা তৈরি হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি, কিউ-১ মানের জার্নালে ১৫ শ থেকে দুই হাজার শিক্ষকের গবেষণাপত্র প্রকাশিত হচ্ছে প্রতিবছর। ওয়েব অব সাইন্স, স্কোপাসের মতো আন্তর্জাতিক গবেষণা ইন্ডেক্সেও আছে প্রকাশিত জার্নালের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। যদিও তার অধিকাংশই কর্পোরেট-এনজিও সমন্বয়ে। তবুও জনমনে প্রশ্ন মৌলিক গবেষণা নিয়ে। কিন্তু কেন?

এই প্রশ্নের উত্তরে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা চরচাকে বলেন, “আমাদের সেই সংস্কৃতিটাই নাই। আমাদের শিক্ষকদের অর্জনকে সেলিব্রেট করি না। এইগুলা নিয়ে পত্রিকায় লেখালেখি হয় না। এইটা তো একটা বড় ঘটনা না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৫ জন শিক্ষক পৃথিবীর টপ ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর মধ্যে আছেন। কিন্তু সেটা নিয়ে আপনি মিডিয়ায় কতবার কথা হয়েছে? মিডিয়ায় নেগেটিভ নিউজ অনেক বেশি গুরুত্ব পায়। সেই তুলনায় কাজগুলো যা হচ্ছে তার মধ্যে ১০০ শতাংশ খুব ভালো কাজ হচ্ছে আমি বলবো না। খুব খারাপ কাজও হচ্ছে, খুব ভালো কাজও হচ্ছে। আমাদের রিভিউ প্রসেসটা খুবই ফ্লড এবং পলিটিসাইজড। এক তো হচ্ছে আমাদের ইনফ্রাস্ট্রাকচার নেই, যারা কাজ করছেন তাদের কাজের স্বীকৃতি আলাদা করে নেই। আর যারা খারাপ কাজ করছেন তাদের কোনো শাস্তির ব্যবস্থা নাই।”

একই কথা বললেন অধ্যাপক কাজী মতিনও। গবেষণা সম্পর্কিত খবরের চেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক নানা তর্ক–বিতর্কের কারণে আলোচনায় আসে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ে হওয়া গুরুত্বপূর্ণ বহু গবেষণা লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যাচ্ছে।

কাজী মতিন বলেন, “সামগ্রীকভাবে এইখানে গবেষণার সংস্কৃতি ভালোভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। এমনকি যে তরুণ শিক্ষক আছেন তারা গবেষণা যে এইখানের একটা মূল কার্যক্রম হওয়া উচিৎ তার গুরুত্ব ভালোভাবে অনুধাবন করছে। যেটা সমস্যা সেটা হলো— এইগুলা ভালোভাবে প্রকাশ করা, গবেষণার ফলাফলগুলোকে সবার সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে না। আরেকটা বিষয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব গবেষকদের চেয়ে তাদের দলীয় অনুসারীদের অনেক বেশি উৎসাহিত করেন। অনেক গবেষকরা এতে নিরুৎসাহিত হন।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম নিজেও একজন আন্তর্জাতিক মানের গবেষক। কাজ করছেন নাসার মতো আন্তর্জাতিক মানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোলাবোরেশানে। বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার বরাদ্দ অপ্রতুল স্বীকার করলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ‘পজিটিভ ডিরেকশনে’ আছে বলে দাবি করছেন তিনি।

উপ-উপাচার্য চরচাকে বলেন, “একটা ‘পজিটিভ ডিরেকশনে’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা। গত কয়েক বছর ধরে আমরা দেখছি এইখানে দেড় থেকে দুই হাজার স্কোপাস ইন্ডেক্সড জার্নাল বের হয় প্রতিবছর। পৃথিবীর উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে আপনি যদি তুলনা করেন, এই সংখ্যাটা কম। কিন্তু আবার যদি বাজেট হিসাবে চিন্তা করেন তবে এই সংখ্যাটা আমার মনে হয় অনেক ভালো।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মান উন্নয়নে কোন এক্সক্লুসিভ পরিকল্পনা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা প্রতিদিনই কিছু না কিছু কাজ করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মান উন্নয়নের জন্য।”

সম্পর্কিত