রাত তখন ১টা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় ছাত্রদলের বেশ কিছু নেতা-কর্মীর উপস্থিতি। কেউ এসেছেন সরাসরি, কেউ আবার ফোনে নিজ নিজ গ্রুপের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। অপেক্ষা একটাই—কখন ঘোষণা হবে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি।
টিএসসিতে থাকা নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আজ রাতেই কমিটি ঘোষণা হতে পারে—এমন খবর তারা জেনেছেন। এ কারণে যেসব নেতাকে ঘিরে তারা রাজনীতি করেন, সম্ভাব্য নতুন কমিটিতে তাদের জায়গা হবে—এমন প্রত্যাশা নিয়ে আনন্দ মিছিলের প্রস্তুতি নিয়ে এখানে অপেক্ষা করছেন।
যদিও শুক্রবার রাতেই কমিটি ঘোষণা হবে—এমন কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত সংগঠন বা বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়নি। তবে ছাত্রদল ও বিএনপির একাধিক নেতা বলছেন, নতুন কমিটি ঘোষণার প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে এবং যেকোনো সময় ঘোষণা আসতে পারে।
নেতা-কর্মীদের এই উত্তেজনার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে সামনে এসেছে বৃহস্পতিবার রাতে ছাত্রদলের শীর্ষ পাঁচ নেতার সঙ্গে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাক্ষাতের বিষয়টি।
রাজধানীর গুলশানে বিএনপির চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ওই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের পরই বিদায়ের ইঙ্গিত দিয়ে আবেগঘন একটি ফেসবুক পোস্ট দেন ছাত্রদলের বর্তমান সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব। বিষয়টি নতুন কমিটি ঘোষণার সম্ভাবনা আরও জোরালো করেছে।
গুলশানে শীর্ষ পাঁচ নেতা, এরপরই রাকিবের বার্তা
বৃহস্পতিবার রাতে ছাত্রদলের শীর্ষ পাঁচ নেতা বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এটি ছিল বিদায়ী সাক্ষাৎ। বৈঠকে ছাত্রদলের বর্তমান নেতৃত্বের দায়িত্বকাল, সংগঠনের সাম্প্রতিক কার্যক্রম এবং পরবর্তী নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সাক্ষাতের পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দীর্ঘ একটি পোস্ট দেন ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব।
পোস্টের শুরুতেই তিনি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে লেখেন, ‘‘অনেক বেশি সম্মান ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটতে চলেছে।’’
দীর্ঘ সময় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ার জন্য বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং প্রয়াত খালেদা জিয়ার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। একই সঙ্গে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব, ছাত্রদলের সাবেক নেতৃত্ব এবং সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। পোস্টে নিজের দায়িত্ব পালনের সময়ে ভুলত্রুটি হয়ে থাকলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধও করেন রাকিব।
আর পোস্টের শেষাংশে আসন্ন নতুন কমিটিকে সবাই সাদরে গ্রহণ করবেন বলে প্রত্যাশা জানান ছাত্রদল সভাপতি।
তার এই বক্তব্যকে ছাত্রদলের ভেতরে অনেকেই বর্তমান নেতৃত্বের বিদায়ের স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। রাকিবের পোস্টের পর রাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে একের পর এক পোস্ট দিতে দেখা যায় নেতা-কর্মীদের। অনেকে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার প্রশংসা করে ভবিষ্যতের জন্য শুভকামনা জানান।
‘আজ রাতেই কমিটি’, এমন বার্তা নেতা-কর্মীদের
টিএসসিতে অপেক্ষায় থাকা একাধিক নেতা-কর্মীর সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, আজকে রাতের মধ্যেই নতুন কমিটির ঘোষণা হবে—এমন নিশ্চিত খবর জেনেই তারা এখানে এসেছেন।
ক্যান্টনমেন্ট থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির একজন নেতার কাছে জানতে চাইলে তিনি চরচাকে বলেন, ‘‘আমাদের গ্রুপে গ্রুপে বড় ভাইরা বলে দিয়েছেন যে, আজ রাতেই কমিটি। এখনই টিএসসিতে যেতে, নয়তো কাল ভোরবেলা আনন্দ মিছিলের জন্য রেডি থাকতে। আমি ফোনে অন্যদের সাথে যোগাযোগ করছি, তারপর সিদ্ধান্ত নেব, টিএসসি যাব নাকি গুলশান অফিসে যাব।''
তবে কমিটি ঘোষণার নির্দিষ্ট সময় সম্পর্কে বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে বিএনপির একজন কেন্দ্রীয় নেতা চরচাকে বলেন, ‘‘নতুন কমিটির ফাইল দলীয় প্রধানের টেবিলে আছে। যেকোনো সময় ঘোষণা হবে।’’
অর্থাৎ, রাতেই ঘোষণা হবে—এমন নিশ্চয়তা না থাকলেও, নতুন কমিটি ঘোষণার অপেক্ষা যে এখন শেষ পর্যায়ে, সেটি বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
কারা আসছেন নতুন নেতৃত্বে?
ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির দুই বছরের মেয়াদ শেষ হয়েছে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে। ২০২৪ সালের মার্চে রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি এবং নাছির উদ্দীন নাছিরকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি গঠন করা হয়েছিল।
মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকেই নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা চলছে। সম্ভাব্য সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে একাধিক নেতার নাম সামনে এসেছে। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ব্যাচের নেতাদের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় কমিটির বর্তমান কয়েকজন নেতার নামও আলোচনায় রয়েছে।
২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে খোরশেদ আলম সোহেল, মনজুরুল আলম রিয়াদ, এজাজুল কবির রুয়েল ও সাফি ইসলামের নাম আলোচনায় রয়েছে।
২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষ থেকে মমিনুল ইসলাম জিসান, ফারুক হোসেন, আমানউল্লাহ আমান ও মোস্তাফিজুর রহমানের নাম আলোচনায় আছে।
এ ছাড়া ২০১০-১১ ও ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষ থেকে তরিকুল ইসলাম তারিক, গণেশ চন্দ্র রায় সাহস, মাসুম বিল্লাহ মাসুম, আনিসুর রহমান অনিক, রাজু আহামেদ, নাহিদুজ্জামান শিপন, গাজী মো. সাদ্দাম হোসেন ও মিনহাজ আহমেদ প্রিন্সের নামও বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনায় এসেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় থাকা নেতাদের মধ্যে রয়েছেন কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল, কাজী জিয়াউদ্দিন বাসেতসহ আরও কয়েকজন।
‘সুপার টু’ নাকি ‘সুপার ফাইভ’?
নতুন কমিটির কাঠামো নিয়েও ছাত্রদলের ভেতরে আলোচনা চলছে। দুই সদস্যের নেতৃত্ব, নাকি পাঁচ সদস্যের ‘সুপার ফাইভ’—কোন কাঠামোতে নতুন কমিটি ঘোষণা হবে সেটিই এখন দেখার বিষয়।
ছাত্রদলের সহসভাপতি ইজ্জাজুল কবির রুয়েল চরচাকে বলেন, ‘‘নতুন কমিটি গঠনের দামামা বেজে গেছে। যেকোনো সময় নতুন কমিটি ঘোষণা হতে পারে।''
রুয়েল বলেন, ‘‘নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। হাইকমান্ড যদি মনে করে 'সুপার টু' হবে, তাহলে সেটাই হবে। আবার যদি 'সুপার ফাইভ' উপযুক্ত মনে করে, তাহলে সেটিও হতে পারে। এ নিয়ে আলাদা কোনো বিতর্কের সুযোগ নেই। আমরা হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তের প্রতিই আস্থাশীল।’’
ছাত্রদলের সহসভাপতি ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল চরচাকে বলেন, ‘‘কমিটি গঠন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। আমাদের বর্তমান কমিটির দুই বছরের মেয়াদ শেষ হয়েছে। তাই স্বাভাবিক নিয়মেই নতুন কমিটি গঠন করা হবে।’’ তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা, সংগঠনের ভাবমূর্তি বৃদ্ধি এবং সামনে থাকা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যাদের তিনি যোগ্য মনে করবেন, তাদেরই নেতৃত্বে নিয়ে আসবেন।’’
‘সুপার ফাইভ’ বা ‘সুপার টু’ নিয়ে আউয়াল বলেন, ‘‘এ ধরনের বিষয় সম্পূর্ণভাবে সাংগঠনিক অভিভাবকের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। নেতৃত্বে দুইজন, পাঁচজন বা অন্য যে সংখ্যাই থাকুক না কেন, সেটি নির্ধারণ করবেন তারেক রহমান।’’
পরীক্ষিত নেতৃত্ব নাকি নতুন মুখ?
ছাত্রদল ও বিএনপির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের নেতৃত্ব নির্বাচনে কয়েকটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ, শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা এবং ভবিষ্যতে রাজপথের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সক্ষমতা।
দলটির নেতাদের একটি অংশ মনে করছেন, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে যারা সক্রিয় ছিলেন এবং হামলা-মামলা ও কারাবরণের মধ্যেও মাঠে ছিলেন, তাদের মূল্যায়ন করা হবে।
বর্তমান কমিটির এক নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান চরচাকে বলেন, ‘‘সংগঠনের নেতা-কর্মীরা নতুন কমিটির জন্য, নতুন সরকারের কাছে মুখিয়ে রয়েছেন। নতুন কমিটির নেতৃত্বে দেশ গড়ায় অংশ নেবে ছাত্রদল।’
মমিনুল বলেন, ‘‘সংগঠনের তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত আমার একটি নিবিড় যোগাযোগ ও সম্পর্ক রয়েছে। আমার সেই সহযোদ্ধা-সহকর্মীরা আমাকে সভাপতি হিসেবে দেখতে চান। আমি সংগঠনের তৃণমূল এবং দলের সর্বোচ্চ সাংগঠনিক অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের ওপর অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস রাখি।’’
অন্যদিকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান চরচাকে বলেন, ‘‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে রাজপথে অগ্রভাগে থেকে ভূমিকা রেখেছে। এখন দেশ গঠনের ক্ষেত্রেও সংগঠন ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে চায়।’’
নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাজপথে পরীক্ষিত, ত্যাগী ও সাংগঠনিকভাবে দক্ষ নেতাদের মূল্যায়ন করা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন ছাত্রদলের এই নেতা।
বিদায়ের পথে রাকিব-নাছির কমিটি
নতুন কমিটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে শেষ হতে যাচ্ছে রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও নাছির উদ্দীন নাছিরের নেতৃত্বাধীন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির অধ্যায়।
বিদায়ী কমিটির সবচেয়ে বড় দাবিগুলোর একটি হলো—সংগঠনের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সাংগঠনিক ইউনিটের কমিটি দেওয়া।
ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন এর আগে চরচাকে বলেছিলেন, তাদের দায়িত্বকালে প্রায় ২ হাজার ১০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটি দেওয়া হয়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা ও মহানগরের অধিকাংশ কমিটিও এ সময়ে করা হয়েছে।
নাছির বলেছিলেন, ‘‘হাতেগোনা কয়েকটি বাদে প্রায় সবগুলো কমিটি দিয়েছি আমরা। এটি ছাত্রদলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সাংগঠনিক কর্মতৎপরতা।’’
নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি জানিয়েছিলেন, দ্বিতীয় মেয়াদে ছাত্রদলের নেতৃত্বে থাকার নির্দিষ্ট কোনো ইচ্ছা তার নেই।
এখন অপেক্ষা ঘোষণার
ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে নানা আলোচনা, হিসাব-নিকাশ ও সম্ভাব্য নামের তালিকা ঘুরছে। শেষ মুহূর্তে সেই তালিকায় পরিবর্তন আসতে পারে বলেও মনে করছেন নেতারা।
তবে বৃহস্পতিবার রাতের গুলশান বৈঠক এবং রাকিবুল ইসলাম রাকিবের বিদায়ী বার্তার পর আলোচনা এখন অন্য মাত্রা পেয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে রাতভর অপেক্ষা করা নেতা-কর্মীদের চোখ এখন ফোনের পর্দায়। কখন আসবে সেই বার্তা—‘ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে।’
নেতা-কর্মীদের একাংশের প্রত্যাশা, ঘোষণা রাতেই আসবে। আর তা না হলে শুক্রবার এ কারণে যেসব নেতাকে ঘিরে তারা রাজনীতি করেন, সম্ভাব্য নতুন কমিটিতে তাদের জায়গা হবে—এমন প্রত্যাশা নিয়ে আনন্দ মিছিলের প্রস্তুতি নিয়ে এখানে অপেক্ষা করছেন।