রাজধানীবাসীর একটি স্বস্তির নাম মেট্রোরেল। আবার ক্রমে এটি অস্বস্তিরও কারণ হয়ে উঠছে। বাহনটি মানুষকে দ্রুত যাতায়াত সুবিধা দিলেও এর স্টেশনগুলোর অধিকাংশই এখন ভবঘুরে ও গৃহহীনদের দখলে। ফলে সাধারণ যাত্রীদের অনেককেই বিশেষত রাতের বেলা এসব এলাকায় নিরাপত্তাসহ নানা ধরনের সংকটে পড়তে হয়। অথচ এ সম্পর্কিত দায়িত্ব নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের মধ্যে এক ধরনের ঠেলাঠেলি চলছে।
দৈনিক সাড়ে ৩ থেকে ৪ লাখ মানুষ আধুনিক এই যান ব্যবহার করে নিজ নিজ গন্তব্যে যাতায়াত করে। তবে মেট্রোরেলের চাকচিক্যময় স্টেশনের নিচে চোখে পড়ে নানা অব্যবস্থাপনার চিত্র। বিশেষ করে কারওয়ান বাজার থেকে মতিঝিল স্টেশন পর্যন্ত মেট্রোরেলের লাইনের নিচে রাস্তার ডিভাইডারের অনেক জায়গা এখন উদ্বাস্তু আর গৃহহীনদের দখলে।
মেট্রোরেলের নিচের রোড ডিভাইডারে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানো হয়েছিল। উত্তরা থেকে শুরু করে ফার্মগেট পর্যন্ত ডিভাইডারের ওপর কিছু গাছ এখনো অবশিষ্ট আছে। কিন্তু কারওয়ান বাজার থেকে শুরু হয়েছে অবৈধ দখল। ডিভাইডারে লাগানো গাছ ভেঙে, কেটে বা উপড়ে ফেলা হয়েছে।
এই ডিভাইডারে কেউ পলিথিন টাঙিয়ে ঝুপড়ি বানিয়ে অস্থায়ী আবাস বানিয়েছে। কেউ চটের বস্তা বিছিয়ে ঘুমানোর ব্যবস্থা করেছে। কেউ আবার তোশক, বালিশ আর ওপরে ছাদ হিসেবে বিভিন্ন বস্তু বসিয়ে পুরোদস্তুর অস্থায়ী ঘর বানিয়ে রেখেছে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উল্টোপাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যে ডিভাইডার–সেখানে সন্ধ্যার পর থেকেই বসে মাদকের আসর। এই এলাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা হেনস্তার শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ডিভাইডারের ওপর পলিথিন দিয়ে অস্থায়ী আবাস তৈরি করা হয়েছে। ছবি: চরচা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অনিরুদ্ধ সরকার চরচাকে বলেন, “শাহবাগ থেকে টিএসসি আসার রাস্তায় মেট্রোরেল ডিভাইডারের ওপরে গৃহহীনরা নিয়মিত মাদক সেবন করে। এলাকার সব ভবঘুরের জন্য একটা নিরাপদ আশ্রয় হয়ে গিয়েছে এই জায়গাটি। কর্তৃপক্ষ তড়িৎ ব্যবস্থা না নিলে ক্যাম্পাসে ছিনতাই বাড়বে। এরাই বিভিন্ন সময়ে নারী শিক্ষার্থীদেরকে হেনস্তা করেছে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর মো. ইসরাফিল রতন চরচাকে বলেন, “আমাদের কাছে প্রায়ই রিপোর্ট আসে ডিভাইডারের ওপর ভবঘুরেরা মাদকের আড্ডা বসিয়েছে। খবর পেলে আমরা তাদেরকে সরিয়ে দেই। এটা নিয়ে আমরা মেট্রোরেল পরিচালনাকারী সংস্থার সাথে কথা বলেছি। রাস্তা তো সিটি করপোরেশনের। আর অনেক কিছুই আমাদের আয়ত্তে থাকে না অনেক সময়। যার ফলে সম্পূর্ণভাবে এর সমাধান করতে পারছি না।”
সর্বশেষ জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২২ হাজার ১৮৫ জন মানুষ গৃহহীন। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, শুধু ঢাকাতেই ১০-১৫ হাজার গৃহহীন মানুষ পথে বসবাস করে।
ডিভাইডারের ওপর পলিথিন দিয়ে অস্থায়ী আবাস তৈরি করে থাকেন ছাদেক আলী ও তার পরিবার। তার সাথে কথা বলে জানা যায়, কয়েক বছর আগে বন্যায় ঘর হারিয়ে কাজের সন্ধানে ঢাকা আসেন তিনি। তবে কাজ না পেয়ে পরিবার নিয়ে তার আশ্রয় হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। বর্ষাকালে বৃষ্টিতে যেন কষ্ট না হয়, সেজন্য মেট্রোরেলের ডিভাইডারের নিচে আশ্রয় নিয়েছেন সপরিবারে। ছাদেক আলী দিনের বেলা স্ত্রীসহ ভিক্ষা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। সন্ধ্যার পর আশ্রয় নেন ডিভাইডারে।
ডিভাইডারে কেউ পলিথিন টাঙিয়ে ঝুপড়ি বানিয়ে অস্থায়ী আবাস বানিয়েছে। ছবি: চরচা
ডিভাইডারের ওপর আশ্রয় নেওয়া গৃহহীনদের অপসারণ ও পুনর্বাসনের কোনো পরিকল্পনা আছে কি না, জানতে চাইলে ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (লাইন-৬)-এর উপ প্রকল্প পরিচালক (ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন) মো. আমিনুর রহমানকে চরচাকে বলেন, “ইদানীং বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনার উচ্ছেদ চলছে। এটা ধারাবাহিক কার্যক্রম। তাদের পুনর্বাসনের কোনো প্ল্যান আমাদের আপাতত নাই। এ ধরনের পুনর্বাসন আমরা করি না। কোনো অনৈতিক কাজের খবর পেলে আমাদের সংশ্লিষ্ট আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ব্যবস্থা নেবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সামনে ডিভাইডারের ওপর চারজন নারী স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন বেশ কিছুদিন। কথা বলে জানা যায়, তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ফুল বিক্রি করেন। রাতে সবাই ডিভাইডারেই থাকেন। এখনো তাদেরকে কেউ এখান থেকে চলে যেতে বলেনি। যতদিন না কেউ উঠিয়ে দিচ্ছে, ততদিনই এখানে থাকবেন বলে জানান তারা।
ঢাকা শহরের উদ্বাস্তু ও গৃহহীনদের দায়িত্ব কোনো কর্তৃপক্ষই নিতে চায় না। ডিভাইডারের ওপরে বসবাসরতদের পুনর্বাসনের বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সমাজকল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসান চরচাকে বলেন, “এটা হচ্ছে সমাজসেবা অধিদপ্তরের কাজ। তাদের পুনর্বাসন কেন্দ্র আছে। আমরা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে এর আগেও বহুবার ভবঘুরেদের সরিয়ে দিয়েছি। আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে সমাজসেবা অধিদপ্তরে চিঠি দিয়েছি এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য। কাজটা যেহেতু সমাজসেবা অধিদপ্তরের, তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ আমরা করেছি এবং আমাদের যখন মোবাইল কোর্ট পরিচালনা হয়েছে, তখনো কয়েকজন ভবঘুরে আইডেন্টিফাই করে উঠিয়ে দিয়েছি। এর বাইরে আসলে আমাদের আর কিছুই করার সুযোগ নেই। কারণ আমাদের পুনর্বাসন কেন্দ্র নাই।”
সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব এ বিষয়ে চরচাকে বলেন, “আমাদের ছয়টি পুনর্বাসন কেন্দ্র আছে। আমরা চেষ্টা করছি ভবঘুরে ও গৃহহীনদের সেখানে স্থানান্তর করার। সেখানে অনেক সুযোগ আছে। আমরা খোঁজ নিয়ে দেখছি, এ বিষয়ে কী করা যায়।”
ঢাকা শহরের উদ্বাস্তু ও গৃহহীনদের দায়িত্ব কোনো কর্তৃপক্ষই নিতে চায় না। ছবি: চরচা
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তরফ থেকে পাঠানো চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কোনো জবাব দেননি। বরং সার্বিক বিষয়ে জানতে অধিদপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। যদিও অধিদপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. নুরুল আমিন খানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি মহাপরিচালকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
এদিকে গত ২৯ এপ্রিল সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, মেট্রোরেলের নিচের ডিভাইডারে বৃক্ষরোপণের কাজ শুরু করবে সরকার। যদিও সেরকম কোনো উদ্যোগ এখনো দেখা যায়নি। এ ব্যাপারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পরিবেশ, জলবায়ু ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী এফ এম মামুন চরচাকে বলেন, “আমাদের রাজস্ব বিভাগ থেকে ইতিমধ্যেই মেট্রোরেল ডিভাইডারের নিচে গাছ লাগানোর জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়া হয়েছে। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য নিজ খরচে ও উদ্যোগে এই দায়িত্ব নিয়েছে। মতিঝিল থেকে শিক্ষা ভবনের মোড় পর্যন্ত ১০ হাজার গাছ লাগাবে এবং এর রক্ষণাবেক্ষণ করবে তারা।”
এর আগেও এমন বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বিভিন্ন সময়ে। তবে সংশ্লিষ্ট এলাকার গৃহহীন ও ভবঘুরেদের যথাযথ পুনর্বাসন না হলে নতুন লাগানো গাছ আবার তুলে ডিভাইডারের ওপর থাকা শুরু করার আশঙ্কাও রয়েছে।