দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নিয়ে ক্ষমতাসীন দল, তার শরিকদের অবস্থান এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নিয়ে যখন নানা হিসাব-নিকাশ চলছে, তখন আরও একটি প্রশ্ন আলোচনায় এসেছে। সেটি হলো- প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ছয় মাসপূর্তির আগেই কি মন্ত্রিসভায় রদবদল আসছে?
সরকার গঠনের পর থেকেই মন্ত্রীদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের বিষয়টি আলোচনায় ছিল। চলতি মাসেই সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার প্রাক্কালে সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতে দায়িত্ব পুনর্বণ্টন, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তন এবং নতুন মুখ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে সরকারি ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা জোরালো হয়েছে। যদিও সরকারের দায়িত্বশীল কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে মুখ খুলছেন না।
ছয় মাসের মূল্যায়ন
জাতীয় নির্বাচনের পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার। ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী নিয়ে এ যাত্রা শুরু হয়। পাশাপাশি মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর ১০ জন উপদেষ্টাও দায়িত্ব পালন করছেন।
সরকারের একাধিক সূত্রের ভাষ্য, সরকার গঠনের শুরুতেই মন্ত্রীদের কাজের একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে মূল্যায়নের কথা জানানো হয়েছিল। সেই সময়সীমা ছয় মাস। এই সময়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক দক্ষতা, সমন্বয় এবং জনমুখী কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতেই এখন কিছু পরিবর্তনের আলোচনা চলছে।
মন্ত্রিসভার একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, “ছয় মাস পূর্তির পর প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের মূল্যায়ন উপস্থাপন করা হবে। এরপরই দায়িত্বে পরিবর্তন কিংবা নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে।”
শপথ নিচ্ছেন বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। ছবি: স্ক্রিনশট
আলোচনায় কোন কোন মন্ত্রণালয়
সরকার-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, যেসব মন্ত্রী একাধিক দপ্তরের দায়িত্ব পালন করছেন, ওই দপ্তরগুলো নিয়ে আলোচনা বেশি চলছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অর্থের পাশাপাশি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। দলীয় সূত্রগুলোর দাবি-পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের জন্য আলাদা নেতৃত্বের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
একইভাবে শেখ রবিউল আলম সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন- এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। অবকাঠামো খাতের বিশাল কর্মযজ্ঞ এবং একাধিক বড় প্রকল্পের কারণে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়ার আলোচনা রয়েছে বলে সূত্রের দাবি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক দায়িত্ব বেড়েছে। ফলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কাঠামোয় পরিবর্তন নিয়েও আলোচনা চলছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা চরচাকে বলেন, “নিশ্চিত করে জানি না। তবে এই নিয়ে আলাপ আলোচনা শুনেছি।”
জনপ্রশাসন নিয়ে অসন্তোষ
সরকার ও দলের ভেতরে পরিবর্তনের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত নামগুলোর একটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
সরকারি সূত্রগুলোর দাবি, জেলা প্রশাসক নিয়োগ, বদলি এবং পদায়ন নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক সিদ্ধান্ত বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রশাসনের ভেতরে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ধীরগতির অভিযোগও রয়েছে।
এছাড়া, কোরবানির সময় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত ঘটনায় বরখাস্ত হওয়া এক কর্মকর্তার পরবর্তী পদোন্নতি নিয়েও প্রশাসনের ভেতরে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা যায়, উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ, মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারীর কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট নন বিএনপিপন্থী আমলারা। তাদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ আমলাদের প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সরকারের একজন প্রেস কর্মকর্তা চরচাকে বলেন, “প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভা গঠনের আগেই বলে দিয়েছিলেন যে, সবার বিষয়ে নজর রাখা হবে। পরিবর্তন আসবে, সেটা দেশ ও জনগণের স্বার্থে।”
মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর সমন্বয়ও বিবেচনায়
সরকারি সূত্রগুলোর দাবি, যেসব মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন ও সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোও প্রধানমন্ত্রীর মূল্যায়নের আওতায় রয়েছে।
কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি, প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব এবং রাজনৈতিক বার্তা সঠিকভাবে তুলে ধরতে না পারার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
নতুন মুখের সম্ভাবনা কতটা?
দলীয় একাধিক সূত্রের ভাষ্য, মন্ত্রিসভার আকার কিছুটা বাড়ানোর বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে। আলোচনায় থাকা সম্ভাব্য নামগুলোর মধ্যে রয়েছেন- আন্দালিভ রহমান পার্থ, মাহিদুর রহমান, এরশাদ উল্লাহ, এবিএম মোশাররফ হোসেন ও সেলিমা রহমান।
এছাড়া, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, বরকত উল্লা বুলু এবং জয়নুল আবদিন ফারুকের নামও দলীয় গণ্ডির মধ্যে আলোচনায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি।
টেকনোক্র্যাট কোটায় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এবং যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেলের নাম নিয়েও আলোচনা রয়েছে বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র।
তবে এসব নামের বিষয়ে সরকার কিংবা দলের কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
ইতিমধ্যেই হয়েছে কিছু পরিবর্তন
সরকার গঠনের পর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এরই মধ্যে হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম) স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর তার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় আহমেদ আযম খানকে।
ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর ভূমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান মীর হেলাল উদ্দিন। পরে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান পদত্যাগ করলে ওই মন্ত্রণালয়েও নতুন পূর্ণমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
কূটনৈতিক অঙ্গনেও পুনর্বিন্যাস
শুধু মন্ত্রিসভা নয়, কূটনৈতিক অঙ্গনেও বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস শুরু হয়েছে।
সরকার ইতিমধ্যে দিল্লি, লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, জেনেভাসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মিশনে নতুন নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। মানবাধিকারকর্মী আইরিন খানকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাকে প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদাও দেওয়া হয়েছে। কূটনৈতিক মহলের মতে, সরকারের বৃহত্তর পুনর্বিন্যাস পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই নিয়োগকে দেখা হচ্ছে।