ইরান শনিবার বলেছে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওমানের সঙ্গে একটি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তবে শুধু এই চুক্তি হলেই গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ খুলে দেওয়া সম্ভব হবে না। এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে ইরান আরও একটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা শুক্রবার বলেছেন, ইরান ও ওমানের মধ্যে শিগগিরই একটি চুক্তি হবে বলে ওয়াশিংটন আশা করছে। এর ফলে স্বাভাবিক তেল পরিবহন আবার শুরু হতে পারে।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে চুক্তিকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সংঘাতের অবসানে বৃহত্তর একটি চুক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে নতুন একটি নৌপথ চালু করা নিয়ে ইরান ও ওমান “খুবই কাছাকাছি” অবস্থানে রয়েছে। তবে প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ইরানের ক্ষতিপূরণসহ আরও কিছু শর্তের ওপর নির্ভর করছে।
তিনি বলেন, প্রণালিতে আগে যে নির্ধারিত জাহাজ চলাচল ব্যবস্থা ছিল, তা তেহরানের কাছে আর গ্রহণযোগ্য নয়। স্থায়ী নৌপথ নিয়ে কারিগরি ও আইনি বিষয়গুলোর সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ইরান ওমানের সঙ্গে একটি অস্থায়ী নৌপথ নিয়ে আলোচনা করছে বলেও জানান তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরান উপসাগরীয় দেশগুলো ও জর্ডানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি এবং সরু হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো।
আজ শনিবার সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় দেশটির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি জাহাজে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এতে কেউ হতাহত হয়নি বলে জানানো হয়েছে। প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর হামলা বৃদ্ধির সর্বশেষ ঘটনা এটি।
এ বিষয়ে ইরানি কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ইরানের গণমাধ্যম ইউএইর প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তবে হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করার অংশটি বাদ দিয়েছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসন বারবার ইঙ্গিত দিয়েছে, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার চুক্তি খুব কাছাকাছি। তবে প্রতিবারই ইরান আলোচনার বিষয়টি অস্বীকার করেছে। সর্বশেষ দফার আলোচনাগুলো দীর্ঘস্থায়ী কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা শুক্রবার রয়টার্সকে বলেন, “হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমান ও ইরানের মধ্যে অগ্রগতি হয়েছে এবং আমরা শিগগিরই একটি চুক্তি আশা করছি।”
তিনি বলেন, “বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্নে পুনরায় চালুর চুক্তি ঘোষণা হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ তুলে নেবে।”
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, “সবসময়ের মতোই যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নের ওপর নির্ভরশীল থাকবে এবং ইরান তার প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করছে কি না, তার সঙ্গে যুক্ত থাকবে।”
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডও শনিবার বলেছে, ওয়াশিংটন ইরানের শর্ত মেনে নিলে তবেই হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে। তাদের দাবি, বিষয়টি ইরান-ওমান আলোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।
গার্ডের মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি শর্তগুলো নির্দিষ্ট করে বলেননি। তবে তিনি বলেছেন, আঞ্চলিক আলোচনায় ওয়াশিংটনকে হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।
ইরানের তাসনিম সংবাদ সংস্থার বরাত দিয়ে তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র যখনই ইরানের শর্ত মেনে নেবে, তখনই হরমুজ প্রণালি অবশ্যই পুনরায় খুলে দেওয়া হবে।”
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাঁচ মাসের যুদ্ধ অবসানে সহায়তার লক্ষ্যে ইরান ও ওমানের মধ্যে প্রস্তাবিত একটি চুক্তির আওতায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজের ওপর তেহরানকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হতে পারে বলে বুধবার রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা এবং দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তা। এটি ইরানের জন্য এখন পর্যন্ত অন্যতম বড় ছাড় হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বারবার বলেছেন, জ্বালানি সরবরাহের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ইরানকে দেওয়ার বিষয়ে তারা কখনোই সম্মত হবেন না। তবে প্রস্তাবিত চুক্তির শর্তগুলো পরিবর্তনের জন্য তারা কোনো উদ্যোগ নিয়েছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।
ইরান সংঘাতকে ব্যবহার করে তেলবাহী ট্যাংকার থেকে কর আদায়ের যৌক্তিকতা দেখিয়েছে। এর পাশাপাশি অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করা জাহাজে গুলি চালানোর ঘটনায় বিশ্বজুড়ে পণ্য পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এতে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং মূল্যস্ফীতির চাপও বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি শুক্রবার জানিয়েছে, সংঘাত শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের সময় তাদের ১৫টি জাহাজে হামলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এসব ঘটনাকে বিনা উসকানির হামলা হিসেবে উল্লেখ করেছে। এতে একজন ক্রু সদস্য নিহত এবং আরও ২০ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি।
ইরানের গণমাধ্যম প্রায়ই এমন জাহাজে হামলার খবর প্রকাশ করে, যেগুলো ইরানের নির্দেশনা লঙ্ঘন করেছে বলে দাবি করা হয়। তবে এসব হামলার পেছনে ইরান জড়িত, তা সাধারণত উল্লেখ করা হয় না।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর ইরানের হামলার পাশাপাশি আরব উপদ্বীপের অপর প্রান্তে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যবর্তী আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথে ইরানের ইয়েমেনভিত্তিক মিত্র হুতিদের হামলাও বেড়েছে।