কয়েক বছর কঠিন সময় পার করার পর ব্রিটেনের সংগীত উৎসবগুলোতে ঘুরে দাঁড়ানোর আভাস দেখা যাচ্ছে। এ বছর বুমটাউনের মতো বড় উৎসবগুলো রেকর্ড সময়ে টিকিট বিক্রি করে শেষ করেছে। কিস্তিতে টিকিট কেনার সুযোগ থাকায় ভক্তদের জন্য টিকিট কেনা সহজ হয়েছে। একই সঙ্গে আয়োজকেরাও আরও উন্নতমানের অভিজ্ঞতার চাহিদার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
ব্রিটেনের লাইভ মিউজিক খাতের জন্য এটি সুখবর। কোভিড-১৯ মহামারি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় খাতটি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। শিল্প খাতের সংগঠন ইউকে মিউজিকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এই খাত ব্রিটিশ অর্থনীতিতে ৮০০ কোটি পাউন্ড (১ হাজার ১০০ কোটি ডলার) যোগান দিয়েছে।
প্রায় ৮০ হাজার দর্শকের অংশগ্রহণের উৎসব ‘ডাউনলোড’, যার প্রধান আকর্ষণ আমেরিকান রক ব্যান্ড ‘লিংকিন পার্ক এবং জ্যাজ সংগীতভিত্তিক উৎসব উই আউট হিয়ার রেকর্ড সময়ে টিকিট বিক্রি করে শেষ করেছে। আইল অব উইট ও অ্যান্ড অব দ্য রোডও সব টিকিট বিক্রি করে ফেলেছে। শামবালা ও ওম্যাডও স্বাভাবিকের তুলনায় দ্রুত টিকিট বিক্রির কথা জানিয়েছে।
কিছু উৎসবের আয়োজক বলছেন, এ বছর পরিকল্পিত বিরতিতে থাকা গ্লাস্টনবেরির অনুপস্থিতি তাদের টিকিট বিক্রিতে সহায়তা করেছে। তবে অন্যরা বলছেন, গ্লাস্টনবেরি অনুষ্ঠিত হলে সেটি বরং পুরো খাতের টিকিট বিক্রিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিপেনডেন্ট ফেস্টিভ্যালসের (এআইএফ) প্রধান নির্বাহী জন রস্ট্রন বলেন, “মহামারি এবং ব্রেক্সিটের সময় আমরা কঠিন সময় পার করেছি, তবে এখন আমরা সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসছি।” সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুলনামূলক ভালো আবহাওয়াও সহায়তা করেছে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, “মানুষ এখন কাদা ও বৃষ্টির কথা বলার চেয়ে সানস্ক্রিন, পানি ও ছায়ার কথা বেশি বলছে।”
তবে ছোট উৎসবগুলোর জন্য পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত কঠিন।
এআইএফ জানিয়েছে, ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ৩৬টি উৎসব বাতিল হয়েছে। তবে এটি কোভিড-১৯ মহামারির পর সর্বনিম্ন সংখ্যা হতে পারে। ২০২৫ সালে ৪৩টি এবং ২০২৪ সালে ৭৮টি উৎসব বাতিল হয়েছিল।
এআইএফের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে ব্রিটেনে উৎসবের সংখ্যা সর্বোচ্চ ৮০০ থেকে ৯০০টির মধ্যে ছিল। কিন্তু ব্যয় বৃদ্ধি ও প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ায় ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা কমে ৫৯২টিতে দাঁড়ায়।
‘মানুষ সেরাটাই চায়’
আয়োজকেরা বলছেন, গ্ল্যাম্পিং (বিলাসবহুল ক্যাম্পিং), সুস্থতা বা ওয়েলনেস কর্মসূচি এবং অন্য অতিরিক্ত সুবিধা মানুষকে বিদেশে ছুটি কাটানোর পরিবর্তে সংগীত উৎসবে যেতে উৎসাহিত করছে। তবে টিকিটের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দর্শকদের প্রত্যাশাও বাড়ছে।
ওয়েলনেস অভিজ্ঞতার মতো অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া বুমটাউনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক টবি গওয়াজডাচ বলেন, “গ্রাহকেরা তাদের ব্যয় এবং হাতে থাকা অতিরিক্ত অর্থ আরও বেছে-বেছে খরচ করছেন।”
তিনি বলেন, “তারা যদি এই গ্রীষ্মে কোনো উৎসবে যেতে চান, তাহলে সেটি যেন একেবারে সেরা হয়—তাই চান।”
বড় আকারের কয়েক দিনের ক্যাম্পিং উৎসবগুলোর জন্য দর্শকদের প্রায় ২০০ থেকে ৩৮০ পাউন্ড দিতে হয়। যাতায়াত ও অন্য খরচসহ পুরো অভিজ্ঞতার ব্যয় ৮০০ পাউন্ডেরও বেশি হতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, ২০২৬ সালে রিডিং বা লিডস উৎসবের একটি টিকিটের দাম সর্বোচ্চ ৩৬১ পাউন্ড পর্যন্ত হতে পারে। ২০১৯ সালে এই দাম ছিল প্রায় ২৩০ পাউন্ড। বিলাসবহুল বেল টেন্ট ও বিছানাসহ সবচেয়ে ব্যয়বহুল ভিআইপি প্যাকেজে জনপ্রতি আরও ৫০০ পাউন্ডের বেশি খরচ হতে পারে।
শামবালার সহ-প্রতিষ্ঠাতা ক্রিস জনসন বলেন, সংগীতের বাইরের অনুষ্ঠান ও অভিজ্ঞতা—যেমন কবিতা পাঠ ও বক্তৃতা—আয়োজনের জন্য তারা বেশি অর্থ ব্যয় করছেন। প্রথমবারের মতো বিলাসবহুল ক্যাম্পিংয়ের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “আরও ভালো টয়লেট, প্যাম্পার পার্লার, ২৪ ঘণ্টার অভ্যর্থনা, বিনামূল্যে চার্জ দেওয়ার সুবিধা এবং ওয়াই-ফাই ব্যবহারের সুযোগ” রাখা হয়েছে।
টিকিট বিক্রয় প্রতিষ্ঠান কাবুডল জানিয়েছে, কিস্তিতে টিকিট কেনার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাদের প্ল্যাটফর্মে ব্রিটেনের ক্যাম্পিং উৎসবগুলোর প্রায় ৪৫ শতাংশ টিকিট সাধারণত কিস্তি ব্যবস্থায় কেনা হয়। ধাপে ধাপে মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থাও এখন প্রায় সব ব্রিটিশ সংগীত উৎসবে চালু রয়েছে।
লন্ডনভিত্তিক আরেকটি সংগীত উৎসব মাইটি হুপলার সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক জেমি ট্যাগ অনুমান করেন, প্রায় ৭০ শতাংশ দর্শক কিস্তি ব্যবস্থায় টিকিট কেনেন। জনপ্রতি কম দামের গ্রুপ টিকিটও জনপ্রিয় হয়েছে।
ট্যাগ বলেন, “এটি আমাদের দর্শকদের জন্য অবশ্যই সহায়ক হয়েছে।”
টিকিট পুনরায় বিক্রির প্ল্যাটফর্ম টিক্সেলের ইউরোপীয় প্রধান ম্যাট কাপলান বলেন, ২০২৬ সাল এখন পর্যন্ত টিকিট পুনর্বিক্রির ক্ষেত্রে তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী বছর হতে যাচ্ছে। সাধারণত প্রায় ২ লাখ মানুষকে আকর্ষণ করা গ্লাস্টনবেরির এবারের বিরতিও পুনর্বিক্রয় প্ল্যাটফর্মে চাহিদা বাড়িয়ে থাকতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
কঠিন পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট
ওম্যাডের উৎসব পরিচালক ক্রিস স্মিথ বলেন, ব্রেক্সিট এখনো একটি সমস্যা হয়ে আছে। টিকিট বিক্রি কম হওয়ায় এ বছর ওম্যাডের গ্লাসগো সংস্করণ বাতিল করা হয়।
তিনি জানান, ইংল্যান্ডে জুলাইয়ের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত মূল ওম্যাড উৎসবে অংশ নিতে ১৫ জন শিল্পী উৎসবের মাত্র চার সপ্তাহ আগে পর্যন্ত ভিসার অপেক্ষায় ছিলেন।
তিনি বলেন, স্বাধীন উৎসবগুলোর গুরুত্ব তুলে ধরে চালানো “ভালোবাসুন, নইলে হারাবেন” প্রচারণার কারণে মূল উৎসবটির টিকিট বিক্রি বেড়েছিল।
হেরিটেজ লাইভ জুলাইয়ে তিনটি উৎসব বাতিল করেছে। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, “বিশাল বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর শক্তি” সরবরাহকারী, শিল্পী ও কর্মীদের খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে।
একটি বড় উৎসব আয়োজক প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্র বলেন, যুক্তরাজ্যের বাজার মূল্যস্ফীতি ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। কোনো একটি কোম্পানি এর জন্য দায়ী নয়।
মাইটি হুপলা ও বুমটাউনসহ কয়েকটি উৎসব বড় কোম্পানির কাছে মালিকানার অংশ বিক্রি করেছে। এখন আইল অব উইট, রিডিং ও লিডস এবং ডাউনলোডসহ প্রায় সব বড় উৎসবের মালিকানায় বড় কোম্পানিগুলো রয়েছে।
অনেক স্বাধীন উৎসবের আয়োজক বলছেন, বিপুল অর্থসম্পদ থাকা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোর কারণে তাদের ওপর চাপ বেড়েছে। তবে বুমটাউনের গওয়াজডাচ বলেন, উৎসব বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য বড় কোম্পানির কাছে মালিকানার অংশ বিক্রি করা প্রায়ই প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে।