বিশ্বের যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ বাজারের কথা উঠলেই দুটি নাম সবার আগে আসে—এয়ারবাস ও বোয়িং। কয়েক দশক ধরে এই দুই জায়ান্টই পুরো আকাশপথ নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে দীর্ঘদিনের এই একচেটিয়া রাজত্ব কি এবার বদলাতে চলেছে? ব্রাজিলের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘এমব্রায়ার’-কে ঘিরে এখন বৈশ্বিক এভিয়েশন খাতে এমন আলোচনার সূচনা হয়েছে।
ব্রটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, উড়োজাহাজের নামকরণেও একেকটি প্রতিষ্ঠানের কৌশল আলাদা। এয়ারবাসের ‘এ-৩৮০’ বা ‘এ৩২০নিও’ নামগুলো প্রযুক্তি ও মডেলকে নির্দেশ করে এবং বোয়িংয়ের ‘৭৮৭ ড্রিমলাইনার’ নামটি দেয় আরামদায়ক ভ্রমণের বার্তা। অন্যদিকে, এমব্রায়ার ২০১৭ সালে তাদের জ্বালানি-সাশ্রয়ী ই২ আঞ্চলিক উড়োজাহাজের নাম দেয় ‘প্রফিট হান্টার’, যা বিমান সংস্থাগুলোর মুনাফা বাড়ানোর সরাসরি প্রতিশ্রুতি বহন করে।
আকাশে উড়ে যাচ্ছে এয়ারবাস এ৩২০নিও উড়োজাহাজ। ছবি: রয়টার্স
আকারের দিক থেকে এমব্রায়ার এখনো এয়ারবাস বা বোয়িংয়ের মতো বিশাল নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে তাদের অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো। ২০২১ সালে ১৪১টি উড়োজাহাজ সরবরাহ করা এমব্রায়ারের চলতি বছরে মোট সরবরাহ ২৫৫টিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। গত ২৪ জুলাই প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তাদের হাতে থাকা অর্ডার ব্যাকলগের মোট মূল্য বেড়ে ৩৪.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ। একই সাথে ২০২১ সালের শুরু থেকে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম প্রায় ১০ গুণ বেড়েছে, যা এয়ারবাস বা বোয়িংয়ের প্রবৃদ্ধির চেয়ে অনেক বেশি।
এমব্রায়ারের এই দ্রুতগতির পেছনে মূলত সরবরাহ ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা ও পরিবর্তনশীল যাত্রীচাহিদা নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। মহামারির পর সরবরাহ ব্যবস্থার জটিলতায় এয়ারবাস বা বোয়িংয়ের বড় ‘ন্যাো-বডি’ উড়োজাহাজ পেতে বিমান সংস্থাগুলোকে ৮ থেকে ১০ বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে, কারণ তাদের হাতে জমে আছে প্রায় ১৬ হাজার অর্ডার। বিপরীতে এমব্রায়ারের ‘ই২’ উড়োজাহাজ মাত্র দুই বছরের কম সময়ে সরবরাহ করা সম্ভব।
পাশাপাশি, লিজিং প্রতিষ্ঠান আজোরার কর্মকর্তা রন বাউর জানান, বহু যাত্রী এখন বড় বিমানবন্দরে গিয়ে ট্রানজিট নেওয়ার বদলে ছোট শহরের বিমানবন্দরগুলোর মধ্যে সরাসরি উড়তে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। এতে ছোট উড়োজাহাজের চাহিদা বাড়ছে এবং আজোরা একাই ৫০টির বেশি ই২ জেটের অর্ডার দিয়েছে।
সাউথ ক্যারোলাইনা কারখানার ফাইনাল অ্যাসেম্বলি ভবনের পাশ দিয়ে ট্যাক্সি করছে একটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার। ছবি: রয়টার্স
এ ছাড়া এমব্রায়ারের ‘ই১৭৫’ মডেলটি এমনভাবে তৈরি, যা যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক এয়ারলাইনগুলোর পাইলট ইউনিয়নের নির্ধারিত উড়োজাহাজের আকারের সীমারেখার সাথে পুরোপুরি মিলে যায়। এমব্রায়ারের হিসাব অনুযায়ী, আগামী ২০ বছরে ছোট আকারের এই শ্রেণির প্রায় ৮,৫০০টি উড়োজাহাজের চাহিদা তৈরি হবে। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফ্রান্সিসকো গোমেস নেতোর মতে, এই পূর্বাভাসের চার ভাগের এক ভাগ অর্ডারও যদি তারা পান, তবুও আগামী দুই দশক তাদের কারখানা পুরোপুরি ব্যস্ত থাকবে।
কেবল বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ নয়, অন্যান্য খাতেও এমব্রায়ার বেশ শক্তিশালী। কোভিড-পরবর্তী সময়ে ব্যক্তিগত জেটের চাহিদা বাড়ায় তাদের ‘ফেনম ৩০০’ টানা ১৪ বছর ধরে নিজ ক্যাটাগরিতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া প্রাইভেট জেটের খেতাব ধরে রেখেছে। বিশ্বজুড়ে প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ায় তাদের ‘কেসি-৩৯০’ সামরিক পরিবহন বিমানের চাহিদাও চাঙ্গা। এ ছাড়া উড়ন্ত ট্যাক্সি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ইভ’-এ এমব্রায়ারের বড় অঙ্কের অংশীদারিত্ব রয়েছে।
এয়ারবাস ও বোয়িংকে সরাসরি টেক্কা দিতে হলে এমব্রায়ারকে সম্পূর্ণ নতুন ও বড় উড়োজাহাজ উৎপাদনে নামতে হবে, তবে এই পথটি অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠান ‘বম্বার্ডিয়ার’ একসময় ঠিক একই চেষ্টা করে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছিল।
শেষ পর্যন্ত ২০১৮ সালে তারা নামমাত্র মূল্যে সেটি এয়ারবাসের কাছে বিক্রি করে দেয়, যা আজ ‘এ২২০’ নামে পরিচিত। তাই এয়ারবাসের সিইও গিয়োম ফোরি এমব্রায়ারকে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তা ছাড়া একটি বড় যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ প্রজেক্ট প্রস্তুত করতে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন, যার জন্য ব্যাংক অব আমেরিকার বিশ্লেষক রন এপস্টেইনের মতে, এমব্রায়ারকে বিশ্বস্ত বিনিয়োগকারী ও যন্ত্রাংশ সরবরাহকারীদের সাথে শক্তিশালী কনসোর্টিয়াম গড়ে তুলতে হবে।
বোয়িংয়ের হিসাব বলছে, আগামী ২০ বছরে বিশ্বে ৩৬ হাজার নতুন উড়োজাহাজের প্রয়োজন হবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিশালাকার বাজারের সামান্য অংশও দখল করতে পারলে এমব্রায়ারের চিত্র পুরোপুরি বদলে যাবে। তবে এখনই সরাসরি যুদ্ধে নামার তাড়াহুড়ো নেই উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী গোমেস নেতোর। নিজের কৌশল পরিষ্কার করে তিনি বলেন, “আমাদের বর্তমান অবস্থান নিয়ে আমরা অত্যন্ত স্বস্তিতে আছি।”