ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এখন এমন এক জটিল পর্যায়ে পৌঁছেছে। সেখান থেকে বেরিয়ে আসার একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক পথ খুঁজছেন মার্কিন সামরিক নেতৃত্ব। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ও জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন সাম্প্রতিক সময়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শীর্ষ উপদেষ্টাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে যুদ্ধের একটি ‘অফ-র্যাম্প’ খোঁজার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ আরও বাড়ানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের হাতে যে সামরিক বিকল্পগুলো রয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোই উল্টো বিপদ ডেকে আনতে পারে। বিশেষ করে শুধু বিমান হামলা চালিয়ে ট্রাম্পের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে। জেনারেল কেইন এই বিষয়টি সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সসহ প্রশাসনের অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
এত কিছুর পেছনে একটি বড় কারণ হলো মার্কিন প্রেসিডেন্টের যুদ্ধনীতি। ট্রাম্প বারবার বলেছেন, তিনি ইরানে স্থলসেনা পাঠাতে চান না। তার ধারণা, ব্যাপক বিমান হামলার মাধ্যমে ইরানকে চাপ দিয়ে নিজের শর্তে একটি চুক্তিতে আনা সম্ভব। কিন্তু জেনারেল কেইনসহ প্রশাসনের অনেক শীর্ষ কর্মকর্তা মনে করছেন, শুধু বোমা হামলা চালিয়ে সেই লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনা খুবই কম। বরং দীর্ঘমেয়াদি বিমান অভিযান যুক্তরাষ্ট্রকে আরও বড় সামরিক ও কৌশলগত সংকটে ফেলতে পারে।
প্রায় ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধের শুরুতে ওয়াশিংটন থেকে দাবি করা হয়েছিল, ইরানের সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। ট্রাম্পের ঘোষিত প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা। কিন্তু যুদ্ধের এই পর্যায়ে এসে বাস্তবতা হলো, সহজ কোনো সামরিক সমাধান নেই। এমনকি জেনারেল কেইন নিজেও কংগ্রেসের এক শুনানিতে বলেছেন, বিমানবাহিনীর শক্তির একটি নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
জুলাইয়ের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র আরও বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর কথা বিবেচনা করেছিল। কিন্তু কেইনসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা এর সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যের মিত্ররাও ট্রাম্পকে সতর্ক করে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র হামলা বাড়ালে ইরান পাল্টা আঘাত হিসেবে উপসাগরীয় দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালাতে পারে। এই আশঙ্কার পর ট্রাম্প সেই মুহূর্তে বড় হামলা থেকে সরে আসেন। তবে পরিকল্পনাটি পুরোপুরি বাতিলও করা হয়নি।
সামরিক অস্ত্র ও গোলাবারুদের ঘাটতিও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে। ছয় মাসের যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ব্যবহারের ফলে মার্কিন সামরিক মজুত চাপের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে ইসরায়েল ও ইউক্রেনকে সহায়তার জন্য নির্ধারিত অস্ত্রের মজুদ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোও আশঙ্কা করছে, মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পর্যাপ্ত না থাকলে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকানো কঠিন হবে।
ইরানের জ্বালানি ও যোগাযোগ অবকাঠামোয় হামলার বিষয়েও ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু সামরিক কর্মকর্তাদের একাংশ মনে করছেন, বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র বা জ্বালানি স্থাপনায় হামলা করলেই ইরানের সামরিক সক্ষমতা ভেঙে পড়বে না। বরং এতে ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোয় পাল্টা হামলা চালাতে পারে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের সাধারণ মানুষ সরকারবিরোধী হওয়ার বদলে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই আরও ক্ষুব্ধ হতে পারে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলোও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এগুলো এমনভাবে ছড়িয়ে ও লুকিয়ে রাখা হয়েছে যে একটির পর একটি ধ্বংস করলেও নতুন স্থাপনা দ্রুত সক্রিয় করা সম্ভব। ফলে অবকাঠামো ধ্বংসের ওপর নির্ভর করে যুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করা কঠিন।
এই পরিস্থিতিতে জেনারেল কেইনের ভূমিকা অত্যন্ত সূক্ষ্ম। একদিকে তাকে প্রেসিডেন্টের সামরিক নির্দেশ বাস্তবায়নের প্রস্তুতি রাখতে হচ্ছে। অন্যদিকে সামরিক বাস্তবতা ও ঝুঁকির কথাও স্পষ্ট করতে হচ্ছে। ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেই তাকে সামরিক বিকল্পগুলোর সীমাবদ্ধতা তুলে ধরতে হচ্ছে। জুলাইয়ের শেষের দিকের এক বৈঠকে তিনি অস্ত্রের ঘাটতি ও সামরিক অভিযানের ঝুঁকি তুলে ধরার পাশাপাশি ট্রাম্পকে আশ্বস্ত করেন—প্রেসিডেন্ট নির্দেশ দিলে মার্কিন বাহিনী সামরিক অভিযান চালাতে প্রস্তুত।
তবে গোপন বৈঠকে কেইন আরও সরাসরি বলেন, শুধু বোমাবর্ষণের মাধ্যমে ট্রাম্পের কাঙ্ক্ষিত চূড়ান্ত সামরিক বিজয় অর্জন করা সম্ভব নয়। তার এই অবস্থান নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে কেউ কেউ সমালোচনা করলেও এটি মূলত রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সামরিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা।
যুদ্ধ শুরুর আগেই মার্কিন সামরিক নেতৃত্ব সতর্ক করেছিল, দীর্ঘমেয়াদি অভিযান হলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর বড় চাপ পড়বে। এখন ছয় মাস পর সেই আশঙ্কাই বাস্তবে পরিণত হয়েছে। এমনকি সেন্টকমের পক্ষ থেকে ইরানকে পরাস্ত করার নতুন ও অপ্রচলিত পদ্ধতির জন্য ‘ক্রাউডসোর্সিং’-এর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যুদ্ধের মাঝপথে নতুন কৌশলের সন্ধান থেকেই বোঝা যায়, প্রচলিত পরিকল্পনা প্রত্যাশামতো কাজ করছে না।
তবে ইরানকে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করতে বড় ধরনের মার্কিন স্থল অভিযান প্রয়োজন হতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে। এর অর্থ হতে পারে বিপুল মার্কিন সেনা মোতায়েন এবং ভয়াবহ প্রাণহানি। যদিও পেন্টাগন সম্ভাব্য স্থলযুদ্ধের পরিকল্পনা তৈরি রেখেছে, এই মুহূর্তে প্রশাসনের কেউ এমন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সুপারিশ করছেন না।
তাই জেনারেল কেইন ও তার সমমনা কর্মকর্তাদের লক্ষ্য এখন ভিন্ন। তারা এমন একটি কৌশলগত বা ‘প্রতীকী’ বিজয়ের পথ খুঁজছেন, যা ট্রাম্প মার্কিন জনগণের সামনে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন। একই সঙ্গে যুদ্ধ থামিয়ে কূটনৈতিক আলোচনার দরজা খোলা রাখা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার সুযোগ তৈরি করা যাবে। অর্থাৎ, যুদ্ধ জেতার চেয়ে এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—কীভাবে এই যুদ্ধ থেকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসা যায়।