মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মুখে গতকাল শুক্রবার এক ঐতিহাসিক যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে।
গত বছরও সৌদি আরব ও পাকিস্তান একই ধরনের একটি চুক্তি করেছিল। তবে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নামে পরিচিত নতুন এই এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তনশীল শক্তির সমীকরণ নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে এমন একটি বড় আঞ্চলিক জোটের সূচনা হতে পারে, যারা ইসরায়েল ও ইরান–দুই দেশ থেকেই দূরত্ব বজায় রাখবে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার বিশ্লেষণ বলছে, চুক্তির তিন দেশই আঞ্চলিক বিভিন্ন হুমকির সামনে নিজেদের শক্তি ও ঐক্যের বার্তা দিতে চায়। তবে তারা এটিকে ‘সরাসরি যুদ্ধের হুমকি বা প্রতিরোধমূলক জোট’ হিসেবে তুলে ধরতেও সতর্ক রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তিন দেশের কোনোটিই আঞ্চলিক প্রতিপক্ষদের উসকে দিতে চায় না। পাশাপাশি, চুক্তির কারণে কোনো একটি দেশের ওপর হামলা হলে অন্য দুই দেশ কতটা বাধ্য হয়ে যুদ্ধে জড়াবে, সেটিও এখনো পরিষ্কার নয়।
তুরস্কের এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, এই চুক্তি সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক ধাঁচের। এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা পক্ষকে লক্ষ্য করে করা হয়নি। আঞ্চলিক অন্যান্য দেশের জন্যও এতে যোগ দেওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি, এই চুক্তির মাধ্যমে বিদ্যমান কোনো দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বাতিল বা প্রতিস্থাপন করা হয়নি।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কিলোওয়েন গ্রুপের চেয়ারম্যান হারলান উলম্যান আল জাজিরাকে বলেন, চুক্তিতে সম্ভবত বলা হয়েছে– তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে। তবে এখানে ‘গণ্য করা হবে’ কথাটিই গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ এই নয় যে, অন্য দেশগুলোকে অবশ্যই যুদ্ধে নামতে হবে।
তিন দেশই আঞ্চলিক ঝুঁকিতে
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের সীমান্ত সংঘাত চলছে। এর আগে গত বছরের মে মাসে আরেক প্রতিবেশী পারমাণবিক শক্তিধর ভারতের সঙ্গেও কয়েক দিন ধরে পাকিস্তানের সংঘর্ষ হয়েছিল।
অন্যদিকে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকে সৌদি আরবও ইরান ও তার মিত্রদের হামলার শিকার হয়েছে।
ঐতিহাসিক যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক। ছবি: রয়টার্স
আর তুরস্ক বহু বছর ধরে দেশের ভেতরে ও বাইরে কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গেও তুরস্কের উত্তেজনা বেড়েছে।
উলম্যানের মতো অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে তিন দেশ ভবিষ্যতে এসব সংঘাতে কীভাবে জড়িয়ে পড়বে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
উলম্যান বলেন, “ধরুন, ইয়েমেনের হুতিরা সৌদি আরবে হামলা করল। তাহলে কি তুরস্কও এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে? পাকিস্তান কি জড়িয়ে পড়বে? সেটিই এখনো দেখার বিষয়।”
আঞ্চলিক শক্তির সমীকরণে পরিবর্তন
গত কয়েক বছরে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস ইসরায়েলে হামলা চালানোর পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। এরপর গাজায় চালানো ইসরায়েলের ব্যাপক সামরিক অভিযান ও হত্যাকাণ্ড পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
এদিকে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে কয়েক দশকের শত্রুতাও শেষ পর্যন্ত একটি আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে, যার এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য দেশের সরকারগুলোও এই অস্থির পরিস্থিতি কীভাবে সামলাবে এবং সামনে কী হতে পারে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবছে। পারস্পরিক হুমকির মুখে অনেক দেশই পুরোনো বিরোধ ভুলে বাস্তব পরিস্থিতি অনুযায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। তাদের কাছে এখন বাস্তববাদী নীতিই সবচেয়ে ভালো পথ বলে মনে হচ্ছে।
এক্ষেত্রে তুরস্ক ও সৌদি আরব সবচেয়ে ভালো উদাহরণ। ২০১৮ সালে ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যার পর দুই দেশের মধ্যে গভীর বিরোধ তৈরি হয়। এই বিরোধ কয়েক বছর ধরে চলমান ছিল। তবে ২০২২ সালের মধ্যে সৌদি আরব ও তুরস্ক তাদের পুরোনো বিরোধ অনেকটাই পাশে সরিয়ে রাখে। সৌদি তখন পুরো অঞ্চলে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছিল। অন্যদিকে তুরস্ক নিজেদের অর্থনীতি শক্তিশালী করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছিল।
এরপর থেকে ইসরায়েল ও ইরান মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চাপ সৃষ্টি করে আসছে। দুই দেশই অঞ্চলটির জন্য ভিন্ন ভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। তবে এই চাপই পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মতো দেশগুলোকে আরও কাছাকাছি আসতে সাহায্য করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সৌদি আরবভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুলআজিজ সাগের বলেন, “এই শীর্ষ বৈঠকের রাজনৈতিক তাৎপর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনিশ্চয়তাপূর্ণ এই সময়ে মুসলিম বিশ্বের তিনটি সবচেয়ে প্রভাবশালী রাষ্ট্র একত্রিত হয়েছে, যা নিরাপত্তা ইস্যুতে আঞ্চলিক ও মধ্যম শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের আগ্রহকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে।”
আবদুলআজিজ আরও বলেন, “যদি এই ত্রিপক্ষীয় কাঠামো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় এবং বাস্তব সহযোগিতায় পরিণত হয়, তাহলে এটি তিন দেশের সম্মিলিত কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে। একই সঙ্গে এটি অঞ্চলনির্ভর একটি নতুন নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”
প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো তিন দেশের বিরুদ্ধে যেকোনো হুমকি ঠেকাতে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করা।
আল জাজিরার সংবাদদাতা ওসামাহ বিন জাভিদ বলেন, তিনটি দেশই এই জোটে ভিন্ন ভিন্ন শক্তি নিয়ে এসেছে। তিনি বলেন, পাকিস্তানের রয়েছে যুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সেনাবাহিনী, বিপুল অস্ত্র ও পারমাণবিক অস্ত্র। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানই একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। তুরস্ক ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। দেশটির রয়েছে উন্নত ড্রোন প্রযুক্তি ও শক্তিশালী সামরিক সরঞ্জাম তৈরির সক্ষমতা। আর সৌদি আরবের এই জোটকে প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সহায়তা দেওয়ার মতো শক্তিশালী আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে।
দশকের পর দশক ধরে পাকিস্তান সৌদি আরবের সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে আসছে। একইভাবে তুরস্ক ও পাকিস্তান যুদ্ধজাহাজ ও প্রশিক্ষণ বিমান বিনিময় করেছে। ২০২৩ সালে সৌদি আরব তুরস্কের তৈরি ড্রোন কেনার চুক্তি করে, যা আঙ্কারা তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা রপ্তানি চুক্তি বলে উল্লেখ করেছিল।
২০২২ সালের মধ্যে সৌদি আরব ও তুরস্ক তাদের পুরোনো বিরোধ অনেকটাই পাশে সরিয়ে রাখে। ছবি: রয়টার্স
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাস থেকে পাকিস্তান সৌদি আরবে প্রায় ৮ হাজার সেনা, যুদ্ধবিমান, ড্রোন এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নিয়েছে ইসলামাবাদ। জুলাই মাসে জ্বালানি সহযোগিতা ও বিনিয়োগের বিনিময়ে কুয়েতের সঙ্গে একটি সম্প্রসারিত নিরাপত্তা চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে পাকিস্তান।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার কারণে নতুন সামরিক জোট ও নতুন ধরনের প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরির প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে। সৌদি আরব এবং তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রকে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি দিন দিন অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে বলে অনেক দেশ মনে করছে। তাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতার পাশাপাশি বিকল্প নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুঁজছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার এখন ইসরায়েল বলেই মনে হচ্ছে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র তার অন্য মিত্রদের কতটা রক্ষা করতে চাইবে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
উলম্যান বলেন, “ট্রাম্প প্রশাসন বলেছে, মিত্রদের নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদেরই নিতে হবে। আমার কাছে পরিষ্কার, আমাদের মিত্ররা এখন অন্য পথ খুঁজছে।”
মক্কায় শুক্রবার এই চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে এর প্রতীকী গুরুত্বও বেড়েছে। কারণ এটি তিন দেশের দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় সামরিক সহযোগিতার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নতুন রূপ পেয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডিফেন্স স্টাডিজ সেন্টারের গবেষক মনসুর আহমেদ বলেন, পাকিস্তান ও তুরস্কের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প রয়েছে, আর সৌদি আরব প্রযুক্তি খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের মাধ্যমে এই অংশীদারত্বে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
তবে তিনি মনে করেন, এই চুক্তিতে পারমাণবিক সহযোগিতার কোনো উপাদান থাকার সম্ভাবনা কম। কারণ পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রতিরোধনীতি মূলত ভারতের সম্ভাব্য হুমকিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে।
ইসরায়েল ও ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের বড় হুমকি হিসেবে দেখা হলেও, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির তিন দেশ স্পষ্টভাবে বলেছে, এই জোট কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে তৈরি হয়নি।
বিন জাভিদ বলেন, তিন দেশের জন্যই আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার সবচেয়ে বড় হুমকি ইসরায়েল। এরপরই রয়েছে ইরান। বিশেষ করে সৌদি আরবের জন্য ইরান বড় হুমকি, কারণ তেহরান এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কারণে সেখানে হামলা চালিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অনেকের মতে, একসময় ইসরায়েল সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের পর ইসরায়েল দেখিয়েছে, তারা আলোচনার চেয়ে সামরিক শক্তি দিয়ে বিরোধ মেটাতেই বেশি আগ্রহী।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকেও সম্প্রতি একটি সম্ভাব্য ‘সুন্নি জোট’ নিয়ে কথা বলতে শোনা গেছে। তবে তিনি এই জোট বলতে ঠিক কী বোঝাচ্ছেন, তা পরিষ্কার করেননি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য শেষ পর্যন্ত বাস্তবেই একটি সুন্নি জোট তৈরিতে সাহায্য করতে পারে। কারণ পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক-তিন দেশেই সুন্নি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ।
নতুন সদস্য আসবে?
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে ভবিষ্যতে আরও কোনো দেশ যোগ দেবে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়। সম্ভাব্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে মিসর, কাতার, সিরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)।
এ ধরনের জোটের সুবিধা অবশ্যই আছে। মধ্যপ্রাচ্যের সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের মধ্যে বিভক্ত। পর্যবেক্ষকদের মতে, এ বিভক্তির কারণেই তারা ইসরায়েল ও ইরানের হুমকি মোকাবিলায় কার্যকরভাবে একসঙ্গে কাজ করতে পারেনি। তবে পুরোনো বিরোধ এবং বিভিন্ন দেশের আলাদা স্বার্থের কারণে জোটটির বড় হওয়া নিয়ে একটা অনিশ্চিয়তা রয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে সিরিয়ার কথা বলা যায়। ১৩ বছরের ভয়াবহ যুদ্ধের পর দেশটি এখন যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনে মনোযোগ দিচ্ছে। ইসরায়েলের সঙ্গে দেশটির সীমান্ত রয়েছে। তাই সিরিয়া যদি এই জোটে যোগ দেয়, তাহলে ইসরায়েল বিষয়টি নেতিবাচকভাবে দেখতে পারে।
মিসরও বর্তমানে অর্থনীতি শক্তিশালী করা এবং দেশের ভেতরে নতুন অস্থিরতা এড়ানোর দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
এর আগে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে সৌদি নেতৃত্বাধীন একটি সামুদ্রিক জোটে যোগ দিতেও মিসর দ্বিধা করেছিল। দেশটির আশঙ্কা ছিল, এতে তারা আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।
সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্ক জোটের সম্ভাব্য আরেক সদস্য হতে পারে সংযুক্ত আরব আমিরাত। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন বিষয়ে এই তিন দেশের সঙ্গে আরব আমিরাতের মতপার্থক্য দেখা গেছে। বিশেষ করে ইয়েমেন এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়টি উল্লেখযোগ্য।
ইসরায়েলের সঙ্গে আরব আমিরাতসহ কয়েকটি আরব দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ নামে আরেকটি আঞ্চলিক জোট তৈরি হয়েছে। এই জোটকে মক্কা চুক্তির দেশগুলোর তুলনায় ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ একটি জোট হিসেবে দেখা হয়।
এসব বিবেচনায় শুক্রবারের চুক্তির পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো আঞ্চলিক ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে–এমন কথা বলা এখনই সহজ নয় বলে মত বিশেষজ্ঞদের। তাদের ভাষ্য, মধ্যপ্রাচ্যে গত কয়েক দশক ধরেই জোট ও বন্ধুত্বের সমীকরণ বদলেছে। ভবিষ্যতেও তা বদলাতে পারে। এই জোটের প্রকৃত শক্তি বোঝা যাবে যখন এটি সত্যিকারের কোনো সংকট বা যুদ্ধে পরীক্ষার মুখে পড়বে।
ইসরায়েল ও ইরান দেখিয়েছে যে তারা যুদ্ধ করতে এবং তার পরিণতি মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। কিন্তু সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান কি একে অপরের জন্য একইভাবে যুদ্ধে যেতে প্রস্তুত?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে এই তিন দেশকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হতেই পারে। তখনই বোঝা যাবে– সত্যিই কি মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও ইরানের বাইরে একটি তৃতীয় শক্তিশালী জোট বা ‘অক্ষ’ তৈরি হচ্ছে।