লোহিত সাগরে জাহাজে চলাচলে নিরাপত্তা নিশ্চিতে একটি একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সৌদি আরব। এই নৌপথে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিদের হামলা ঠেকানোর জন্য করা জোটে যোগ দেওয়ার জন্য অনেক দেশকে আমন্ত্রণ হয়। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার রাতে সৌদি জানায়, ইতোমধ্যে ১৩টি দেশ এতে যোগ দিতে সম্মত হয়েছে।
গত ২০ জুলাই হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সমুদ্রপথে অবরোধ আরোপ করে। ফলে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় লোহিত সাগর দিয়ে যে তেল পরিবহন করা হচ্ছিল তাও ব্যাহত হয়। এছাড়া ইয়েমেন উপকূলের কাছে বাব এল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে হুতিরা টোল আদায়ের পরিকল্পনাও করছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, লোহিত সাগরের এই অস্থিরতার কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম এবং পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা আরও চাপে পড়েছে। কারণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় যে সংকট তৈরি হয়েছিল, সেটিও এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত এই জোটের সদর দপ্তর হবে রাজধানী রিয়াদে।
কোন কোন দেশ জোটে যোগ দিচ্ছে?
সৌদির পাশাপাশি তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিসর, পাকিস্তান, জিবুতি, সোমালিয়া, বাংলাদেশ, ইয়েমেন, সুদান ও কোমোরোস এই জোটে যোগ দিয়েছে বলে জানা গেছে। তবে একই ধরনের নিরাপত্তা স্বার্থ থাকা সত্ত্বেও সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান এখনো এই জোটে যোগ দেয়নি।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করার পর অন্য দেশগুলোর জন্যও এই জোটে যোগ দেওয়ার সুযোগ খোলা থাকবে।
রিয়াদের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও যুক্তরাষ্ট্র এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই জোটে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দেয়নি। তবে দেশটি এতে যোগ দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সমুদ্রপথের নিরাপত্তা রক্ষায় বাংলাদেশসহ ১৩টি দেশের সঙ্গে জোট গঠন করেছে সৌদি আরব। ছবি: এক্স
বৃহস্পতিবার জোট গঠনের বৈঠকে আমন্ত্রিত ৫১টি দেশের মধ্যে ৪৩টি দেশের প্রতিনিধি অংশ নেন।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একটি প্রতিনিধিদলও বৈঠকে ছিল। লোহিত সাগরে ইইউর আগে থেকেই ‘অ্যাসপিডিস’ নামে একটি নৌ নিরাপত্তা মিশন রয়েছে।
মার্কিন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন।
অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈঠকে প্রিন্স সালমান ওয়াশিংটনকে জানান, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সংঘাত আরও বাড়ুক, তা সৌদি আরব চায় না। তবে প্রয়োজন হলে দেশটি নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রস্তুত।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রিন্স সালমান জেডি ভ্যান্সকে জানিয়েছেন, ইয়েমেনের হুতিদের পরিস্থিতি সৌদি আরব নিজেই সামাল দিতে পারবে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব পূর্ব ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর যৌথ হামলা চালায়। তাদের দাবি, সৌদি আরবে ইরানের নির্দেশে ড্রোন হামলার জবাব হিসেবেই এই অভিযান চালানো হয়েছে।
তবে বুধবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবির মাধ্যমে দেশটির এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, এসব হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করা ‘বড় ধরনের ভুল হিসাব’।
লোহিত সাগর কেন গুরুত্বপূর্ণ?
লোহিত সাগরের এক পাশে রয়েছে সৌদি আরব ও ইয়েমেন। অন্য পাশে রয়েছে মিসর, সুদান, ইরিত্রিয়া, জিবুতি ও সোমালিয়া। এটি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোর একটি। বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের প্রায় ৩০ শতাংশ এই পথ দিয়ে হয়।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে বলেছে, হরমুজ বন্ধ হওয়ার পর পশ্চিম উপকূলের ইয়ানবু বন্দরের মাধ্যমে লোহিত সাগর হয়ে তেল রপ্তানি শুরু করেছিল সৌদি। বর্তমানে সৌদি আরবের মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ৭০ শতাংশের বেশি এই বন্দর দিয়েই যায়।
এই পথের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বাব এল-মান্দেব প্রণালি। এটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানির জন্য এই পথ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
লোহিত সাগরে প্রবেশ ও বের হওয়ার মাত্র দুটি প্রধান পথ রয়েছে। একটি বাব এল-মান্দেব প্রণালি, অন্যটি সুয়েজ খাল। সবচেয়ে সরু জায়গায় বাব এল-মান্দেব প্রণালির প্রস্থ মাত্র ২৯ কিলোমিটার। তাই এখানে জাহাজ চলাচলের জন্য দুটি আলাদা পথ ব্যবহার করা হয়।
হুতিদের হামলার ঝুঁকি এড়াতে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার কিছু তেল কোম্পানি তেলের জাহাজ সুয়েজ খাল হয়ে ভূমধ্যসাগরে পাঠিয়ে সেখান থেকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরিয়ে এশিয়ায় আনতে চাইছিল।
সাধারণত সবচেয়ে বড় তেলবাহী জাহাজ (ভিএলসিসি) পুরো তেলভর্তি অবস্থায় সুয়েজ খাল পার হতে পারে না। তাই এসব জাহাজকে লোহিত সাগরে তেলের প্রায় অর্ধেক নামিয়ে রাখতে হবে। পরে সেই তেল মিসরের সুমেদ পাইপলাইনের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরে নেওয়া হবে।
এইজন্য লোহিত সাগরের নিরাপত্তা নিয়ে সৌদি এত বেশি উদ্বিগ্ন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে অবরোধের কারণে সৌদি আরব তাদের অনেক তেল এখন ইয়ানবু বন্দর হয়ে লোহিত সাগর দিয়ে রপ্তানি করছে। কিন্তু বর্তমানে ওই পথ কার্যত ইরান-সমর্থিত হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হয়। ফলে চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-চতুর্থাংশ প্রভাবিত হচ্ছে।
হুতিরা কেন লোহিত সাগরে জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে?
ইরান-সমর্থিত হুথিরা ২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর থেকে তারা সৌদি আরব-সমর্থিত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে আসছে। বর্তমানে সেই সরকারের প্রধান ঘাঁটি বন্দরনগরী এডেনে।
গত ২০ জুলাই হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সমুদ্রপথে অবরোধ ঘোষণা করে। তাদের দাবি, বহু বছর ধরে সৌদি আরবের সামরিক অভিযানের জবাব হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর কয়েক দিন আগে সানা বিমানবন্দরে হামলার প্রতিশোধ নেওয়ারও হুমকি দিয়েছিল তারা।
হুতিদের অভিযোগ, প্রায় ১২ বছর ধরে সৌদি নেতৃত্ব ইয়েমেনের ওপর অন্যায় অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছে। তারা দেশের সম্পদ লুট করেছে এবং স্থল, সমুদ্র ও আকাশপথে ইয়েমেনের বন্দর ও বিমানবন্দরগুলো অবরুদ্ধ করে রেখেছে। এরপর থেকে সৌদি আরবের পতাকাবাহী একাধিক জাহাজ এবং তেল স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে।
হুতিদের মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি মঙ্গলবার এক্সে জানান, তারা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সৌদি তেলবাহী জাহাজ এনসিসি গাজালকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এতে জাহাজটি পথ পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়।
এর আগে ২০২৩ সালে গাজায় ইসরায়েলের হামলার পর হুতিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলা চালিয়ে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটিয়েছিল।
হুতিরা কি লোহিত সাগরে টোল চালু করতে চায়?
বার্তা সংস্থা রয়টার্স বুধবার জানায়, হুতিরা লোহিত সাগর দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে টোল বা ফি আদায়ের পরিকল্পনা করছে। একই সময়ে ইরানও হরমুজ প্রণালিতে এমন ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা করছে
ইয়েমেনের তথ্যমন্ত্রী মোয়াম্মার আল-ইরিয়ানি বুধবার এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি অভিযোগ করেন, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এ পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর আইআরজিসির প্রভাব রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাহাজ ও শিপিং কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে অর্থ আদায়ের জন্য একটি আলাদা সংস্থা গঠনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে কবে থেকে এই টোল চালু হবে, তা এখনো জানা যায়নি।
আল-ইরিয়ানির ভাষ্য, এটি খুবই বিপজ্জনক পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোর একটিকে হুতিদের সামরিক কর্মকাণ্ডের অর্থের উৎসে পরিণত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
টোল আদায়ের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনাতেও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। ইরান জানিয়েছে, ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আর আগের মতো বিনা খরচে সব জাহাজ চলাচল করতে পারবে না। কোনো না কোনো ধরনের ফি দিতে হবে।
আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনে হরমুজ ও বাব এল-মান্দেবের মতো প্রাকৃতিক প্রণালির তীরবর্তী দেশগুলো জাহাজের কাছ থেকে টোল নিতে পারে না। এমনকি পুরো প্রণালি তাদের জলসীমার মধ্যে হলেও এই নিয়ম প্রযোজ্য। তবে কিছু ক্ষেত্রে নোঙর করা, বন্দর ব্যবহার বা বীমাসহ নির্দিষ্ট সেবার জন্য ফি নেওয়া যায়।
সোমবার ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারও ইঙ্গিত দেয়, হুতিরা ইরানের পথ অনুসরণ করতে চাইছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফরাহ আল-জৌবা সাংবাদিকদের বলেন, হুতিরা ইরানের মডেল অনুসরণ করতে চায়। এতে উপসাগর ও লোহিত সাগরের দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথই কার্যত অচল হয়ে যেতে পারে।