মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে শিল্প খাতে বাড়বে গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ–গত সোমবার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে এমন আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সে অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ বেড়েছেও। কিন্তু কীভাবে? হঠাৎ করে বাড়তি গ্যাস কোথা থেকে এল?
না, কোনো বাড়তি গ্যাস সরবরাহ নয়। তবে দেশে থাকা গ্যাসের পুনর্বণ্টন করেই সংকট নিরসনের চেষ্টা করছে সরকার। এটা অবশ্য নতুন কোনো কৌশলও নয়। এর আগে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং তার আগের আওয়ামী লীগ সরকারও অনুরূপ কৌশল গ্রহণ করেছিল। কী এই কৌশল? মোটাদাগে এ ক্ষেত্রে তিনটি কর্মকৌশলের দিকে হাঁটছে সরকার–
এক. বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে শিল্পে গ্যাস দেওয়া
দুই. গ্যাসের ঘাটতি পূরণে তেলভিত্তিক ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বেশি চালানো
তিন. বন্ধ বা আংশিক বন্ধ এফএসআরইউ থেকে সরবরাহ বাড়ানো
শেষ থেকে শুরু করা যাক। গ্যাস খাতে বিশেষ করে আমদানি করা এলএনজি মঙ্গলবার থেকে আবার প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় সরবরাহ করার কথা জানায় পেট্রোবাংলা। গত ২১ জুলাই কার্গো থেকে এলএনজি সরবরাহের সময় দুর্ঘটনায় এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউটির বয়লার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে প্রায় ৪৫০–৫০০ এমএমসিএফডি পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। পরে মেরামত হলেও এলএনজির কার্গো সময়মতো না পৌঁছানোয় পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছিল না এফএসআরইউটি। তবে শেষ পর্যন্ত সে সংকট কেটেছে। এ কারণেই মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় এখান থেকে গ্যাস সরবরাহ করার সম্ভাবনার কথা জানানো হয়।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ১৫ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টায় সামিট ও এক্সিলারেটের সক্ষমতার ১১০০ এমএমসিএফডি-এর মধ্যে ৯৯০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেল ৪টার দিকে এ সরবরাহ কিছু বেড়ে ৯৯৩ এবং রাত ৮টার দিকে আরও বেড়ে ১০১৩ এমএমসিএফডি হয়। অর্থাৎ, এলএনজি থেকেই প্রায় ১৮৬–২৩৬ এমএমসিএফডি অতিরিক্ত গ্যাস আসতে পারে। ফলে নিশ্চিতভাবেই বলা যায় ২১ জুলাই; অর্থাৎ, দেড় মাস আগের পরিস্থিতিতে ফিরবে গ্যাস সঞ্চালন।
পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, সোমবার রাতে দেশীয় উৎপাদিত গ্যাস এবং এলএনজি মিলে সরবরাহ করা হয় ২৫৮২ এমএমসিএফডি গ্যাস। এর সঙ্গে কমবেশি ২০০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ বাড়লেও ঘাটতি থাকবে অন্তত ১২০০ এমএমসিএফডি।
তাহলে শিল্প ও অন্যান্য ভোক্তা পর্যায়ে কীভাবে গ্যাস সরবরাহ বাড়বে? এখানে দেরিতে হলেও সরকার সিদ্ধান্তহীনতা থেকে বের হয়ে এসেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে সেই গ্যাস শিল্পে সরবরাহের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দিকে এগিয়েছে সরকার।
গত ২১ জুলাই কার্গো থেকে এলএনজি সরবরাহের সময় দুর্ঘটনায় এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউটির বয়লার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফাইল ছবি
আগস্টের শেষ দিকেই এমন সিদ্ধান্ত নিলেও তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি কিংবা করেনি সরকার। ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের ধারণা, উচ্চ মূল্যের তেল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে হাঁটতে সরকারে সাবধানি আচরণের বহিঃপ্রকাশ এটি। বিদ্যুৎ ঘাটতি যেহেতু জাতীয় অর্থনীতিতে সরাসরি নেতিবাচিক প্রভাব ফেলে, তাই অতীতে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই পদ্ধতি ব্যবহার করে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিল।
২০২৫ সালের মে মাসে তৎকালীন সরকার বিদ্যুৎকেন্দ্রের বরাদ্দ থেকে ১৫০ এমএমসিএফডি এবং নতুন এলএনজি কার্গো থেকে আরও ১০০ এমএমসিএফডি, মোট ২৫০ এমএমসিএফডি শিল্পে দিয়েছিল। তখন শিল্পের প্রয়োজন ছিল ১,৩০৬ এমএমসিএফডি, সরবরাহ ছিল ৯৯৪ এমএমসিএফডি।
এবারও ব্যবসায়ীরা মৌসুমের শুরু থেকেই গ্যাসভিত্তিক কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র কম চালিয়ে তেল ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। গত ১৪ সেপ্টেম্বরের বৈঠকেও ব্যবসায়ীরা একই প্রস্তাব দেন, যাতে সবুজ সংকেত দিয়েছে সরকার।
তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান চরচার সঙ্গে আলাপে সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে দুটি এফএসআরইউ থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ করলেও শিল্পে বাড়তি গ্যাস পৌঁছাতে আরও ৩–৪ দিন লাগতে পারে বলে মনে করেন এই রপ্তানিকারক ব্যবসায়ী। তার হিসাব বলছে, এলএনজি টার্মিনাল থেকে রিগ্যাসিফিকেশন হয়ে সেই গ্যাস গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর কারখানাগুলোর বার্নার পর্যন্ত প্রয়োজনীয় প্রেশারে পৌঁছাতে সময় লাগবে।
শিল্প খাতে এ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে বেশি গ্যাস সরবরাহ করলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন অবধারিতভাবেই কমবে। তাই সেই ঘাটতি পূরণ করতে সরকারকে অন্য জ্বালানি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পথে হাঁটছে সরকার।
বাংলাদেশে ৫৩টি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রর মোট সক্ষমতা ৫ হাজার ৬৩৭ মেগাওয়াট। সম্প্রতি এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩,০০০–৩,৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। ফলে আরও প্রায় ২,০০০ মেগাওয়াটের মতো উৎপাদন সক্ষমতা অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে।
পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতাও আছে। প্ল্যান্ট ফ্যাক্টর, অর্থ ও মেইনটেন্যান্স ইস্যুর মতো বিষয়গুলো এর সঙ্গে যুক্ত।
বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইপিপিএ) সভাপতি কে এম রেজাউল হাসনাত চরচাকে জানিয়েছেন, সরকার এরই মধ্যে ফার্নেস ওয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর বকেয়া পরিশোধ শুরু করেছে। জ্বালানি তেল আমদানিতে ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয়েছে। আসছে সপ্তাহে এই তেল পৌঁছালে বাড়বে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন।
এদিকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে যে জটিলতা ছিল, তা আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। গত কয়েকদিন কারিগরি ত্রুটির কারণে আদানির একটি ইউনিট বন্ধ ছিল। ১৪ সেপ্টেম্বর সেটি আবার চালু হয়েছে বলে জানায় আদানি কর্তৃপক্ষ। ওই দিনই এ দুই ইউনিট থেকে ১,৪৫০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে। তবে রামপাল, পায়রা ও পটুয়াখালীর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে পুরো সক্ষমতায় ফেরানো নিয়ে এখনো সংকটে আছে সরকার।
অর্থাৎ, সরকারের এখনকার উদ্যোগ মূলত সাম্প্রতিক ৩০০–৪০০ এমএমসিএফডির মতো গ্যাসের ঘাটতি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা। দেশের মোট ১,১০০–১,৩০০ এমএমসিএফডি গ্যাস ঘাটতি মোকাবিলার জন্য তৃতীয় এফএসআরইউ স্থাপন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়াসহ নানামুখী উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে।