ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রথম ‘সহযোগী সদস্য’ হিসেবে কানাডাকে যুক্ত করার উদ্যোগ নিতে চান ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেন। আজ বুধবার ইউরোপীয় পার্লামেন্টে দেওয়া বার্ষিক ভাষণে তিনি এ প্রস্তাব দেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
“প্রকাশ্যভাবে বৈরী এক বিশ্বে” মিত্রদের মধ্যে নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলতে এ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি জানান। তার প্রস্তাবের পর পার্লামেন্টের সদস্যরা দাঁড়িয়ে করতালি দেন। পরে উপস্থিত কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে আলিঙ্গন করেন ভন ডার লেন।
রয়টার্স লিখেছে, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন ইইউ-র সীমানায় যুদ্ধ টেনে নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে ইইউ ও কানাডা দুই পক্ষই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা ট্যারিফ আর দিনে দিনে আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠতে থাকা চীনের দিক থেকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
তাছাড়া, এমন এক সময়ে কানাডাকে ইইউ-এর সহযোগী দেশ করার আলোচনা চলছে, যখন কানাডা আর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা গত মাসে ভেস্তে গেছে।
তবে ট্রাম্পের নাম উল্লেখ না করেই ভন ডার লেন বলেন, কানাডাকে ইইউ-এর সদস্য করার প্রস্তাব “কারও বিরুদ্ধে কোনো জোট গড়ার উদ্দেশ্যে নয়, বরং আমাদের শক্তিকে একসঙ্গে কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে।”
‘ইউরোপ ও কানাডা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে’
ভন ডার লেন বলেন, “আমাদের অংশীদারত্বগুলোকে জরুরিভাবে নতুন করে ভাবতে হবে। তাই কানাডাকে ইইউ-এর প্রথম সহযোগী সদস্য করার পথ খুলতে আপনাদের সঙ্গে কাজ করতে চাই।”
তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, আর্কটিক ও ভূরাজনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইইউ ও কানাডার অবস্থানে মিল রয়েছে। ইউক্রেন, প্রতিরক্ষা, কাঁচামাল ও সরবরাহব্যবস্থার ক্ষেত্রেও তারা একসঙ্গে কাজ করছে।
“সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইউরোপ ও কানাডা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে,” বলেন তিনি।
তবে প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত ইইউর সদস্যদেশগুলোকেই নিতে হবে। সহযোগী সদস্যপদের মতো নমনীয় ব্যবস্থাকে ইইউ ঐতিহাসিকভাবে খুব একটা উৎসাহিত করেনি। মে মাসে ইউক্রেনকে সহযোগী সদস্য করার জার্মান প্রস্তাবেও সদস্যদেশগুলো উষ্ণ সাড়া দেয়নি। বিবিসি তাদের প্রতিবেদনে লিখেছে, ইইউ যদি কানাডাকে সহযোগী সদস্য বানানোর ব্যাপারে একমত হয়েও যায়, তাতেও এই প্রক্রিয়া শেষ হতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।
বিবিসি জানাচ্ছে, কানাডার সঙ্গে ইইউ-এর মুক্ত বাণিজ্য নিয়ে চুক্তির আলোচনা প্রায় এক দশক আগেই হয়ে গেলেও এখনো ইইউ-এর ২৭ সদস্য দেশের ১০টি এই চুক্তির চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়নি। বেশ কয়েকটি দেশ কানাডার জন্য নতুন সদস্যপদ খোলার বদলে ইইউ-এর বর্তমানে যে প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্য চুক্তিগুলো আছে, সেগুলোকেই আরও ভালোভাবে কাজে লাগানোর পক্ষে।
ইইউর এক কূটনীতিক রয়টার্সকে বলেন, ভন ডার লেনের প্রস্তাবে তিনি বিস্মিত। তার ভাষায়, “এর অর্থ কী, তা আসলে কেউই জানে না।” ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট অতিরিক্ত প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন এবং তা বাস্তবায়ন করতে পারবেন না, এমন উদ্বেগও রয়েছে বলে জানান তিনি।
ভন ডার লেনের ভাষণের আগে সাতজন ইইউ কূটনীতিক রয়টার্সকে জানান, বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা ও ডিজিটাল নিরাপত্তায় কানাডার সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ চলছে। তবে বিস্তৃত কোনো অংশীদারত্বের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা এখনো উচ্চপর্যায়ে আলোচনা হয়নি।
বাণিজ্য বাড়ানোর ক্ষেত্রেও বাধা রয়েছে। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মার্ক ম্যানজার বলেন, কানাডা টেলিযোগাযোগ ও দুগ্ধশিল্পকে সুরক্ষা দিয়ে আসায় বাজার উন্মুক্ত করতে দেশটির অনীহায় ইইউ কর্মকর্তারা হতাশ।
‘অনন্য জোট’
কার্নি চলতি সপ্তাহে বলেছেন, কানাডা ইইউর সঙ্গে একটি ‘অনন্য জোট’ চায়, তবে সদস্যপদ নয়। আগামীকাল বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ভাষণ দেবেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে পড়ার পর কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে বড় ধরনের টানাপোড়েনের মধ্যে কার্নির ইউরোপ সফর হচ্ছে। পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপের মধ্য দিয়ে দুই দেশের বাণিজ্য বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে আগামী দশকে দেশটির বাইরে কানাডার বাণিজ্য দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নিয়েছেন কার্নি। গতকাল মঙ্গলবার তিনি বলেন, অক্টোবরের শেষ দিকে মন্ট্রিয়লে অনুষ্ঠেয় কানাডা-ইইউ শীর্ষ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনিতা আনন্দ রয়টার্সকে বলেন, “ইইউর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ক্রমেই ঘনিষ্ঠ হয়েছে, বিশেষ করে গত দেড় বছরে।”
ভন ডার লেন বলেন, ইইউ ও কানাডা বুদ্ধিমান উৎপাদনব্যবস্থা, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা শিল্প এবং আর্কটিক অঞ্চলে যৌথভাবে কাজ করবে।
“অংশীদারত্ব ইউরোপের একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। তবে এটি আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থায় যে ভাঙন দেখা দিয়েছে, তারও প্রতিক্রিয়া,” বলেন তিনি।