বিশ্বের বিভিন্ন কোম্পানি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এমনকি দেশের ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা বিশ্লেষণ করে ক্রেডিট রেটিং দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম মুডি’স। নিউইয়র্কভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি গতকাল বাংলাদেশের ক্রেডিট রেটিং বা ঋণমান নিয়ে নতুন মূল্যায়ন দিয়েছে।
তাদের চোখে বাংলাদেশের ঋণমান একই আছে। অর্থাৎ, গত বছরের মার্চে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী ঋণমান যা ছিল, এখনো সেই ‘বি২’-ই রেখেছে মুডি’স। তবে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে বাংলাদেশের এই ঋণমানের ব্যাপারে মুডি’সের দৃষ্টিভঙ্গি বা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার মূল্যায়নে। মুডি’সের মূল্যায়নে, বাংলাদেশ এখন ‘নেতিবাচক’ থেকে ‘স্থিতিশীল’ ক্যাটাগরিতে পড়বে।
মুডি’সের রেটিংয়ের ধাপগুলো কী কী
মুডি’সের রেটিংয়ে Aaa থেকে C পর্যন্ত মোট ৯টি মূল ক্যাটাগরি আছে। এর মধ্যে আবার Aa থেকে B পর্যন্ত ক্যাটাগরিগুলোর প্রতিটিতে তিনটি করে সাব-ক্যাটাগরি আছে। এই ৯টি মূল ক্যাটাগরির মধ্যে ওপরের চারটি বা তুলনামূলক কম ঝুঁকির চারটিকে ‘বিনিয়োগ শ্রেণি’তে ধরা হয়, নিচের পাঁচটি বা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকির পাঁচটিকে রাখা হয় ‘স্পেকুলেটিভ’ শ্রেণিতে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির বা সবচেয়ে বাজে ঋণমানের ক্যাটাগরি হলো সি (C)। এরপর ধাপে ধাপে ওপরে ওঠার ক্ষেত্রে Ca, Caa, B (এখানে B1, B2, B3 তিনটি শ্রেণি আছে), Ba (এখানেও Ba1, Ba2, Ba3 সাব ক্যাটাগরি আছে) পর্যন্ত পড়ে স্পেকুলেটিভ শ্রেণিতে। ধাপে ধাপে ওপরে উঠতে থাকা বাকি চারটি মূল ক্যাটাগরি, অর্থাৎ Baa (এখানে Baa1, Baa2, Baa3 তিনটি হলো সাব-ক্যাটাগরি), A (A1, A2, A3 সাব ক্যাটাগরি আছে), Aa (Aa1, Aa2, Aa3) ও Aaa ক্যাটাগরি পর্যন্ত চারটি মূল ক্যাটাগরি পড়ে বিনিয়োগ শ্রেণিতে। Aaa হলো সর্বোচ্চ রেটিং, অর্থাৎ সবচেয়ে কম ঝুঁকি এখানে।
বাংলাদেশ পড়েছে B2 সাব-ক্যাটাগরিতে। অর্থাৎ, বাংলাদেশ স্পেকুলেটিভ গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত।
তাহলে বাংলাদেশ কোথায় এগোল
সহজ করে বললে, বাংলাদেশের মূল ঋণমান বাড়েনি। ২০২৪-এর নভেম্বরে মুডি’স বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ক্রেডিট রেটিং বি১ থেকে বি২-তে নামিয়ে দিয়েছিল, পাশাপাশি আউটলুক বা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার মূল্যায়নকে ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’ করে দিয়েছিল। এখনো বি২ সাব ক্যাটাগরিতেই আছে বাংলাদেশ, তবে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার মূল্যায়ন আবার কিছুটা এগিয়ে ‘স্থিতিশীল’ হয়েছে।
মুডি’সের ‘নেতিবাচক’ আউটলুক মানে, একটি দেশের রেটিং সামনে আরও কমে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। স্থিতিশীল মানে, রেটিং কমে যাওয়ার ঝুঁকি কম বা বর্তমান রেটিং ধরে রাখার সম্ভাবনা বেশি।
বাংলাদেশের এই পরিবর্তনের কারণ কী
মুডি’স বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাদের আউটলুক-এ পরিবর্তন আনার পেছনে মূলত দুটি দিকের কথা বলছে–প্রথমত, নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অনেকটা কমে যাওয়া ও সে কারণে আর্থিক ও প্রশাসনিক খাতে সংস্কারের চেষ্টা চলমান থাকা। দ্বিতীয়ত ২০২৪-এর নভেম্বরের তুলনায় এখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে যাওয়া, ডলারের বিনিময় হারকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না রেখে বাজারকেন্দ্রিক করে ফেলা এবং রেকর্ড হারে রেমিট্যান্স আসা – সব মিলিয়ে বাইরের দুনিয়ার সামনে বাংলাদেশের অবস্থান এগিয়েছে।
এখানে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে কয়েকটি পয়েন্ট সামনে তুলে এনেছে মুডি’সের বিশ্লেষণ -
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ: মুডি’সের হিসাবে, ২০২৪-এর নভেম্বরে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ২১৪০ কোটি ডলার। এই অঙ্কটা ২০২৬-এর মাঝামাঝিতে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩২৯০ কোটি ডলারে। মুডি’সের বিশ্লেষণ, বর্তমান রিজার্ভের অঙ্ক দিয়ে চার মাসের বেশি আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।
বৈদেশিক মুদ্রায় বিনিময় হার: মুডি’স বলছে, আগে ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে বাজারে ডলার বিক্রি করতে হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংককে, যে কারণে চাপ পড়েছে রিজার্ভেও। কিন্তু এখন বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াচ্ছে। এতে কী হচ্ছে? মুডি’স বলছে, এতে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে আমদানির খরচ বেড়ে গেলেও তা বাংলাদেশের জন্য আগের মতো বৈদেশিক সংকট তৈরি করবে না।
প্রবৃদ্ধি: ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল জানিয়ে মুডি’স বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির এই হারটা দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ১ শতাংশে। সংস্থাটির পূর্বাভাস, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার হবে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ, তার পরের অর্থবছরে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ পর্যন্ত উঠতে পারে। অর্থাৎ, বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বলে মনে করছে মুডি’স। যদিও জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতিসহ কয়েকটি কারণে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর গতিটা কম হতে পারে বলেও জানিয়ে দিয়েছে সংস্থাটি।
এর পাশাপাশি পোশাক খাতের কারণে রপ্তানি আয়, জনসম্পদ, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য এবং আইএমএফ-এর মতো ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিবাচক সম্পর্কের কথাও তুলে এনেছে মুডি’স।
সবই এত ভালো হলে রেটিং বাড়ল না কেন?
রিজার্ভ, বিনিময় হার, প্রবৃদ্ধি – অর্থনীতির কয়েকটি সূচকে উন্নতির লক্ষণ, রাজনীতিতেও স্থিতিশীলতার আঁচ দেখছে মুডি’স। কিন্তু সবই এত ভালো মনে হলে বাংলাদেশকে নিয়ে শুধু ‘আউটলুক’-এ একটা ইতিবাচক বদল এনেই কেন শেষ টানল মুডি’স, রেটিং কেন একই রেখে দিল?
কারণ, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কয়েকটি জায়গায় সমস্যাও দেখছে মুডি’স। কী কী সেগুলো?
- ব্যাংক খাত বড় ঝুঁকিতে। মুডি’স বলছে, বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ। আর ব্যাংকগুলোতে এখনো যে মূলধন ঘাটতি আছে, তা জোগাতে গেলেই জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ লেগে যাবে। এটাকে সরকারের জন্য বড় ঝুঁকি বলছে মুডি’স। কারণ, ব্যাংক পুনর্গঠনে এরই মধ্যে কিছু অর্থ দিতে হয়েছে সরকারকে, ব্যাংক খাত আরও ঝুঁকিতে পড়লে এভাবে অর্থ ছাড়ের পরিমাণ বাড়তে পারে। সরকার এই অর্থ ঋণ করা ছাড়া আর কীভাবে জোগাড় করবে! মুডি’স বলছে, ব্যাংক খাতের এই সমস্যা সে কারণে সরকারের জন্য একটি সম্ভাব্য দায়।
- সরকারের আয় কম। বাংলাদেশের বাজেটই তা প্রতি বছর একবার করে জানান দেয়। আবার এই রাজস্বের প্রায় ৩০ শতাংশ শুধু আগের ঋণের সুদ পরিশোধেই চলে যাচ্ছে। ফলে, সরকার চাইলেও নিজে থেকে বড় ধরনের খরচ করে যাওয়ার সামর্থ তাদের নেই।
- সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটের কথা টেনে এনে মুডি’স বলছে, এই সংকটের প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প খাত ও সার উৎপাদনে। বিশ্বের জ্বালানি বাজার যেভাবে অস্থির হয়ে পড়েছে, তাতে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়লে বা সরবরাহ বিঘ্নিত হলে সেটা বাংলাদেশকে আরও চাপে ফেলবে বলে মনে করে মুডি’স।
- তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের রপ্তানির সবচেয়ে শক্তিশালী উৎস হলেও এখানে দুটি সম্ভাব্য সংকটের কথা বলছে মুডি’স – জ্বালানি সংকট ও এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ। এই দুটির কারণে রপ্তানিতে প্রতিযোগিতার বাজারে বাংলাদেশের পোশাক খাতকে ঝামেলায় পড়তে হতে পারে।
আইএমএফ নিয়ে কী বলেছে মুডি’স
বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থায়ন – বা বিদেশি ঋণ নেওয়া বলাই ভালো এবং অর্থনীতিতে সংস্কারের ক্ষেত্রে আইএমএফ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে জানিয়ে মুডি’স বলছে, আইএমএফ (আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল) এবং এ জাতীয় আন্তর্জাতিক ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভালো সম্পর্কই বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তবে আইএমএফ বাংলাদেশের আর্থিক ও প্রশাসনিক খাতে যে সংস্কার দেখতে চায়, যেভাবে দেখতে চায়, সেভাবে ও সেই গতিতে বাংলাদেশ সংস্কার করতে পারবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা আছে মুডি’সের।
আইএমএফ-এর পরবর্তী ঋণ কর্মসূচির শর্ত নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে জানিয়ে মুডি’স বলেছে, রাজস্ব আদায়, ব্যাংক সংস্কার ও বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় পিছিয়ে পড়লে আইএমএফ-এর সঙ্গে সম্পর্কে পিছিয়ে পড়তে পারে বাংলাদেশ। তাতে বিদেশি ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ঝামেলায় পড়তে পারে বলে মনে করে মুডি’স।
কী হলে এই রেটিং বাড়বে বা কমে যাবে?
সহজভাবে বলা যায়, আইএমএফ যা করতে বলছে, বাংলাদেশ সেগুলো মানতে থাকলেই মুডি’সের রেটিং বাড়বে। উল্টোটা করলে কমবে।
মুডি’স এখানে তিনটি বিষয়ের কথা বলছে। এক. ব্যাংক খাতের সমস্যা সমাধান। দুই. সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো। তিন. ব্যাংকিং, রাজস্ব, বিনিময় হারসহ কাঠামোগত সংস্কার। এই ক্ষেত্রগুলোতে টেকসই অগ্রগতি হলে বাংলাদেশের রেটিং বাড়ানোর পথ তৈরি হবে।
কিন্তু যদি ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণসহ নানা সমস্যার কারণে যদি সরকারের ওপর ব্যাংক খাতে বাড়তি টাকা দিতে হওয়ার চাপ তৈরি হয়, যদি সরকারের আয় কমে ও খরচ বাড়তে থাকে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা রেমিট্যান্সে চাপ পড়ে, আবার রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয় এবং আইএমএফ-এর প্রস্তাবিত সংস্কার কর্মসূচি থেকে বাংলাদেশ সরে যায় – তাহলে রেটিং কমে যাবে।