সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ২০২৩ সালের পারফরম্যান্সের বিপরীতে দেওয়া পাঁচটি উৎসাহ বোনাসের মধ্যে দুটি ‘নীতিবহির্ভূত’ বলে চিহ্নিত করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ওই দুই বোনাসের অর্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে আদায় করে সমন্বয়ের নির্দেশ দিয়ে আবারও ব্যাংকটিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। গত ১১ সেপ্টেম্বর সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে এ চিঠি পাঠানো হয়। এর আগে ২০২৫ সালের ২৭ মার্চও একই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উপসচিব আফরোজা আক্তার রিবার সই করা চিঠির একটি কপি চরচার কাছে এসেছে। এতে নীতিমালা বহির্ভূতভাবে দেওয়া বাড়তি দুই বোনাসের অর্থ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে আদায় করে সমন্বয়ের ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, ২০২৩ সালের প্রযোজ্য নীতিমালা এবং পরবর্তী ২০২৫ সালের নীতিমালার কোনোটিতেই সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বছরে পাঁচটি উৎসাহ বা পারফরম্যান্স বোনাস দেওয়ার সুযোগ ছিল না। নীতিমালা অনুযায়ী, মূল্যায়নের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ তিনটি বোনাস দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
কিন্তু ২০২৩ সালের পারফরম্যান্সের জন্য সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাঁচটি উৎসাহ বোনাস দেওয়া হয়। বোনাস দেওয়ার পর বিষয়টি অনুমোদনের জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে আবেদন করে ব্যাংকটি। আবেদনে অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য ক্ষমাও চাওয়া হয়। তবে নিজেদের জারি করা নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ওই আবেদন অনুমোদন করেনি।
এরপর বাড়তি দুই বোনাসের অর্থ ফেরত নেওয়ার উদ্যোগ নিতে বলা হলেও দীর্ঘ সময়েও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন এমডি ও সিইও আফজাল করিমকে চিঠি দিয়ে বাড়তি দুই বোনাসের অর্থ ফেরত নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু প্রায় দেড় বছর পরও অর্থ ফেরত এনে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এক বোনাস প্রায় ৬০ কোটি টাকা
সোনালী ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকটিতে প্রায় ২১ হাজার ৫০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী বোনাস পেয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী প্রাপ্য তিনটির পাশাপাশি তাদের বাড়তি আরও দুটি উৎসাহ বোনাস দেওয়া হয়। একটি বোনাসের অর্থ মূলত এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ।
ব্যাংকটির শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা জানান, প্রতিটি বোনাসের আকার প্রায় ৬০ কোটি টাকা। সে হিসাবে নীতিমালা বহির্ভূত দুটি বোনাসে মোট প্রায় ১২০ কোটি টাকা দেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের বর্তমান এমডি ও সিইও শওকত আলী খানের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তাকে ক্ষুদে বার্তাও পাঠানো হয়েছে। তবে তিনি কোনো জবাব দেননি। এ বিষয়ে জানতে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গেলেও তিনি প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।
বোনাস নিয়ে আন্দোলন, চেয়ারম্যানের পদত্যাগ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুই দিন পর ৭ আগস্ট সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন এমডি ও সিইও আফজাল করিমকে অবরুদ্ধ করেন ব্যাংকটির কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাদের দাবি ছিল, বছরে পাঁচটি উৎসাহ বোনাস দিতে হবে।
এর আগে ২০২৩ সালেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাপের মুখে সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান জিয়াউল হাসান সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ পাঁচটি উৎসাহ বোনাস অনুমোদন করে। পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে নিরীক্ষা আপত্তি ওঠে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকও আপত্তি জানায়।
পাঁচটি বোনাসের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত থাকলে একপর্যায়ে ২০২৪ সালের ২০ আগস্ট চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন জিয়াউল হাসান সিদ্দিকী।
এরপর ২৮ আগস্ট সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন সাবেক অর্থসচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তিনিও বিষয়টি সুরাহার চেষ্টা করেন। তবে শেষ পর্যন্ত বাড়তি দুই বোনাসের অর্থ ফেরত আনার বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়নি। এ বিষয়ে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে মুসলিম চৌধুরী কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
পাঁচ সূচকে মূল্যায়ন, সর্বোচ্চ তিন বোনাস
রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে উৎসাহ বোনাস নিয়ে বিতর্কের মধ্যে পরবর্তী সময়ে নতুন নির্দেশিকা জারি করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ২০২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত নির্দেশিকাটি রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক, তফসিলি ও অ-তফসিলি বিশেষায়িত ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, সোনালীসহ ছয় রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসাহ বোনাস দেওয়ার ক্ষেত্রে পাঁচটি সূচক মূল্যায়ন করতে হবে। সূচকগুলো হলো চলতি মূলধনের ওপর নিট মুনাফার হার, আমানতের পরিমাণ বৃদ্ধির হার, ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ বৃদ্ধির হার, শ্রেণিকৃত ঋণ থেকে নগদ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে আদায়ের হার এবং অবলোপনকৃত ঋণ থেকে নগদ আদায়ের হার।
এর মধ্যে চলতি মূলধনের ওপর নিট মুনাফার হারে সর্বোচ্চ নম্বর নির্ধারিত। এসব সূচকে অর্জিত নম্বরের ভিত্তিতে বোনাসের সংখ্যা নির্ধারিত হয়। সর্বোচ্চ যোগ্যতা অর্জনকারীরা তিনটি পর্যন্ত উৎসাহ বোনাস পেতে পারেন। নম্বর কম হলে বোনাসের সংখ্যাও কমে আসে। আর নির্ধারিত মানের নিচে থাকলে বোনাস না দেওয়ার বিধান রয়েছে।
ফলে ২০২৩ সালের পারফরম্যান্সের জন্য সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেওয়া পাঁচটি উৎসাহ বোনাসের মধ্যে বাড়তি দুইটির অর্থ ফেরত নেওয়ার নির্দেশনা এখনো কার্যকর রয়েছে। দুই বছর ধরে ঝুলে থাকা এই অর্থ আদায় ও সমন্বয়ের বিষয়ে এবার নতুন করে তাগাদা দিয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।