চলতি বছরে দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায়, আর সবচেয়ে কম মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে সিলেট ও রংপুর বিভাগে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক ড্যাশবোর্ড থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এই ড্যাশবোর্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ডিএসসিসি।
ড্যাশবোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডিএসসিসি এলাকায় সবচেয়ে বেশি ৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর বিপরীতে রংপুর ও সিলেট বিভাগে সবচেয়ে কম ১ জন করে মারা গেছেন।
অন্যান্য অঞ্চলের মধ্যে খুলনায় ২৭ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) ১৮ জন, ময়মনসিংহে ১৫ জন, বরিশাল ও চট্টগ্রামে ১২ জন করে, ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে ৯ জন এবং রাজশাহী বিভাগে ৬ জন ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন।
আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জানুয়ারি থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গুতে মোট ১৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে নারী ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং পুরুষ ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ। একই সময়ে মোট ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে ৫১ হাজার ৮৩৭ জনের। মোট আক্রান্তের মধ্যে পুরুষ ৬২ দশমিক ৪ শতাংশ এবং নারী ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ।
মাসভিত্তিক শনাক্তের চিত্র
চলতি বছরে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে আগস্ট মাসে, যার সংখ্যা ২০ হাজার ৫৩৬। তবে সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ১৩ দিনেই ১৫ হাজার ৯৯১ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, চলতি সেপ্টেম্বরে আক্রান্তের সংখ্যা আগস্টের রেকর্ড পার হয়ে যাবে।
বছরের অন্য মাসগুলোর মধ্যে জুলাইয়ে ৯ হাজার ২০৬ জন, জুনে ২ হাজার ৯০৭ জন, জানুয়ারিতে ১ হাজার ৮১ জন, মে মাসে ৭১ ৪ জন, এপ্রিলে ৬৪০ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪০৯ জন এবং মার্চে ৩৫৩ জন রোগী শনাক্ত হয়।
সেপ্টেম্বরে মৃত্যুর হার সর্বোচ্চ
চলতি বছরের মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসেই সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গ রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এই মাসের প্রথম ১৩ দিনেই মারা গেছেন ৫২ জন, যেখানে আগস্টের পুরো মাসে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৪৩। এছাড়া জুলাইতে ৩৬ জন, জুনে ১৩ জন, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ২ জন করে এবং মে মাসে ১ জনের মৃত্যু হয়।
অধিদপ্তরের ড্যাশবোর্ড নিয়ে প্রশ্ন ডিএসসিসির
ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান চরচাকে বলেন, ‘‘ডেঙ্গুতে আমাদের দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ভেরিফায়েড মৃত্যু সংখ্যা হলো ১২ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যে ড্যাশবোর্ড আছে, ওই ড্যাশবোর্ডে ডিএনএসসি ও ডিএসএসসি লেখা থাকে কিন্তু ঠিকানাটা আইডেন্টিফাই করতে গেলে দেখবেন, ঠিকানা থাকে মিরপুর, মোহাম্মদপুর এমন করে লেখা। ওগুলো কিন্তু দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে পড়েনি। উত্তর সিটিতে পড়েছে।”
জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান বলেন, ‘‘এটা আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে বারবার বলেছি, মিটিং গেলেই আমিও বলি। কিন্তু এটা ঠিক হচ্ছে না।”
ভেরিফায়েড ১২ জন নিয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘‘ভেরিফায়েড মানে হল, এরা আসলেই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বাসিন্দা।’’ তিনি বলেন, বাকিরা হয়তো ঢাকার বাইরে থেকে এসেছে, কোন আত্মীয় বাসায় এসেছিল। ওখান থেকে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। যেমন, অসুস্থতার জন্য মুগদার কোনো আত্মীয়র বাসা থেকে মুগদা মেডিকেলে এসেছে, আবার কেউ যাত্রাবাড়ীর আত্মীয়র বাসা থেকে ঢাকা মেডিকেলে এসেছে।
পিক সময়ের আশঙ্কা ও সরকারি প্রস্তুতি
বিশেষজ্ঞদের মতে, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে। গত ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত জানান, ডেঙ্গু বাড়তে শুরু করেছে এবং সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ ও অক্টোবরের শুরুর দিকে ডেঙ্গুর ‘পিক’ সময় আসতে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারের প্রধান দুটি লক্ষ্য হলো আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার কমিয়ে আনা। ইতোমধ্যে দেশের প্রায় তিন হাজার চিকিৎসককে ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনার ওপর রিফ্রেশার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং জেলা-উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলবে।
প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গুর নির্ধারিত শয্যা চালু করা হয়েছে এবং রোগীর চাপ বাড়লে শয্যা পুনর্বিন্যাস করা হবে। একই সাথে বেসরকারি হাসপাতালগুলোকেও প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানানো হয়।
এদিকে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় গত শনিবার থেকে সারা দেশে তিন মাসব্যাপী বিশেষ অভিযান শুরু করেছে সরকার। জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজা থেকে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় ডিএসসিসির উদ্যোগ
ডিএসসিসি দাবি করছে তাদের ভেরিফায়েড মৃত্যুর সংখ্যা ১২। তবে এই সংখ্যা নিয়েও ডিএসসিসি সন্তোষজনক অবস্থায় নেই। ডেঙ্গু মোকাবিলায় নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান।
ডিএসসিসির এই কমর্কর্তা দাবি করেন, ‘‘ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১০টি অঞ্চল আছে, ৭৫টা ওয়ার্ড। ১০টি অঞ্চলে ১০টি মনিটরিং টিম আছে। তারা সবাই ভোরবেলা পরিচ্ছন্নতা এবং সাথে মশকনিধন কার্যক্রম সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে, যা চলমান। এছাড়াও আমরা স্পেশাল প্রোগ্রাম হিসেবে স্কুলে স্কুলে প্রোগ্রাম করছি।”
ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান বলেন, ‘‘যদি ডেঙ্গু রোগী দক্ষিণ সিটির মধ্যে হয়ে থাকে, তার বাসার চারপাশে ৪০০ গজ পর্যন্ত আমরা প্রোগ্রাম করে দেই। মশকের লোকগুলো সকাল-বিকেল দুইবেলা করে কাজ করছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজও সমন্বিতভাবে হচ্ছে। আমরা মসজিদে মসজিদে লিফলেট দিয়ে দিচ্ছি, সে লিফলেটগুলো মুসল্লিদেরকে পড়ে শোনানো হচ্ছে।”