নৈতিক স্খলনের দায়ে দল থেকে বহিষ্কৃত সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) আসন থেকে নির্বাচিত জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে বিতর্ক শেষই হচ্ছে না। কয়েক দিন আগে তাকে সংসদীয় কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদে বিতর্ক জড়ান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তবে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে চরচাকে জানানো হয়েছে, সংসদ সদস্য থাকলেও গাজী নজরুলকে আর দলে ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
জামায়াত জানিয়েছে, গাজী নজরুল ইসলামকে সংসদীয় কমিটিতে রাখা হয় সরকারি দলের পক্ষ থেকে। তখন কার সুপারিশে তাকে ওই পদে রাখা হলো, এ নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে বিতর্ক হয়। একটি সংসদীয় কমিটিতে তাকে রাখা নিয়ে আপত্তি জানায় বিরোধী দল। পরে ওই কমিটি থেকে গাজী নজরুল ইসলামের নাম বাদ দেওয়া হয়।
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় গত ২২ জুলাই গাজী নজরুলকে দল থেকে বহিষ্কার করে জামায়াত। স্পিকার ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অবহিত করে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে চিঠিও দেওয়া হয় দলের পক্ষ থেকে। তবে এখন পর্যন্ত স্পিকার কোনো সিদ্ধান্ত দেননি। তিনি এখনো সংসদ সদস্য আছেন।
গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ও দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন চরচাকে বলেন, ‘‘তিনি এখন আমাদের সঙ্গে নেই। এটা নির্বাচন কমিশনের বিষয়। এখানে এখন আমাদের মতামতের বিষয় নেই। আমরা আগেই তো বলে দিয়েছি। আমরা তাকে বহিষ্কার করেছি, আমরা স্পিকারকে জানিয়েছি, নির্বাচন কমিশনে জানিয়েছি। আমাদের কাজ শেষ।”
গাজী নজরুলকে দল থেকে বহিষ্কারের পরেও সংসদ সদস্য পদ থাকায় সংসদে বিতর্ক হল কি না—জানতে চাইলে সাইফুল আলম খান বলেন, ‘‘সংসদে এ নিয়ে কোনো বিতর্ক হয়নি। সংসদীয় কমিটিতে রাখার ক্ষেত্রে আমরা তো তার নাম দেইনি। তখন প্রশ্ন তৈরি হয়, কীভাবে নাম এল? তখন তারা (সরকারি দল) আমাদের কথায় আশ্বস্ত হয়েছেন। এবং নাম প্রত্যাহার করেছেন।”
সংসদ সদস্য পদ নিয়ে সংবিধানে যা আছে
সংবিধানের ৬৭ অনুচ্ছেদে সংসদের আসন শূন্য হওয়া নিয়ে বলা আছে, কোনো সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হবে, যদি তার নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠক থেকে ৯০ দিনের মধ্যে স্পিকারকে না জানিয়ে তিনি শপথ নেওয়া থেকে বিরত থাকেন; সংসদের অনুমতি না নিয়ে ৯০ বৈঠক-দিবস অনুপস্থিত থাকেন; সংসদ ভেঙে যায়; সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের (২) দফার অধীন অযোগ্য হয়ে যান; অথবা ৭০ অনুচ্ছেদে বর্ণিত পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। সংবিধানে বলা আছে, কোনো সংসদ সদস্য স্পিকারের কাছে সইসহ চিঠি দিয়ে নিজের পদ ত্যাগ করলে তার আসন শূন্য হবে।
কিন্তু দল থেকে বহিষ্কৃত গাজী নজরুল এখনো সংসদ সদস্য রয়েছেন। কারণ দল থেকে বহিষ্কার করলে কী হবে, সে বিষয়ে সংবিধানে কিছু বলা নেই। তবে এর আগে এরকম ক্ষেত্রে সদস্য পদ না যাওয়ার নজির রয়েছে।
এলাকায় যান না নজরুল
গাজী নজরুলের নিজ সংসদীয় এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর থেকে তিনি তার নির্বাচনী এলাকায় যাননি। কোনো কর্মসূচিতেও অংশ নেননি। বরং তিনি ঢাকাতেই অবস্থান করছেন।
এ বিষয়ে গাজী নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ট এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, ‘‘তিনি তো এলাকায় নেই। ঢাকাতেই অবস্থান করছেন। ওই ঘটনার পর থেকে এলাকায় আসেননি, সংসদেও যান না। তিনি পরিস্থিতি দেখছেন, পরিস্থিতি শিথিল হলে আস্তে আস্তে যাবেন (সংসদে)। আর এলাকাতেও আসবেন। আর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া তো উনার হাতে নেই। উনি সব জায়গা থেকে একটু হাইডেই আছেন। উনাকে যদি বিএনপি সমর্থন দেয়, তখন তিনি এলাকায় ঘুরতে পারবেন বলে আমি মনে করি। তবে উনি নিজে ‘ফিরব ফিরব’ এমনটা বলেন।”
এর আগে, অসুস্থতার কারণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটাভুটিতে অংশ নেননি বলে চরচাকে জানিয়েছিলেন গাজী নজরুল ইসলাম। ওই দিন গাজী নজরুল বলেছিলেন, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি ভোট দেননি। তিনি ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন বলে জানিয়েছিলেন।
জামায়াতের সুপারিশে একটি সংসদীয় কমিটি থেকে গাজী নজরুলের নাম বাদ দিলেও প্রশ্ন উঠছে, তিনি সংসদ সদস্যের পদে বহাল থাকছেন কি না? যদিও নিজে পদত্যাগ না করলে পদ যাবে না, সেক্ষেত্রে তবে তিনি কী করবেন?
সংসদ সদস্য পদ নিয়ে কথা বলতে গাজী নজরুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, “আমি আছি তো, আবার কী বলব? আল্লাহর রহমতে আছি। এবং থাকব ইনশাল্লাহ। কোনো কথা নেই।”
সংসদে বিতর্কে যা উঠে এল
গাজী নজরুলের বিষয়ে সংসদে বিতর্কের দিন সিইসি ও স্পিকারকে চিঠি দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে বলেন, দল থেকে বহিষ্কার করা হলে সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যপদ শূন্য হয় না। নিজ থেকে পদত্যাগ না করলে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বিষয় আসে না।
ওই দিন বিরোধী দলকে ‘বুদ্ধি’ দিচ্ছেন জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “আপনারা যদি সত্যি সত্যিই চান তার (গাজী নজরুল) আসনটি শূন্য হোক, তাহলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলের পক্ষে ভোট দেয় নাই এবং ভোটদানে বিরত ছিলেন, সেই জায়গায় ৭০ অনুচ্ছেদ কিন্তু আসে। এখন সেইটা কগনিজেন্সে (আমলে) নিয়ে যদি আপনারা স্পিকারের মনোযোগ আকর্ষণ করেন, চিঠি দেন বা নির্বাচন কমিশনে দেন, সেই হিসেবে বিধি মোতাবেক সাংবিধানিকভাবে সহযোগিতা করতে পারি। এই বুদ্ধিটা বিনা পয়সায় দিলাম।”
এরপর বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, “গ্রামে একটা কথা চালু আছে, কোনো দুর্বল মানুষের ওপর প্রতিশোধ নিতে হলে, তারে মেম্বার ইলেকশনে দাঁড় করায়ে দেওয়া। আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাঝেমধ্যে আমাদের এ রকম কিছু টিপস দেন, আমরা উপভোগ করি।”
বিরোধীদলীয় নেতা আরও বলেন, “আমরা এখন তাকে (গাজী নজরুল ইসলাম) ফ্লোর ক্রসিংয়ের কথা বলব কেন? আমরা তো তাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছি। আমরা তো বলতে পারি না, তিনি আমাদের দলের সদস্য হয়ে ফ্লোর ক্রস করেছেন, দলের সিদ্ধান্ত ভঙ্গ করেছেন।” কমিটি পুনর্গঠনের আহ্বান জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা জানান, নৈতিক কারণে বহিষ্কার করার বিষয়টি তাদের দল চিঠি দিয়ে জানিয়েছে। সংসদের কোনো কমিটিতে তাকে না রাখাটা নৈতিকতার দিক থেকে উত্তম।
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘‘বিরোধী দলের অবস্থান থেকে বোঝা যাচ্ছে, তারা তার সংসদ সদস্য পদ বহাল রাখতে চান কিন্তু কমিটিতে রাখতে চান না। বিরোধীদলীয় নেতার অনুরোধে ইচ্ছা করলে গাজী নজরুল ইসলামকে কমিটি থেকে বাদ দেওয়া যায়, কমিটি পুনর্গঠন আবার করা যায়। তাকে বাদ দেওয়া হলে বিরোধীদলীয় নেতার প্রতি সম্মান দেওয়া হবে। কিন্তু আমরা বুঝে গেলাম তার (নজরুল) সদস্য পদ শূন্য করার পক্ষে তিনি নন।”
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংসদে কেউ দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে বা যে দল থেকে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন, সেই দল থেকে পদত্যাগ করলে, তার সংসদ সদস্যপদ বাতিল হবে। কিন্তু দল থেকে বহিষ্কৃত হলে কী হবে, সেটি স্পষ্ট নয়।
যা বলেছে নির্বাচন কমিশন
গত ২৩ জুলাই গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ বাতিলের সিদ্ধান্ত সংসদ ও স্পিকারের এখতিয়ার বলে মন্তব্য করেন নির্বাচন কমিশনার (ইসি) আব্দুর রহমানেল মাছউদ। গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ বাতিল হওয়া নিয়ে প্রশ্নে রহমানেল বলেন, “পার্লামেন্ট থেকে যদি বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রেরণ করা হয়, তাহলে নির্বাচন কমিশন বিষয়টি আমলে নেবে এবং যথাযথ তদন্ত বা শুনানির পর বিষয়টি নিষ্পত্তি করবে।”
দল থেকে বহিষ্কার হলে সদস্য পদ যায় কি না জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার বলেন, “পার্টি থেকে বহিষ্কার করলে এমপি পদ যায় কি না, এটা খুবই বিতর্কিত বিষয়। আমরা বলতে চাচ্ছি, যদি পার্টি থেকে বহিষ্কারের বিষয় থাকে, তাহলে সেটিও পার্লামেন্ট থেকে রেফারেন্স আকারে আসতে হবে–শাসনতন্ত্র বা আমাদের সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী।”বর্তমান পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এখনো ‘এমপি আছেন’ উল্লেখ করে রহমানেল মাছউদ বলেন, “তিনি এমপি আছেন–এটা আপাতত সত্য। আজকে তিনি এমপি আছেনই। নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তিনি এমপি থাকবেন। তবে তিনি যদি পদত্যাগ করেন, সেটা কিন্তু আমাদের কাছে আসবে না, নির্বাচন কমিশনে আসবে না। সেটা আর্টিকল ৬৭ অনুযায়ী পার্লামেন্টের বিষয়।”
গাজী নজরুলকে কি দলে ফেরাবে জামায়াত?
গাজী নজরুল ইসলামের আর দলে ফেরার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ও দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন। চরচাকে বলেন, ‘‘আমরা তো উনাকে বহিষ্কার করে দিয়েছি। উনাকে আর দলে ফেরাব কী করে?”
সাইফুল আলম খান বলেন, ‘‘উনি যদি সংসদ সদস্য নাও হইত, জামায়াতে ইসলামীর এটা নরমাল নিয়ম। কারণ এটা মানুষের দল। আমাদের মধ্যে লোকেরা তো ভুল করতে পারে। সেই ভুলভ্রান্তি করার জন্য জামায়াত…যেটাকে বলা হয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা, সেটাই তো আমরা নিয়েছি। এটা কিন্তু শাস্তি না। আমরা কি উনাকে শাস্তি দিতে পারি? সরকারের আইন আছে, সে অনুসারে…আমরা শুধু সাংগঠনিক পদক্ষেপ নিয়েছি।”
এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর আরেক সংসদ সদস্য ব্যারিষ্টার মীর আহমদ বিন কাসেম চরচাকে বলেন, ‘‘উনার বিষয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত আগের মতই অপরিবর্তিত আছে। যেহেতু নৈতিক স্খলনের কারণে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে, তাকে দলে ফেরানোর আর সুযোগ নেই।”
অতীতের নজির কী বলছে
২০১৪ সালে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীকে দল থকে বহিষ্কার করে আওয়ামী লীগ। তবে তখনই তার সংসদ সদস্য পদ যায়নি। পরে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের আমলে অষ্টম জাতীয় সংসদে বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্য আবু হেনাকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তার সংসদ সদস্য থাকবে কি না–বিষয়টি নিয়ে এই প্রশ্ন উঠলে তখন সংবিধানের ৭০ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আবু হেনার সদস্য পদ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তৎকালীন স্পিকার প্রয়াত জমির উদ্দিন সরকার। দল থেকে বহিষ্কার হলেও তার সদস্যপদ বাতিল হয়নি।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আমলে নবম জাতীয় সংসদেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে নির্বাচিত এইচ এম গোলাম রেজাকে তার দল জাতীয় পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হলেও তার সংসদ সদস্য পদ বহাল ছিল।