মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও সংযমের আহ্বান জানিয়ে একটি যৌথ ঘোষণা গ্রহণ করেছে ব্রিকস জোটভুক্ত দেশগুলো। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্য, সরবরাহব্যবস্থা ও জ্বালানির নির্বিঘ্ন প্রবাহ বজায় রাখতে একসঙ্গে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে তারা। খবর কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার।
গতকাল শনিবার নয়াদিল্লিতে শুরু হয়েছে দুই দিনের ব্রিকস সম্মেলন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্মেলনে সভাপতিত্ব করছেন। এতে অংশ নিচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ অন্য নেতারা।
১১ সদস্যের এই জোটের সভাপতির দায়িত্ব এমন এক সময়ে ভারতের হাতে এসেছে, যখন মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের যুদ্ধ জ্বালানি ও নৌপরিবহনব্যবস্থায় সংকট তৈরি করেছে। পাশাপাশি শুল্কের চাপ এবং এসব সংকট মোকাবিলার পদ্ধতি নিয়ে জোটের সদস্যদের মধ্যেও মতপার্থক্য রয়েছে।
শনিবারের ঘোষণায় মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা বৃদ্ধিতে গভীর উদ্বেগ জানানো হয়।
এতে সর্বোচ্চ সংযমের আহ্বান জানিয়ে বেসামরিক অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনায় ইচ্ছাকৃত হামলার বিরুদ্ধে সতর্ক করা হয়েছে। ফিলিস্তিন বিষয়ে নিজেদের অবস্থানও পুনর্ব্যক্ত করেছে ব্রিকস। ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা এবং দখলকৃত ভূখণ্ডের ভৌগোলিক ও জনসংখ্যাগত কাঠামো পরিবর্তনের বিরোধিতা করেছে জোটটি
এ ছাড়া গাজায় ইসরায়েলের সহিংসতা বন্ধ, জাতিসংঘের ত্রাণ ও কর্মসংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর প্রতি সমর্থন এবং ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্যপদ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
নয়াদিল্লিতে রাষ্ট্রপ্রধানদের ব্রিকস অর্থনৈতিক সম্মেলনে দেওয়া ভাষণে পেজেশকিয়ান বলেন, জাতীয় মুদ্রায় লেনদেন চালুর পাশাপাশি মুদ্রার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও পারস্পরিক নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। তিনি বলেন, সীমিতসংখ্যক মুদ্রার ওপর নির্ভরশীল বর্তমান আর্থিক ব্যবস্থা ‘রাজনৈতিক অভিঘাতের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ’ হয়ে পড়েছে।
পেজেশকিয়ান আরও বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসন আবারও দেখিয়ে দিয়েছে যে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জাতীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। এর প্রভাব আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, এমনকি বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।”
এদিকে যৌথ ঘোষণায় পশ্চিমা দেশগুলোর বাইরে আন্তসীমান্ত লেনদেনের ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সহযোগিতা এবং একতরফা নিষেধাজ্ঞা ও শুল্কের বিরোধিতার বিষয়ও উঠে এসেছে।
শনিবার সকালে নয়াদিল্লিতে পৌঁছান চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং। গত সাত বছরের মধ্যে এটি তার ভারত প্রথম সফর। দুই দেশ সম্পর্কের উত্তেজনা কমিয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
সি চিনপিং বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত বিশ্বের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতির পরিবর্তনের মধ্যে যুদ্ধটি ওই অঞ্চলের মানুষের জন্য গুরুতর ক্ষতি ডেকে এনেছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার বরাত দিয়ে আল জাজিরা এ খবর জানায়।
শুক্রবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেন মোদি। বৈঠকে দুই নেতা সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়ে একমত হন। একই দিন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গেও বৈঠক করেন মোদি। সেখানে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা এবং জাহাজের নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্থান টাইমস জানায়, নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় পুতিন বলেন, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক ব্রিকসের দেশগুলোতে বাস করে। বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪০ শতাংশও এই জোটের দেশগুলোর দখলে। বিশ্বের মোট ভূখণ্ডেরও একটি বড় অংশ ব্রিকসের অন্তর্ভুক্ত।
পুতিন বহুপক্ষীয় সহযোগিতা আরও জোরদার করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর আরও বেশি প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার কথা বলেন। তিনি শুল্ক, নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপেরও সমালোচনা করেন। পাশাপাশি ব্রিকসের দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়িয়ে আরও বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
সম্মেলনে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা, মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি, ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ ও ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তোও অংশ নিচ্ছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিনিধি হিসেবে আবুধাবির যুবরাজ শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান অংশ নিয়েছেন।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার পরিবর্তে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাউরো ভিয়েইরা সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার নামের আদ্যক্ষর নিয়ে ব্রিকস নামটি গঠিত। পশ্চিমা দেশগুলোর প্রভাবাধীন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর লক্ষ্যে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জোট হিসেবে ২০০৬ সালে ব্রিকস গঠিত হয়। পরে এতে আরও কয়েকটি দেশ যুক্ত হয়েছে।
সম্মেলনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা এবং জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও উপস্থিত রয়েছেন।
একটি রুদ্ধদ্বার অধিবেশনে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের স্থিতিশীলতা ও স্বাধীনতা বজায় রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি এবং এর ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ ও সরবরাহব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব নিরাপত্তা ও উন্নয়নের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে স্পষ্ট করে তুলেছে।