ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আজ শনিবার শুরু হয়েছে অষ্টাদশ ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। দুই দিনের এ সম্মেলনে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা যোগ দিচ্ছেন।
এই জোটকে পশ্চিমা ধনী দেশগুলোর নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক জোটগুলোর বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। সম্মেলনে যোগ দিতে শুক্রবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস নয়াদিল্লিতে পৌঁছান। তারা মোদির সঙ্গে আলাদা বৈঠকও করেন।
সাত বছর পর ভারত সফরে আসা চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংও শনিবার সকালে নয়াদিল্লিতে পৌঁছেছেন।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, এমন এক সময়ে এবারের সম্মেলন হচ্ছে, যখন বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের অস্থিরতা চলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ, ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
তবে ব্রিকসের ভেতরেও নানা মতপার্থক্য রয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে–এবার নিজেদের মতপার্থক্য কীভাবে কাটিয়ে উঠবে ব্রিকস? আর এবারের সম্মেলনে আলোচনার বিষয়গুলোই বা কী?
ব্রিকস কী?
পশ্চিমা শক্তির প্রভাবাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর লক্ষ্যে বড় উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর একটি জোট হিসেবে ২০০৯ সালে ব্রিকস গঠিত হয়। প্রথম দিকে এর সদস্য ছিল ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন। এক বছর পর দক্ষিণ আফ্রিকা এই জোটে যোগ দেয়।
২০২৩ সালে ব্রিকসের সদস্য হওয়ার জন্য মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এসব দেশ আগে ব্রিকসে যোগ দেওয়ার আবেদন করেছিল।
বর্তমানে ব্রিকসের সদস্য ১১টি দেশ। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৯ শতাংশ এবং বিশ্ব অর্থনীতির মোট উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ এই জোটের দেশগুলোর দখলে।
সম্মেলনে কারা অংশ নিচ্ছে?
এবারের সম্মেলনে সদস্য দেশগুলোর বেশির ভাগই রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানদের পাঠিয়েছে। আয়োজক দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন।
আজ শুরু হচ্ছে ব্রিকস সম্মেলন। ছবি: রয়টার্স
তবে প্রতিষ্ঠাতা পাঁচ দেশের মধ্যে একমাত্র ব্রাজিল তাদের প্রেসিডেন্টকে পাঠায়নি। স্থানীয় নির্বাচনের ব্যস্ততার কারণে প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা সম্মেলনে যোগ দিতে পারছেন না। দেশটির প্রতিনিধিত্ব করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাউরো ভিয়েরা।
নতুন সদস্যদের মধ্যে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি, ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ এবং ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোয়ো সুবিয়ান্তো অংশ নিচ্ছেন।
সৌদি আরবের প্রতিনিধিত্ব করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিনিধিত্ব করছেন আবুধাবির যুবরাজ শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান।
এ ছাড়া মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম, ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র, ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রী লে মিন হুং, কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভসহ আরও কয়েকটি দেশের শীর্ষ নেতারাও সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন।
এবারের এজেন্ডা কী?
ব্রিকসের মূল লক্ষ্য হলো, পশ্চিমা দেশগুলোর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব কমানো, বিশেষ করে অর্থনীতির ক্ষেত্রে।
এবারের শীর্ষ সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ‘বিল্ডিং ফর রেজিলিয়েন্স, ইনোভেশন, কোঅপারেশন অ্যান্ড সাস্টেইনেবিলিটি’। যার অর্থ নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া বা ঘুরে দাঁড়ানো এবং উদ্ভাবন ও টেকসই উন্নয়নের জন্য সহযোগিতা বাড়ানো।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের সম্মেলনে সদস্য দেশগুলোর অর্থনীতি শক্তিশালী করার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। এর মধ্যে রয়েছে বাণিজ্য বাড়ানো, জ্বালানি সহযোগিতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির জ্ঞান বিনিময়।
ফরাসি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ন্যাটিক্সিসের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ আলিসিয়া গার্সিয়া-হেরেরো বলেন, পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া ও ইরানের মতো ব্রিকস সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে কীভাবে আন্তর্জাতিকভাবে অর্থ লেনদেন করা যায়, তা নিয়েও নেতারা আলোচনা করবেন। তবে তারা ডলারের বিকল্প তৈরি করার চেষ্টা করবেন না বলে মনে করেন তিনি।
ক্রেমলিন জানিয়েছে, নয়াদিল্লিতে এবারের সম্মেলনে রাশিয়া ব্রিকসের অন্য সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে ডিজিটাল মুদ্রায় বাণিজ্যের অর্থ পরিশোধের বিষয়ে আলোচনা করবে।
বেঙ্গালুরুভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান তক্ষশীলা ইনস্টিটিউশনের ভূরাজনীতি কর্মসূচির প্রধান মনোজ কেওয়ালরামানি বলেন, এসব আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্বজুড়ে চলমান সংঘাতের মধ্যে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা এবং ঝুঁকি কমাতে এসব উদ্যোগ ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ছাড়া এবারের সম্মেলন হচ্ছে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর ছয় মাসেরও বেশি সময় পর। মে মাসে ব্রিকসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে সদস্য দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের যৌথ নিন্দা জানাতে পারেনি।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সম্মেলনে এই যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এটি তার প্রথম ভারত সফর। আট বছর পর এই প্রথম কোনো ইরানি প্রেসিডেন্ট ভারত সফরে এলেন।
হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও জনপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আলেজান্দ্রো রেইয়েস বলেন, ইরান ব্রিকসের সদস্য। তাই ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ বাণিজ্যপথ ও জ্বালানি সরবরাহে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। এর প্রভাব পড়ছে পুরো বিশ্বের অর্থনীতিতে। তবে এই যুদ্ধের কারণে ব্রিকসের সদস্য ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে যে বিরোধ তৈরি হয়েছে, তাতে যুদ্ধ নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরি করা কঠিন হবে বলে মনে করেন তিনি।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে তথ্যমতে, রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধও সম্মেলনে আলোচনায় আসতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রিকস নেতারা কয়েক বছর ধরেই এই যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করছেন। এবার মূলত যুদ্ধকে ঘিরে সদস্য দেশগুলোর নিজ নিজ স্বার্থ কীভাবে একসঙ্গে বিবেচনা করা যায়, সেটিই আলোচনার বিষয় হতে পারে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে রিও ডি জেনেইরোতে অনুষ্ঠিত ব্রিকসের ১৭তম সম্মেলনে দেওয়া যৌথ ঘোষণায় রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে মস্কোর সমালোচনা করেননি ব্রিকস নেতারা। বরং রাশিয়ার ওপর ইউক্রেনের হামলার নিন্দা জানিয়েছিলেন তারা।
কেওয়ালরামানি বলেন, এ বছর ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ব্রিকসের সদস্য দেশগুলো একই ধরনের অবস্থান নিতে পারবে বলে তিনি মনে করেন। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া এখন যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে আলোচনা করছে।
এবারের সম্মেলন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
জার্মান মার্শাল ফান্ডের বিশেষজ্ঞ ইয়ান লেসার বলেন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক এখন আরও খারাপ হচ্ছে। এরই মধ্যে পুতিনকে বিশ্বের দক্ষিণের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক দেখানোর সুযোগ দিচ্ছে ব্রিকস সম্মেলন।
ইয়ান লেসার বলেন, ওয়াশিংটনের অনিশ্চিত বাণিজ্য ও নিরাপত্তা নীতির কারণে অনেক দেশ বিকল্প পথ খুঁজছে। রাশিয়া ও চীন এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের সম্মেলন আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর পরপরই চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতাদের দ্বিতীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সি চিনপিং বৈঠক করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
সম্মেলনের আগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বৈঠক করেন। ছবি: রয়টার্স
চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল ঝৌ বো আল জাজিরাকে বলেন, প্রতিবছরই ব্রিকস নেতারা বৈঠক করেন। তবে এবার সাত বছর পর সি চিনপিংয়ের ভারত সফর বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, চীন ও ভারতের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই সমস্যা চলছে। তাই এই সম্মেলন দুই দেশের নেতাদের নিজেদের মতপার্থক্য কমানোর ভালো সুযোগ তৈরি করেছে।
বড় পরিসরে দেখলে, চলমান যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে এবারের ব্রিকস সম্মেলন বিশ্বব্যবস্থায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলেও মনে করেন এই বিশ্লেষক।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ব্রিকসের সামনে কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর একটি হলো, সদস্য দেশগুলো কীভাবে ধীরে ধীরে ডলারের পরিবর্তে অন্য মুদ্রায় বাণিজ্য করতে পারে। তবে দেশগুলোর অর্থনীতির মধ্যে বড় পার্থক্য থাকায় এখনই এটি বাস্তবায়ন করা কঠিন।
আরেকটি বড় বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্রিকস কীভাবে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ, জোটের কয়েকটি শক্তিশালী সদস্যই বর্তমানে বিভিন্ন যুদ্ধে জড়িত। তাই সব সদস্য দেশের কাছে গ্রহণযোগ্য অবস্থান নিয়ে এসব যুদ্ধের বিষয়ে কথা বলা কঠিন হবে।