নাম রাজাউল্লাহ, ডানহাতি পেস বোলার, জন্ম পেশায়োরের মারদান গ্রামে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চতুর্থ টেস্টের আগে দেওয়ার মতো এতটুকু পরিচয়ই ছিল পাকিস্তানের এই তরুণ পেসারের। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলবেন, এক সপ্তাহ আগেও বিষয়টি ছিল তার কল্পনার বাইরে। সেই রাজাউল্লাহকে তার গ্রাম থেকে তুলে এনে সোজা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একটা টেস্ট ম্যাচ খেলতে নামিয়ে দিয়েছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)। ফলাফল? ব্যাটে-বলে স্বপ্নের অভিষেক, যা কেবল পাকিস্তানের ক্রিকেটেই সম্ভব।
ইংল্যান্ডের কাছে দ্বিতীয় টেস্ট হারের পরই রাজাউল্লাহর সন্ধানে নেমেছিল পিসিবি। কিন্তু তিনি এতটাই দুর্গম অঞ্চলে থাকেন যে, ফোন কলে তাকে পাওয়া যায়নি আর। তৃতীয় টেস্টে তাকে নিতে চাইলেও তাই সেটা আর সম্ভব হয়নি। অগত্যা নির্বাচকদের একজনকে পাঠানো হয় তার গ্রামে। সেখানে গিয়ে অনেক খোঁজাখুঁজির পর যখন রাজাউল্লাহকে পাওয়া যায়, তখন তিনি বন্ধুদের সঙ্গে টেপ টেনিস ক্রিকেট খেলায় ব্যস্ত।
সন্ধান মিললেও ২১ বছর বয়সী এই পেসারকে চতুর্থ টেস্টে খেলানো মোটেও সহজ ছিল না। পাসপোর্টই যে নেই তার। কিন্তু পিসিবি রাজাউল্লাহকে দলে পাওয়ার জন্য এতটাই মরিয়া ছিল যে, তারা জরুরি ভিত্তিতে মাত্র একদিনেই তার পাসপোর্ট এবং ইংল্যান্ডের ভিসার ব্যবস্থা করে ফেলে। কোনো রকম পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই রাজাউল্লাহকে রওনা দিতে হয় ইংল্যান্ডের মাটিতে টেস্ট অভিষেকের জন্য।
ইংল্যান্ডের প্রথম ইনিংসে ৪ উইকেট নিয়েছেন রাজাউল্লাহ। ছবি : পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড
এর আগে মাত্র ৮টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলে রাজাউল্লাহ নিয়েছেন ৩০ উইকেট। ব্যাট হাতে একটা সেঞ্চুরিও আছে। তবে পাকিস্তানের বাস্তবতায় এমন পেসারের দেখা মেলে অলিগলিতেই। তাই তাকে উড়িয়ে এনে অভিষেক করানোর সময় খোদ তার দেশেই ছিল কটাক্ষ। তবে রাজাউল্লাহকে নিয়ে পিসিবির মাতামাতির মূল কারণ তরুণ ওয়াকার ইউনিসের সঙ্গে তার বোলিংয়ের কিছুটা মিল, কিছুটা স্লিঙ্গি অ্যাকশন এবং আগ্রাসী মনোভাব।
ব্যাট হাতে প্রথম ইনিংসে ২ চারে ১১ করার পর বোলিংয়ে এসেই রাজাউল্লাহ চমকে দেন সবাইকে। ঘণ্টায় ১৪৫ কি.মি. গতিতে বল করার পাশাপাশি লাইন-লেন্থ বজায় রাখেন বেশ ভালো। তার স্বীকৃতি হিসেবে ভেতরে প্রবেশ করানো এক ডেলিভারিতে লেগ বিফোরের ফাঁদে ফেলেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক জো রুটকে।
টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রানের মালিক রুটের উইকেট দিয়ে যাত্রা শুরু একজন বোলারের জন্য স্বপ্নের চেয়েও বেশি কিছু। রাজাউল্লাহর জন্যও কি তাই? তার যে এই মঞ্চে, পাকিস্তানের জার্সিতে রুটের বিপক্ষে বোলিং করারই কথা ছিল না। কিন্তু তিনি সেটাই করেছেন, কারণ চিরায়ত পাকিস্তান ক্রিকেটে চূড়ান্ত অস্থিরতার মাঝেই জন্ম নেয় নতুন তারকারা।
ইংলিশ কন্ডিশনে বোলিংয়ের অনভিজ্ঞতা, অভিষেকের রোমাঞ্চের কারণেই কি না, ক্রমেই রাজাউল্লাহ নিজেকে হারিয়ে ফেলেন। ওভারপ্রতি প্রায় সাড়ে ৬ রান গুনেন। ৪ উইকেট নিতে খরচা করেন ১৪৮ রান। গতিও দ্বিতীয় দিনে কমে নেমে হয়ে যায় ঘণ্টায় ১৩৬-১৩৭ কি.মি.।
ইংল্যান্ডের প্রথম ইনিংসে রানের পাহাড় দেখে অনেকে প্রায় ধরেই নিয়েছিলেন, রাজাউল্লাহ দ্বিতীয় ইনিংসে আর বোলিং করতে পারবেন না। তবে ব্যাট হাতে সেই দায়িত্বটাও নিজের কাঁধেই নিয়ে নেন তিনি। পাকিস্তানের দুই সাবেক অলরাউন্ডার আব্দুল রাজ্জাক আর শহিদ আফ্রিদিকে মনে করিয়ে দেন সজোরে বল হাঁকানোর দক্ষতায়।
ছবি : পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড
গ্রামের টেপ টেনিস ক্রিকেটের মতো বল বেধড়ক পেটান জোফরা আরচার, গাস আটকিনসন, অলি রবিনসদের। নিজের অভিষেক ম্যাচ বলেই হয়তো প্রতিপক্ষের বোলারদের পাত্তা না দিয়ে মনের আনন্দে কেবল ব্যাট চালিয়েছেন। তাতে ঐতিহাসিক এক সেঞ্চুরির প্রায় কাছাকাছি চলেও গিয়েছিলেন।
রাজাউল্লাহকে শেষ পর্যন্ত থামতে হয়েছে ৮১ রানে। ৬৩ বলে ৪টি চার ও ৯ ছক্কার ইনিংসটি অবশ্য শতরানের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। এতোটাই জোরে বল হাঁকিয়েছেন যে, দুটি ব্যাট ভেঙেই গেছে।
অথচ পাকিস্তান ক্রিকেটের নাটকীয় সব রদবদল না হলে তার ইংল্যান্ডেই থাকার কথা ছিল না। তবে এটাই তো পাকিস্তান, যেখানে চূড়ান্ত অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলার মধ্যেই উঠে আসেন আগামীর তারকারা।
রাজাউল্লাহ কতদূর যাবেন, সেটা সময়ই বলে দেবে। তবে পাকিস্তান ক্রিকেটের ঘর অন্ধকারে তিনি যেভাবে আলোকবর্তিকা হয়ে হাজির হয়েছেন, সেটাই তাকে অনেকদিন মনে রাখার জন্য যথেষ্ট হবে।