১০ মাসের সন্তানকে নিয়ে নোয়াখালীর কবিরহাট থেকে ঢাকায় এসেছেন বাবা মো. রেজাউল করিম। দেড় মাস ধরে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ভর্তি তার সন্তান আয়েশা। রেজাউলের মতো আরও অনেক অভিভাবক সন্তানদের নিয়ে ভিড় করেছেন হাসপাতালটিতে। কারও সন্তান দেড় মাস বয়সী, আবার কারও সন্তান ৫-৬ বছরের। সবার চোখেমুখেই উদ্বেগ আর শঙ্কা।
হামে আক্রান্ত ১০ মাস বয়সী শিশু আয়েশার বাবা মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘‘ডাক্তার বলছে জ্বর কমলে রিলিজ দেবে। রক্ত পরীক্ষা দিছে। জ্বর আসতেছে, আবার যাচ্ছে। এখনো তো বলতে পারি না পুরোপুরি সুস্থ। হাম থেকে শুরু হইছে, তারপর পেট খারাপ হইছে। এখন নিউমোনিয়া, আবার শ্বাসের সমস্যা।’’
বাংলাদেশে মহামারি আকারে হাম ছড়িয়ে পড়ার পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও শিশুদের মৃত্যু থামছে না। প্রতিদিনই আসছে নতুন আক্রান্ত ও মৃত্যুর খবর। কিন্তু টিকাদান কার্যক্রমের পরও কেন হাম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না? বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে হামের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে সারা দেশে হামে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে মৃত শিশুর সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৯০০-এর বেশি শিশু এবং নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে শতাধিক শিশুর। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে মোট ১৯ হাজার ৯৩৩ রোগীর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। এই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫০৫ রোগী। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার ৮৮৮ জন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, “ মূলত দীর্ঘদিন ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন না চালানো এবং টিকা কর্মসূচি বন্ধ থাকার ধাক্কা এই সময়ে সামলাতে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে দ্রুত ফল পাওয়া যাবে না। তবে টিকা কর্মসূচির পাশাপাশি ভিটামিন এ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইন জোরদার করাটা ভীষণভাবে জরুরি, যা হার্ড ইমিউনিটি অর্জনে সহায়ক।”
হামের সংক্রমণ বাড়ায় গত এপ্রিল থেকে মে মাসজুড়ে বিশেষ গণটিকাদান কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়। এই কর্মসূচিতে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ ক্ষেত্রেও বড়সংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়। হামের টিকা দেওয়ার জন্য ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী এক কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুকে লক্ষ্যমাত্রায় রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে টিকা পেয়েছে প্রায় এক কোটি ৩৯ লাখ শিশু। অর্থাৎ প্রায় ৪০ লাখ শিশু টিকা পায়নি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ডব্লিউএইচওর তথ্য বলছে, ২০০৬, ২০১০ ও ২০১৪ সালের বিশেষ হাম টিকাদান ক্যাম্পেইনে প্রায় শতভাগ কভারেজ অর্জিত হলেও ২০২০-২১ সালের পর আর কোনো বিশেষ ক্যাম্পেইন হয়নি। একই সময়ে কমতে থাকে নিয়মিত টিকাদানের কভারেজও, যা ২০২৫ সালে নেমে আসে ৫৯ শতাংশে।
টিকা নেওয়ায় হামের রোগীদের আগের তুলনায় জটিলতা কমেছে বলে দাবি করছেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মো. আতিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘‘হাম আসলে নতুন কিছু না। অনেক দিন ধরেই আসতেছে। নতুন করে আক্রান্ত হয়ে দুই-চারজন আমরা পাচ্ছি। কিন্তু আগে যে হারে হাম থেকে কমপ্লিকেশন ডেভেলপ করত, বিশেষ করে নিউমোনিয়া, কাশি, শ্বাসকষ্ট—এগুলো অনেক বেশি দেখতাম। এখন যারা আসতেছে, তাদের মধ্যে কমপ্লিকেশন এত বেশি না।’’
টিকা ক্যাম্পেইনের পরও কেন হামের সংক্রমণ বাড়ছে এ নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘‘প্রথম কারণ, জনসংখ্যার যে ৯৫ ভাগকে টিকা দেওয়ার কথা, সেটা দেওয়া হয়নি। ৬ মাস থেকে ৫ বছরের নিচ পর্যন্ত টিকা দেওয়ার কথা। এখানে অনেক জায়গায় টিকা দেওয়া হয়নি। ফলে ওইসব জায়গায় হাম বেড়ে গেছে। এরপর ৫ বছরের বেশি বয়সী এবং ৬ মাসের কম বয়সী শিশুরাও আক্রান্ত হয়েছে।’’
হাম নিয়ন্ত্রণে টিকাদানের ঘাটতির পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। গাজীপুর থেকে ৮ মাস বয়সী সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন বাবা নুরুল ইসলাম। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টা পর্যন্ত চিকিৎসক না আসার অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘‘ডাক্তার এখন পর্যন্ত আসে নাই। শুধু নার্সরা স্যালাইন লাগাইয়া রাখছে। স্যালাইন শেষ হয়ে গেলে আবার নার্সরাই দিচ্ছে। অনেকেই বলতেছে, জানি না কেন ডাক্তার আসে নাই। আজকে মন্ত্রী আসার কথা, ওইখানে হয়তো গেছে। আবার কেউ কেউ বলতেছে অপেক্ষা করেন, আসবে। বাচ্চার অবস্থা খুবই সিরিয়াস, কান্নাকাটি করতেছে।’’
হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের চিহ্নিত করে দ্রুত টিকার আওতায় আনার পরামর্শ দিচ্ছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, , ‘‘পরিকল্পনা করে যারা টিকা পায়নি, তাদের সবাইকে টিকা দিতে হবে। দেখতে হবে ভাসমান জনগোষ্ঠীর কারা টিকা পায়নি, চর এলাকায় কোথায় টিকা দেওয়া হয়নি, পাহাড়ি এলাকায় কোথায় বাদ পড়েছে। কোনো বিশেষ জনগোষ্ঠী টিকাদানের বাইরে রয়ে গেছে কি না, সেটাও দেখতে হবে।’’