ঢাকার আশুলিয়ার জামগড়ার ‘ট্রিপল মার্ডারের’ রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। প্রাথমিক তদন্তে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে পরকীয়া সংক্রান্ত বিরোধের তথ্য পাওয়ার কথা বলছে সংস্থাটি।
এ ঘটনায় মূল আসামি মো. মনিরুজ্জামান হৃদয়কে গ্রেপ্তার করেছে পিবিআই। গত সোমবার মধ্যরাতে তাকে আশুলিয়ার নরসিংহপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআইয়ের উপ-পরিদর্শক (এসআই) আনিসুল ইসলাম বাপ্পি চরচাকে বলেন, “সোমবার মধ্যরাতে আমরা অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করেছি আশুলিয়ার নরসিংহপুর থেকে। আমরা কিছু আলামতও জব্দ করেছি। আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে এবং হত্যার কথা স্বীকার করেছে।”
স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে গত ৮ আগস্ট একই এলাকার হযরত আলীর ভবনে একটি কক্ষ ভাড়া নেন নাজমা আক্তার ও আলমগীর কবির। অন্তঃসত্ত্বা নাজমা পোশাক শ্রমিক ও আলমগীর ফেরি করে পান-সিগারেট বিক্রি করতেন। গত শুক্রবার দিবাগত রাত ১টায় ওই ঘর থেকে দুজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এসময় নাজমার মরদেহের পাশে মৃত অবস্থায় একটি ভ্রূণ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ কর্মকর্তা আনিসুল দাবি করেন, ‘‘আসামি ভুক্তভোগী নাজমা আক্তারের পরকীয়া প্রেমিক ছিল। আলমগীর কবির ফোন করে ওই ব্যক্তিকে বাসায় ডাকেন। এরপর তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তাদের দুজনকে হত্যা করে তালা দিয়ে বের হয়ে যান পরকীয়া প্রেমিক।’’
যা বলা হলো পিবিআইয়ের সংবাদ সম্মেলনে
আজ বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে পিবিআইয়ের ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ বলেন, ‘‘আসামি মো. মনিরুজ্জামান হৃদয়ের সঙ্গে ভুক্তভোগী নাজমার দীর্ঘদিন ধরে প্রেম ও শারীরিক সম্পর্ক চলমান ছিল। বিষয়টি জানতে পেরে নাজমার স্বামী আলমগীরের সঙ্গে হৃদয়ের বিরোধের সৃষ্টি হয়। ঘটনার দিন নাজমা ও আলমগীর আসামি হৃদয়ের বাসায় গিয়ে তাকে তাদের বাসায় নিয়ে আসে। সেখানে পূর্বের সম্পর্কের বিষয়কে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। আলমগীর একপর্যায়ে মনিরুজ্জামানের সাথে ধাক্কাধাক্কি করে এবং তাকে মারধর করতে থাকে। এ সময় নাজমা মনিরুজ্জামানকে ঝাঁড়ু দিয়ে আঘাত করে।’’
এম এন মোর্শেদ সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, ‘‘এসময় মনিরুজ্জামানও তাদের সাথে ধাক্কাধাক্কি করে এবং ঘুষি দিয়ে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে মনিরুজ্জামান নাজমার পেটে লাথি দিয়ে ফেলে দেয়। অন্তঃসত্ত্বা থাকায় নাজমার গর্ভপাত ঘটে এবং সে মুমূর্ষু হয়ে পড়ে। এতে দুজনেই মারা যায়।’’
‘‘পরে আলমগীর ছেনি ও পাইপ দিয়ে মনিরুজ্জামানকে আঘাত করলে তাদের মধ্যে রক্তারক্তি হয় এবং আলমগীরকে মনিরুজ্জামান মাথায় ও শরীরে ৫ থেকে ৭টি ঘুষি দেয়। একপর্যায়ে আলমগীর অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়লে মনিরুজ্জামান তার গলায় গামছা পেঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। হত্যাকাণ্ডের পর আসামি মনিরুজ্জামান মরদেহগুলো খাটের ওপর শুইয়ে রেখে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।’’
এ সময় মনিরুজ্জামান নাজমার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, সিম, অফিসের পরিচয়পত্র নিয়ে চলে যায় বলেও দাবি করেন পিবিআইয়ের এই কর্মকর্তা।
হত্যার ঘটনা যেভাবে সামনে আসে
শুক্রবার সন্ধ্যায় ওই ভবনের ভাড়াটিয়ারা পঁচা গন্ধ পান। তারা বিষয়টি মালিককে জানালে তিনি বলেন, “কেউ ময়লা রেখেছে অথবা কোনো পশু-পাখি মারা গেছে। রাত বাড়তে থাকলে গন্ধের তীব্রতা বাড়তে থাকে। পরে রাত ১২টায় ভাড়াটিয়ারা মালিক হযরত আলীর ছেলে মোহাম্মদ মিলন, আলিম উদ্দিন এবং মোহাম্মদ রাজু এবং অন্য ভাড়াটিয়ারা দরজার তালা ভেঙে নাজমা ও আলমগীরের ঘরের দরজা খোলে।”
ভবন মালিকের ছেলে মোহাম্মদ মিলন বলেন, “দরজা খুলে বিছানায় পাশাপাশি দুটি মরদেহ দেখতে পান। এ সময় তারা ৯৯৯-এ কল দিয়ে পুলিশকে ডাকেন।”
কী বলছে সুরতহাল
মরদেহের সুরতহাল নিয়ে চরচার সঙ্গে কথা হয় আশুলিয়া থানার এসআই মোহাম্মদ তালেবের। তিনি ঘটনার রাতে ডিউটি অফিসার ছিলেন। তিনি বলেন, “আমরা গিয়ে দেখি, সাধারণত দুজন মানুষ যেভাবে পাশাপাশি শুয়ে থাকে, ওইভাবে দুটি মরদেহ পাশাপাশি খাটের ওপর। ঘরের সবকিছু ঠিকঠাক আছে, বিছানার চাদরটাও ঠিকঠাক। শুধু ভুক্তভোগীদের মোবাইল ফোন পাওয়া যাচ্ছিল না। মনে হয়, কিছু খাইয়ে অচেতন করে শ্বাসরোধ করে মারা হয়েছে। আলমগীর কবিরের গলায় গামছা পেঁচানো।”
ভ্রূণ উদ্ধারের বিষয়ে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘‘ধারণা করা হচ্ছে, নাজমার মরদেহ পচে ভ্রূণ বের হয়ে গেছে। আবার হত্যার সময়ও ভ্রূণ বের হয়ে যেতে পারে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত বলা যাবে।”
ডাকাতির ঘটনা কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তালেব বলেন, “ডাকাতির কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।”
কত সময় আগে হত্যা করা হয়
শুক্রবার রাত দেড়টার দিকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই সময় মরদেহ ফুলে পঁচন শুরু হয়। ঠিক কতক্ষণ আগে হত্যা করা হয়েছে, সময়টা নির্দিষ্ট করে বলতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে তাদের ধারণা, মরদেহ উদ্ধারের ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় আগে হত্যা করা হয়েছে।
এই ঘটনায় নাজমা আক্তারের বোন শাপলা আক্তার বাদী হয়ে আশুলিয়া থানায় একটি মামলা করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, বোনের সঙ্গে সর্বশেষ গত মঙ্গলবার গার্মেন্টস ছুটির পর দেখা হয়। এরপর থেকে তার (নাজমা) ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
শাপলা চরচাকে বলেন, “আমার বোনের সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয়েছে মঙ্গলবারে কারখানা ছুটির পর, এরপর থেকে তার ফোন বন্ধ পাই।”
সরেজমিনে দেখা যায়, নাজমা ও আলমগীরের কক্ষের পাশে আরও ১৩টি কক্ষ রয়েছে। কাছাকাছি কক্ষে থাকেন মলিতা আক্তার ও সুমনা বেগম। তাদের সঙ্গে কথা হয় চরচার। তারা জানান, তারা নাজমাকে সর্বশেষ দেখেছেন সোমবার। এরপর ওই ঘর তালাবদ্ধ ছিল। নাজমা আক্তার কারখানা থেকে ফিরতেন বিকেল ৫টা থেকে সাড়ে ৫টার মধ্যে। এরপর রুমের বাইরে গ্যাসের চুলায় রান্না করতেন। আলমগীর কবির প্রায়ই বাসায় থাকতেন। কিন্তু মঙ্গলবার থেকে তাদের রুম তালাবদ্ধ ছিল।
১৩টি কক্ষের মধ্যে বেশ কয়েকটিতে তালা দেওয়া দেখা গেছে। চরচার সঙ্গে কথা হয় আরেক কক্ষের ভাড়াটিয়া নাসিমা বেগমের। তিনিও একজন পোশাক শ্রমিক। তবে অসুস্থতার কারণে তিনি কারখানায় যাননি জানিয়ে বলেন, “অন্য ভাড়াটিয়াদের পেতে হলে সন্ধ্যা ৭ থেকে ৮টার পর আসতে হবে। সবাই এখানে গার্মেন্টসে চাকরি করেন। ওভার টাইম শেষ করে আসতে অনেক দেরি হয়।”
হত্যাকাণ্ড রাতে ঘটেনি এমনটি ধারণা করে নাসিমা বলেন, “লাইনের গ্যাস গভীর রাতে আসায় মহিলারা অনেক রাত পর্যন্ত রান্না করে। ঘটনা রাতে হলে তো কিছু শোনার কথা।”
তাদের ঘরে কাদের আসা-যাওয়া ছিল
হযরত আলীর বাসায় ভাড়া ওঠার আগে নাজমা ও আলমগীর দম্পতি মীর বাড়ির মীর করিমের কলোনিতে ভাড়া থাকতেন। চলতি বছরের মে থেকে জুলাই পর্যন্ত তারা সেই বাসায় ছিলেন জানিয়ে মীর করিমের বাসার ম্যানেজার জালাল উদ্দিন চরচাকে বলেন, ‘‘নাজমার সঙ্গে তার স্বামী আলমগীরের প্রায়ই ঝগড়া হতো। তবে আবার ঠিকঠাক হয়ে যেত। আলমগীর প্রতিদিন পান-সিগারেট বিক্রি করতে যেতেন, তা নিয়ে নাজমার আপত্তি ছিল। এ নিয়েই তাদের মধ্যে ঝগড়া হত।’’
জালাল উদ্দিন বলেন, ‘‘নাজমা গার্মেন্টসে চলে গেলে হৃদয় নামের একজনকে রুমে এনে আড্ডা দিতেন আলমগীর। নাজমা আসার আগে তারা বের হয়ে যেতেন। হৃদয় ওই কলোনিতে তার স্ত্রীকে নিয়ে ভাড়া থাকতেন। হৃদয় বেকার ছিলেন এবং তার স্ত্রী একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন।’’
এদিকে নাজমার বোন শাপলা আক্তার বলেন, “আলমগীর কবির নাজমা আক্তারের দ্বিতীয় স্বামী এবং নাজমা আক্তারও আলমগীর কবিরের দ্বিতীয় স্ত্রী। তারা ২০২২ সালে বিয়ে করেন। শাপলা বলেন, “নাজমার আগের সংসারে একটি ছেলে রয়েছে, যার বয়স ১১ থেকে ১২ বছর। সে নাজমার মায়ের কাছে দিনাজপুরে থাকে। নাজমার আগের স্বামীর নাম মোতালেব।”
বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ নিয়ে শাপলা বলেন, “মোতালেব আরেকটি বিয়ে করায় নাজমাকে মারধর করত। তাই ৯ বছর আগে তাদের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। মোতালেব এখন নেত্রকোণা থাকে।”
অন্যদিকে, আলমগীর কবিরের প্রথম স্ত্রীর মানসিক সমস্যা থাকায় বিবাহ বিচ্ছেদ হয় বলে জানান শাপলা।