কাজটা খুবই ছোট। নগণ্যও বলা চলে। কিন্তু এই কাজটাকেই কত ধ্বংসাত্মক মনে হচ্ছে!
কোন কাজ? চীনা কমেডিয়ান গুও দেগাং গত জুলাইয়ের মাঝামাঝি একটা লাইভ পারফরম্যান্সের সময় একটা জনপ্রিয় চীনা বিপ্লবী গানের কথা একটু বদলে দেন। গানটির মূল কথায় ছিল, “উইশান হ্রদে সবকিছুই খুব শান্ত”। জাপানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় কমিউনিস্ট গেরিলারা এই এলাকায় লুকিয়ে থাকতেন। কিন্তু গুও গাইলেন, “নিষিদ্ধ নগরীটিতে সবকিছুই খুব শান্ত”। নিষিদ্ধ নগরী বলতে বোঝানো হচ্ছে- বেইজিংয়ের একটি পুরোনো রাজকীয় এলাকা, যা একসময় চীনের সম্রাটদের কেন্দ্র ছিল। এখন চীনের নেতারা থাকেন সেখানে।
এভাবে শব্দ বদলে দিয়ে গুও ঠিক কী বোঝাতে চাইলেন, তা খুব একটা স্পষ্ট হলো না। কোনো রাজনৈতিক ইঙ্গিতও ছিল না বাক্যটাতে। দর্শকের কাছ থেকেও হালকা হাসির চেয়ে বেশি কিছু আদায় করে নিতে পারল না বাক্যটা। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ছিল অনেক বেশি কঠোর। গুওর ওই গানের পর তার বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তা চীনে মতপ্রকাশের সুযোগ কতটা সংকুচিত হয়ে এসেছে, তারই একটি উদাহরণ।
দৃশ্যত, গুওর ‘অপরাধ’–তিনি বিনোদনবিষয়ক আইন ভেঙেছেন। কারণ, গানের কথা বদলানোর আগে তিনি সরকারের অনুমতি নেননি। তার শো-গুলো সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত পর্যন্ত চলার কথা ছিল, কিন্তু সেগুলো বাতিল করা হয়।
গুওর সঙ্গে এমন কঠোর আচরণের খবর ছড়িয়ে পড়লে অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তবে অনলাইনে সরকারের সমালোচনা করা অনেক মন্তব্য বেশিক্ষণ টেকেনি।
একজন লিখেছিলেন, “একটি সংস্কৃতিতে যদি সামান্য নিরীহ রসিকতারও জায়গা না থাকে, তার মানে কি আমরা নিজেদের ওপর খুব বেশি চাপ তৈরি করছি না?” পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উইচ্যাট থেকে তার সেই পোস্টও মুছে দেওয়া হয়।
চীনে মতপ্রকাশের সুযোগ কমে যাওয়ার আরও দুঃখজনক উদাহরণ দেখা গেছে গত মাসের একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগে।
চীনের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত এলাকায় তিব্বত আর নেপালে ভূমিধস ও বন্যায় এক হাজারের বেশি মানুষ মারা যান। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ওই ভূমিধস নিয়ে অনেক খবর প্রকাশ করেছে। তাই এটিকে সরাসরি তথ্য গোপনের ঘটনা বলা যায় না। বরং এই দুর্যোগ দেখিয়েছে, সংবেদনশীল বলে মনে হতে পারে–চীনে এমন যেকোনো বিষয়ে সরকারের সমালোচনা করে কথা বলার সুযোগ কতটা কমে গেছে।
দুর্যোগের বেশ কিছু ভিডিও অনলাইন থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এর মধ্যে একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কাদার প্রবল স্রোত একটি সীমান্ত পারাপারের স্থান ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। দুর্ঘটনার পর প্রথম ১০ দিনে বন্যাকবলিত এলাকায় বড় রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের মাত্র কয়েকজন সাংবাদিককে যেতে দেওয়া হয়েছিল। এদিকে কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দেয়, অনলাইনে ‘গুজব ছড়ানোর’ অভিযোগে কয়েকজনকে জরিমানা করা হয়েছে। এদের একজন শুধু এতটুকুই বলেছিলেন যে, ধ্বংসস্তূপের নিচে হয়তো হাজার হাজার মানুষ চাপা পড়ে থাকতে পারেন।
এই দুর্যোগকে ঘিরে কিছু প্রশ্নও উঠেছে। হিমবাহ ধসে পড়ার আগে চীন কি নেপালকে যথেষ্ট আবহাওয়াবিষয়ক তথ্য দিয়েছিল? চীনের চেয়ে সম্পদের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে থাকা সত্ত্বেও নেপাল কীভাবে এত দ্রুত মৃতের সংখ্যা হালনাগাদ করতে পারল, যেখানে চীনের প্রকাশ করা সংখ্যায় প্রায় কোনো পরিবর্তনই হলো না?
২০০৮ সালে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনে বড় একটি ভূমিকম্পের সময় পরিস্থিতি ছিল একেবারেই ভিন্ন। তখন নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে স্কুলগুলো বানানো নিয়ে অনলাইনে মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা গিয়েছিল। সাংবাদিকরা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কষ্টের গল্পও তুলে ধরেছিলেন।
এবারের প্রতিবেদনে অবশ্য নিহত ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের চেয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাওয়া উদ্ধারকর্মীদের বেশি দেখানো হচ্ছে। চীনা সাংবাদিকদের বলা হয়েছে, বড় রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলোতে যা প্রকাশ করা হচ্ছে, তার মধ্যেই যেন তারা প্রতিবেদন সীমিত রাখেন।
অর্থাৎ, সরকার সরাসরি সংবাদ প্রকাশ বন্ধ করেনি। বরং কোন বিষয় নিয়ে কথা বলা যাবে আর কোন বিষয় নিয়ে বলা যাবে না, সেই সীমা বেঁধে দিয়েছে।
গুওর সঙ্গে যা ঘটেছে বা বন্যার খবর যেভাবে সীমিত করে প্রকাশ করা হয়েছে, তা চীন নিয়ে কাজ করা কারও কাছেই হয়তো খুব বেশি অবাক করার মতো কিছু মনে হবে না। এই দুটি ঘটনা দেখিয়ে দেয়, চীনের তথ্য ও মতপ্রকাশের পরিবেশ কতটা বদলে গেছে। ২০০০-এর দশকের শুরুতে ইন্টারনেটকে বিতর্ক ও মতপ্রকাশের নতুন সুযোগ হিসেবে দেখা হয়েছিল। তখন চীনের সাংবাদিকেরা কিছু কিছু সাহসী অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও করেছেন। কিন্তু ২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পরপরই শি জিনপিং স্পষ্ট করে দেন, নাগালের বাইরে চলে যেতে থাকা ইন্টারনেটকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে এবং গণমাধ্যমকে কমিউনিস্ট পার্টির স্বার্থে কাজ করতে হবে। তার মতে, তিনি নিজের লক্ষ্যে সফল।
চীনে এখনো রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বাইরেও অনেক মতামত প্রকাশিত হয়, বিশেষ করে উইচ্যাটের পাবলিক অ্যাকাউন্টগুলোতে। তবে এসব অ্যাকাউন্টে যারা লেখেন, তারা জানেন যে নিষিদ্ধ কোনো বিষয়ে লিখলে অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই নিরাপদে থাকার জন্য তারা অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ বিষয় এড়িয়ে চলেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর সাম্প্রতিক সময়ে সেন্সরদের আরও শক্তিশালী করেছে। বিশাল অনলাইন জগতের ওপর নজরদারি করা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত লেখা দ্রুত সরিয়ে ফেলা এখন তাদের জন্য আরও সহজ। চীনে অনলাইন সেন্সরশিপ পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট চায়না ডিজিটাল টাইমসের শিয়াও চিয়াং দ্য ইকোনমিস্টকে বলেন, “একসময় চীনের প্রাণবন্ত অনলাইন আলোচনা তৈরি হওয়ার পেছনে কমিউনিস্ট পার্টির বড় অবদান ছিল। এখন পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেছে। এখন নিঃসন্দেহে এসব ব্যাপারে পার্টিই সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করে।”
চীনের সরকার আসলে কী কী বন্ধ করে দেয় – শুধুই কি বিদেশি ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেয়, নাকি দেশের ভেতরে থাকা সমালোচকদের ওপরও এই নিষেধাজ্ঞা আছে, এমন চিন্তাটা আসা খুবই স্বাভাবিক। তবে এখানে সরকারের লক্ষ্য এর চেয়েও বড়। গত বছর চীনের ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এশিয়া সোসাইটির জন্য করা এক বিশদ বিশ্লেষণে জেসিকা ব্যাটকে ও লরা এডেলসন লিখেছেন, সরকারের বড় লক্ষ্য হলো পুরো তথ্যব্যবস্থাকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা, যাতে নাগরিকেরা কী জানবেন, এমনকি কী ভাববেন, তার ওপরও প্রভাব পড়ে।
চীনের মানুষ এখনো চাইলে নানা উপায়ে দেশটির অনলাইন ‘ফায়ারওয়াল’ বা ইন্টারনেটের কঠোর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা পেরিয়ে দেখতে পারেন যে, বাইরের বিশ্ব আসলে কী নিয়ে আলাপ করছে। তবে তেমনটা করার আগ্রহ খুব কম মানুষেরই থাকে। আর কেউ যদি সরকারের কথার সঙ্গে দ্বিমত করা কোনো মত তৈরি করেও থাকেন, সেটি চীনের অনলাইন আলোচনায় ছড়িয়ে দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না।
শিয়াও দ্য ইকোনমিস্টকে জানান, তার টিম দিনে মাত্র একটি বা দুটি পোস্ট আর্কাইভ করে রাখতে পারে, যাতে ইন্টারনেট থেকে মুছে ফেলার আগেই পোস্টগুলো সংরক্ষণ করে রাখা যায়। এসব পোস্টও দিনে দিনে ‘আরও কম আকর্ষণীয়’ হয়ে উঠেছে। অনেক সময় সেগুলোতে খুব ছোটখাটো বিষয় নিয়ে সরকারের সমালোচনা করা হয়। শিয়াওর মতে, চীনের তথ্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী ও সুসংগঠিত, এটাই তার প্রমাণ।
বোঝাপড়া ও সেন্সরশিপ
সেন্সরশিপের এই প্রভাব শুধু অনলাইনে নয়, বাস্তব জীবনেও পড়ছে। বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে মানুষ এখনো নিজের মতামত প্রকাশ করেন। অফিস হোক, স্কুল হোক–এসব নিয়ে অভিযোগও করেন। কিন্তু অনলাইনে কী বলা যাবে, তার ওপর সীমাবদ্ধতার প্রভাব বাস্তব জীবনের আলোচনাতেও পড়ছে। হিসাবটা সহজ–কিছু নিয়ে যে কথা বলবেন, সেটার তথ্য তো কোথাও থেকে আসতে হবে!
সেন্সরশিপ এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে, দেখে মনে হবে, মানুষ আপনা-আপনিই কিছু কিছু জায়গায় সেন্সরশিপ মেনে চলতে শুরু করেছেন। গুও দেগাংয়ের সঙ্গে যা হলো, এরপর মঞ্চে কাজ করা অন্য শিল্পীরাও নিশ্চয়ই আরও সাবধানে কথা বলবেন। গুওকে নিয়ে উইচ্যাটে একটি পোস্ট দেওয়া হয়েছিল, পরে সেটি মুছে ফেলা হয়। সেখানে বলা হয়েছিল, এই সতর্কতা এখন খাবারের টেবিলেও চলে এসেছে। পোস্টটিতে লেখা ছিল, “আলাপ যদি কোনো সংবেদনশীল বিষয়ের দিকে যায়, আমরা আগে চারপাশে তাকাই। তারপর গলা নিচু করে কথা বলি। মনে হয়, যেন আমরা গা ঢাকা দেওয়া কোনো দলের সদস্যরা একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করছি।”
এসবের কারণে চীনের কী ক্ষতি হচ্ছে?
মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় এভাবে রাশ টেনে রাখা চীনের জন্যও ক্ষতিকর। কারণ, এতে কোনো সমস্যা শুরুতেই চিহ্নিত করা এবং তার যুক্তিসংগতভাবে সমাধানের দিকে যাওয়া কঠিন হয়ে যায়। এতে শেষ পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টিরও ক্ষতি হতে পারে। কারণ, মানুষের অভিযোগ ও অসন্তোষ নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা না হলে সেগুলো জমতে থাকে। একসময় সেই অসন্তোষ বড় আকারে প্রকাশ পেতে পারে।
তবে এতটুকু নিশ্চিত, চীনের নেতারা বিষয়টিকে এভাবে দেখেন না। তাদের তথ্য পাওয়ার নিজস্ব ব্যবস্থা আছে। তাদের দৃষ্টিতে, রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সাধারণ মানুষের চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। চীনের নেতারা আসলে এভাবেই পুরো ব্যবস্থাটাকে গড়ে তুলতে চান। মানুষ কী দেখবে এবং কী নিয়ে কথা বলবে–সেটা এই যুগে এসেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারার ক্ষমতা থাকাই কমিউনিস্ট পার্টির কাছে একটি বড় অর্জন।