নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সত্যটা খোলাখুলি লেখা দেখে যারা অভ্যস্ত নন, তাদের কাছে চীনের চাকরির বিজ্ঞাপন বেশ অবাক করার মতো মনে হতে পারে। সেখানে নিয়োগদাতারা অনেক সময় প্রার্থীদের বয়স, লিঙ্গ, চেহারা এমনকি পারিবারিক অবস্থার বিষয়েও বেশ সরাসরি শর্ত দেন। এমনটাই বলছে ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনোমিস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন।
সম্প্রতি হুবেই প্রদেশের হুয়াংশি শহরে বিনিয়োগ সংক্রান্ত কর্মকর্তা নিয়োগের একটি বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, প্রার্থীদের বয়স ৩৫ বছরের নিচে হতে হবে। সেইসঙ্গে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, ‘পুরুষদের অগ্রাধিকার’ দেওয়া হবে।
লানঝৌ শহরের একটি রেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নারী কর্মী নিয়োগ দিতে চেয়েছিল। তবে সেখানেও ছিল একাধিক শর্ত। প্রার্থীদের বয়স ২৫ বছরের নিচে হতে হবে, উচ্চতা হতে হবে ১৬০ সেন্টিমিটারের বেশি এবং ‘ভালো চেহারা’ থাকতে হবে।
অন্যদিকে, সুচৌ শহরের একটি প্যাকেজিং প্রতিষ্ঠান বিক্রয় প্রতিনিধি নিয়োগের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি বয়সী প্রার্থীদেরও সুযোগ দিয়েছে। তারা ৪৫ বছর বয়স পর্যন্ত প্রার্থী খুঁজছিল। তবে নারী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে শর্ত ছিল, তাদের আগে থেকেই বিবাহিত এবং সন্তান আছে এমন হতে হবে। অর্থাৎ, মাতৃত্বকালীন ছুটির প্রয়োজন হতে পারে এমন প্রার্থীকে তারা নিতে চাইছে না।
এগুলো চীনের শ্রমবাজারে নারীদের প্রতি বৈষম্যের মাত্র কয়েকটি স্পষ্ট উদাহরণ। এর বাইরেও আরও ব্যাপক বৈষম্য রয়েছে, যা সহজে চোখে পড়ে না। এর মধ্যে আছে নারীদের গর্ভধারণ এড়িয়ে চলার জন্য চাপ দেওয়া, একই ধরনের কাজে পুরুষ সহকর্মীদের বেশি বেতন দেওয়া এবং কর্মজীবনে নারীরা যত ওপরে উঠতে থাকেন, ততই তাদের সুযোগ কমে যাওয়া।
১৯৫০-এর দশকে মাও সে তুং যখন বলেছিলেন, “নারীরা আকাশের অর্ধেক ধরে রেখেছে”, তখন শুধু অর্থনৈতিক দিক বিবেচনা করলে চীনকে বেশ সমতাভিত্তিক দেশ বলেই মনে হতো। নারী ও পুরুষের কাজ এবং আয় প্রায় একই ছিল। যদিও দুটিই ছিল অত্যন্ত কম।
আজ শিক্ষার ক্ষেত্রে চীনের নারীরা পুরুষদের সঙ্গে শুধু সমতা অর্জনই করেননি, অনেক ক্ষেত্রে এগিয়েও আছেন। দেশটির বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ৫১ শতাংশই নারী। ১৯৯৫ সালের তুলনায় এই হার ১৪ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছে।
কিন্তু কর্মক্ষেত্রের চিত্র উল্টে গেছে। বর্তমানে চীনে পুরুষরা গড়ে নারীদের চেয়ে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি আয় করেন। ১৯৯০ সালে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী নারীদের প্রায় ৮০ শতাংশ শ্রমবাজারে ছিলেন। বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় এটি ছিল অন্যতম উচ্চ হার। বর্তমানে সেই হার কমে ৭০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, যা জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন, উভয়ের চেয়েও কম।
চীনের ব্যবসায়িক নেতৃত্বেও পুরুষদের আধিপত্য স্পষ্ট। রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ে নারীর উপস্থিতি আরও কম। ২০২২ সাল পর্যন্ত টানা প্রায় ২৫ বছর ধরে কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা পলিটব্যুরোতে একজন বা দুজন নারী ছিলেন। কিন্তু এরপর থেকে সেখানে আর কোনো নারী নেই।
লিঙ্গবৈষম্যও এই সমস্যার একটি বড় অংশ। ব্যবসায়ী ও কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে অনেক সময় ভোজের টেবিলেই গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি বা সমঝোতার কাজ এগোয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে চলা মদ্যপানের এসব নৈশভোজ নারীদের জন্য অস্বস্তিকর, কখনো কখনো আরও খারাপ অভিজ্ঞতার কারণ হয়ে দাঁড়ায় । চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আমলে এ ধরনের দীর্ঘ মদ্যপানের আয়োজন আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
সম্প্রতি চীনের ধনী শহর হাংচৌতে এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীর বিরুদ্ধে এমনই এক নৈশভোজের পর এক তরুণী কর্মীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটি ব্যাপক জনরোষ তৈরি করে। এর পর আবারও এ ধরনের ভোজের আয়োজন বন্ধ করার দাবি জোরালো হয়।
তবে নারীদের জন্য আরও সাধারণ অভিজ্ঞতাটি তুলনামূলক কম আগ্রাসী হলেও অপমানজনক। প্রযুক্তি খাতে কাজ করা ডৌ বলেন, ‘আমাদের বসরা সরাসরি কিছু বলবেন না, কিন্তু তারা চান আমরা যেন সাজসজ্জার অংশ হয়ে থাকি।’
তবে বিষয়টি সবসময় এত সরল নয়। ইভেন্ট খাতে কাজ করা বিশ বছর বয়সী এরিকা বলেন, পুরুষ বসের তুলনায় নারী বসদের সঙ্গেই তার বেশি বিরোধ হয়েছে। তার ভাষায়, “আমরা পিতৃতান্ত্রিক সমাজে বাস করি। তাই নারীরা যখন সেই বাধা পেরিয়ে ক্ষমতার জায়গায় পৌঁছান, তখন তারাও অনেক সময় আগ্রাসী হয়ে ওঠেন।”
তবে আরও ব্যাপক সমস্যা হয় নারীরা যখন মা হন। তখন নারীদের মা হিসেবে ভূমিকা বা সম্ভাব্য মাতৃত্বের সঙ্গে কর্মজীবনের সংঘাত অনেক বড় বিষয় হয়ে ওঠে। বিশ্বের অনেক দেশেই ‘মাতৃত্বের শাস্তি’ বা মাদারহুড পেনাল্টি একটি পরিচিত সমস্যা। কিন্তু চীনে এই শাস্তি তুলনামূলকভাবে বেশি। এর পেছনে রয়েছে কঠোর কর্মসংস্কৃতি, পুরোনো অবসরব্যবস্থা এবং সন্তান জন্মদানে উৎসাহ দিতে রাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান চাপ, যা দীর্ঘদিনের কর্মজীবনের ধারা ও প্রত্যাশার সঙ্গে একসঙ্গে সংঘাত তৈরি করছে।
চীনে মায়েরা প্রায় ছয় মাস কর্মস্থল থেকে ছুটি নিতে পারেন এবং এ সময়ে পুরো বেতন পাওয়ার কথা। তবে ছুটির সময়ে এই বেতনের একটি অংশই শুধু রাষ্ট্র বহন করে, বাকি বড় অংশের খরচ দিতে হয় নিয়োগদাতাদের। চীনের মানের উন্নত দেশগুলোর তুলনায় এসব সুবিধা অনেক বেশি।
৩০ ও ৪০-এর কোঠায় থাকা পাঁচ নারী চাগুয়ানকে জানিয়েছেন, তারা গর্ভধারণের চেষ্টা করছেন কি না, সে বিষয়ে তাদের বসরা আগেই জানতে চাইতেন।
মিডিয়া খাতে কাজ করা সাবেক ব্যবস্থাপক চেন বলেন, “একজন সাবেক ম্যানেজার হিসেবে বলছি, আমিও ৩৫ বছরের কম বয়সী নারীদের নিয়োগ দিতে খুব একটা আগ্রহী ছিলাম না। কারণ ভয় ছিল যদি সে চাকরিতে যোগ দিয়েই গর্ভবতী হয়ে পড়ে তখন কী হবে?’”
দ্রুত কমতে থাকা জন্মহার ঠেকাতে চীনের সরকার সম্প্রতি পরিবারগুলোকে দুই সন্তান নেওয়ার জন্য উৎসাহ দিচ্ছে। এতে নিয়োগদাতাদের উদ্বেগ আরও বাড়ছে। তাদের আশঙ্কা, বিবাহিত নারী কর্মীরা সন্তান নেওয়ার কারণে দীর্ঘ সময়ের জন্য কর্মস্থল থেকে ছুটিতে যেতে পারেন।
ছোট বাচ্চাদের বোঝা
গর্ভধারণের পরও নারীদের সামনে আরও নানা বাধা থাকে। সন্তানকে স্কুলের পড়াশোনা করানোর দায়িত্ব মূলত মায়েরই, এমন একটি প্রচলিত প্রত্যাশা রয়েছে। চীনের অনেক কর্মক্ষেত্রে যে দীর্ঘ সময় কাজ করার চাপ থাকে, তার সঙ্গে এই দায়িত্বের সমন্বয় করা কঠিন।
৪০-এর কোঠার শুরুতে থাকা ডৌ বলেন, “আমার সমবয়সী পুরুষরা ভালো অবস্থানে আছেন। কারণ বাড়িতে তাদের দায়িত্ব এতটা বেশি নয়।”
চীনের চাকরির বিজ্ঞাপনগুলোতেও প্রায়ই বলা হয়, প্রার্থীকে অতিরিক্ত চাপ সামলাতে সক্ষম হতে হবে, নিয়মিত ওভারটাইম করতে হবে এবং যেকোনো সময় যোগাযোগের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। এসব শর্ত সরাসরি নারীদের বিরুদ্ধে বৈষম্য করে না। তবে ছোট সন্তান নিয়ে ব্যস্ত যেকোনো অভিভাবকের জন্যই এগুলো বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়, আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেই অভিভাবক হন মা।
কর্মজীবন থেকে বিরতি নিয়ে কোনো নারী ৪০-এর কোটার শুরুতে আবার কাজে ফিরতে চাইলে তার জন্যও খুব বেশি সুযোগ অবশিষ্ট থাকে না। বেসরকারি খাতের চাকরিতে বর্তমানে নারীদের সরকারি অবসরের বয়স ৫৫ বছরের কিছু বেশি, আর পুরুষদের ৬০ বছর। ২০৪০ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে এই বয়স বাড়িয়ে নারীদের ৫৮ এবং পুরুষদের ৬৩ বছর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সন্তানের জন্য কর্মজীবনে বিরতি নেওয়া মধ্য-পর্যায়ের নারী কর্মীদের পেছনে বিনিয়োগের আগ্রহও অনেক প্রতিষ্ঠানের কম থাকে। সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য চাকরি ছেড়ে দেওয়া সাবেক ওয়েব ডিজাইনার উ বলেন, “শ্রমবাজার নারীদের জন্য এমনিতেই যথেষ্ট পক্ষপাতদুষ্ট। ৩৫ বছর বয়সের পর অবস্থা যেন তুষারের ওপর আবার তুষার জমার মতো।”
এখন তিনি নিজেই নিজের পথ বদলানোর চেষ্টা করছেন। নতুন করে প্রশিক্ষণ নিয়ে ড্রোন পাইলট হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।
নীতিগত কিছু পরিবর্তন এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। এর মধ্যে মাতৃত্বকালীন ও পিতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবধান কমানো অন্যতম। বর্তমানে বাবারা সর্বোচ্চ ১৫ দিনের ছুটি পান, তাও সবাই নেন না। বেতনসহ ছুটির খরচে রাষ্ট্রের আরও বেশি অংশগ্রহণ থাকলে কোম্পানিগুলোর আর্থিক চাপও কমবে। নারী ও পুরুষের অবসরের বয়সও একই করা উচিত।
তবে নারীরা যে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, তার মূল কারণ শুধু অসম নীতি নয়। এর পেছনে রয়েছে শক্তিশালী সামাজিক রীতিনীতি, বিশেষ করে মায়েদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া দায়িত্বের ভার।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে চীন নিজেই তার সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে চীনের নারীরা ইতিমধ্যেই আকাশের অর্ধেকেরও বেশি ধরে রেখেছেন। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে তারা পাচ্ছেন সেই আকাশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।