অবশেষে রান্না করার পর গরুর মাংসের রং উজ্জ্বল সবুজ হয়ে যাওয়ার সেই নজিরবিহীন ও রহস্যময় ঘটনার জট খুলেছে। গত ২২ জুলাই খুলনার পাইকগাছায় ঘটে যাওয়া এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ল্যাবরেটরিতে সংগৃহীত মাংসের নমুনা পরীক্ষা করা হয়।
পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে, মাংসের রঙ পরিবর্তনের পেছনে কোনো পঁচন, ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বা ফরমালিনের সংশ্লিষ্টতা ছিল না। মূলত ফ্রিজে দীর্ঘক্ষণ সংরক্ষণ এবং রান্নার সময় উচ্চ তাপমাত্রার প্রভাবে মাংসের নিজস্ব রঞ্জক পদার্থের রাসায়নিক রূপান্তরের ফলেই এই অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল।
গত ২২ জুলাই সকালে পাইকগাছা পৌর বাজারের কসাই ইসমাইল গাজীর দোকান থেকে মডার্ন বেকারির কয়েকজন কর্মচারী দুই হাজার ৭৫০ টাকায় প্রায় চার কেজি গরুর মাংস কেনেন। প্রতিষ্ঠানের ১৪-১৫ জন কর্মচারীর পিকনিকের আয়োজন উপলক্ষে দুপুরের রান্নার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। বেকারির বাবুর্চি মশলা কষানোর পর কড়াইতে মাংস দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই মাংসের টুকরোগুলো গাঢ় সবুজ বর্ণ ধারণ করে। অথচ মশলা ও ঝোলের রং সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও অপরিবর্তিত ছিল। এই নজিরবিহীন ঘটনা জানাজানি হলে মুহূর্তেই তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে প্রশাসন ও গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রধান আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়।
বেকারির কর্মচারীদের অভিযোগ ছিল কসাই বাসি বা ফরমালিনযুক্ত মাংস বিক্রি করেছেন। অন্যদিকে কসাই ইসমাইল গাজীর পালটা দাবি ছিল কর্মচারীরা অসতর্কতাবশত কোনো রাসায়নিক তরল মিশিয়ে এই কাণ্ড ঘটিয়েছেন।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াসীউজ্জামান চৌধুরীর নির্দেশে পুলিশ ও উপজেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর উদয় মন্ডল রান্না করা মাংস এবং বিক্রেতার ফ্রিজে থাকা কাঁচা মাংস জব্দ করেন। ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে সংগৃহীত নমুনা পরবর্তীতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয়ের ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়।
গত ২৭ আগস্ট বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের খাদ্য বিশ্লেষক নাজিয়া সুলতানা স্বাক্ষরিত পরীক্ষামূলক প্রতিবেদনে জানানো হয়, নমুনায় কোনো ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বা পিগমেন্ট উৎপাদনকারী সিউডোমোনাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি এবং মাংসে কোনো পঁচনশীল দুর্গন্ধ বা আঠালো ভাবও ছিল না। এছাড়া বাহ্যিক কোনো কৃত্রিম রাসায়নিক বা ফরমালিনের কারণে রং বদলায়নি।
স্পেকট্রোফটোমেট্রিক পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী, ফ্রিজে দীর্ঘক্ষণ সংরক্ষণ এবং পরবর্তী সময়ে রান্নার সময় উচ্চ তাপমাত্রার সংস্পর্শে আসার কারণে মাংসের মায়োগ্লোবিন বা হিম-রঞ্জক পদার্থের রাসায়নিক রূপান্তর বা কাঠামোগত পরিবর্তনের ফলেই মূলত এই সবুজ রং ধারণ করেছে।
উপজেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর উদয় মন্ডল বলেন, “ল্যাব টেস্টের রিপোর্ট হাতে আসার পর মাংসের রং পরিবর্তনের প্রকৃত বৈজ্ঞানিক কারণ এখন পুরোপুরি স্পষ্ট। ফরমালিন বা ক্ষতিকর কেমিক্যালের অপপ্রচারের ফলে জনমনে যে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল, এই বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে তার অবসান ঘটেছে।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাংস সংরক্ষণের সময় ও রান্নার তাপমাত্রার বিরল মিথস্ক্রিয়ার কারণে এ ধরনের বিরল ঘটনা কদাচিৎ ঘটতে পারে।
এই ব্যাখ্যার ফলে মাংস বিক্রেতা ও স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে চলমান ষারোপ ও উত্তেজনার অবসান ঘটবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।